চুয়াডাঙ্গা বুধবার , ১১ মে ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জীবন-সংগ্রামে অসহায় শিশু আব্দুর রহমান

১৩ মাস বয়সী ভাইকে কোলে নিয়ে ঘুরছে পথে পথে
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
মে ১১, ২০২২ ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

কিছুদিন আগে মাকে হারানো রহমানের বাবাও অসুস্থ। ফলে বাধ্য হয়ে সংসারের বোঝা তুলে নিতে হয়েছে কাঁধে। বাবা-ভাইয়ের খাবার জোগাতে নামতে হয়েছে পথে। যে বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার কথা, সহপাঠীদের সাথে খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সেই রহমানকে শুরু করতে হয়েছে জীবন-সংগ্রাম। চুয়াডাঙ্গা শহরের রেলওয়ে স্টেশনের বস্তির পাশে একটি টিনের বাড়িতে দুটি ঘর নিয়ে ভাড়া থাকেন তারা। প্রতি মাসে ৫ শ টাকা দিতে হয়। ছোট আব্দুল্লাহকে সাথে নিয়ে বাড়ির উঠানেই রহমান আপনমনে খেলা করছে।

জানা গেছে, সাতক্ষীরার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নের বলাডাঙ্গা গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ে আম্বিয়া খাতুনের ১৩ বছর আগে বিয়ে হয় যশোর মণিরামপুরের বাদাম বিক্রেতা আক্তার বিশ্বাসের সঙ্গে। কিন্তু এখানে এসেও পিছু ছাড়েনি দরিদ্রতা। আম্বিয়ার স্বপ্ন ছিল স্বামীকে নিয়ে ছোট্ট একটি সংসার করবেন। স্বামী-সন্তানদের নিয়ে গড়ে তুলবেন সুখের সংসার। পরে কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে সাতক্ষীরা থেকে আম্বিয়া খাতুন স্বামী আক্তার বিশ্বাসের হাত ধরে চলে আসেন চুয়াডাঙ্গা শহরে। থাকতেন একটি বস্তিতে। স্বামীর বাদাম বিক্রির টাকা দিয়ে কোনো মতে চলত তাদের সংসার। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আম্বিয়ার কোলজুড়ে আসে আবদুর রহমান। স্বামীর স্বল্প আয় থেকে কিছু টাকা জমাতে থাকেন আম্বিয়া।
২০১৮ সালে খুলনার শিরোমণির গিলাতলা মোহাম্মদীয়া হাফেজিয়া মাদরাসায় ভর্তি করান ছেলে রহমানকে। ২০১৯ সালের মার্চে সারাদেশে করোনা ছড়িয়ে পড়লে আবদুর রহমানকে মাদরাসা চলে আসতে বলে কর্তৃপক্ষ। আবদুর রহমান হাফেজিয়া পড়ার পাশাপাশি ওই মাদরাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ালেখা করত। অভাব যখন নিত্যসঙ্গী, ঠিক তখনই আম্বিয়ার গর্ভে আসে আরেক সন্তান। এমনিতেই করোনার ভয়াবহতার মধ্যে সংসার চলে না, তার ওপর আরেক অতিথি। ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে প্রসব বেদনা উঠলে স্ত্রীর মরণাপন্ন অবস্থা দেখা দেয়। পরে যে সম্বল ছিল, তা নিয়ে আক্তার বিশ্বাস আম্বিয়াকে ভর্তি করান হাসপাতালে। সন্তান প্রসবের বেদনা কমতে না কমতে আরেকটি দুঃসংবাদে যেন আম্বিয়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ট্রাকের ধাক্কায় পঙ্গুত্ব বরণ করেন। তাই বাধ্য হয়ে আম্বিয়া ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে হুইল চেয়ারে বসে শহরের বিভিন্ন স্থানে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতেন। আর হুইল চেয়ার ঠেলত আবদুর রহমান। এভাবেই চলছিল তাদের সংসার। কিডনির সমস্যা এবং জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার ফার্মপাড়ার ভাড়া বাড়িতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান মা আম্বিয়া খাতুন। এরপর শুরু হয় আব্দুর রহমানের জীবনযুদ্ধ।
আব্দুর রহমান জানান, তার পঙ্গু মাকে হুইল চেয়ারে ঠেলে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে সাহায্য তুলতো সে। তখন ছোট ভাই আব্দুুল্লাহ মায়ের কোলেই থাকত। মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েই চলছিল তাদের সংসার। কিডনিজনিত কারণে গত ৪ মাস আগে মায়ের মৃত্যু হয়। এরপর থেকে সে নিজেই ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে যা পায়, তা দিয়েই সংসার চালাচ্ছে। রহমান বলে, ‘ছোট ভাইকে খাওয়ানো থেকে শুরু করে ঘুম পাড়ানো সবই আমি করি। কারণ বাবা তো অসুস্থ। এছাড়া ঘরের সমস্ত কাজ, বাবার গোসলের পানি তুলে দেওয়া সবই করতে হয়। তবে এসব আমার ভালো লাগে না। আমি পড়াশোনা করতে চাই। আর কেউ যদি একটা বাড়ি করে দিত, তাহলে আমাদের খুব ভালো হতো।’
বাড়ির মালিক নুরুল ইসলামের স্ত্রী বলেন, ‘বাড়ি ভাড়ার জন্য আমরা চাপ দিই না। যা পারে তাই দেয়। বেশ কিছুদিন যাবত আমাদের এখানেই আছে। আব্দুর রহমান সাহায্য তুলে যা পায়, তা দিয়েই চলে সংসার। আমার কাছে খুব খারাপ লাগছে। সরকার যদি তাদের একটা বাড়ি করে দেয়, তাহলে তাদের কিছুটা দুঃখ লাঘব হবে।’

আব্দুর রহমানের বাবা আক্তার বিশ্বাস বলেন, ‘সৎ মায়ের জন্য আমি পরিবার ছেড়েছি। বছর খানেক আগে ফেরি করে বাদাম বিক্রির সময় ট্রাকের ধাক্কায় আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করি। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। কোনোভাবে চলাফেরা করতে পারি। রহমান সাহায্য তুলে যা পায়, তা দিয়েই সংসার চলে। বিভিন্ন সময় জেলা-উপজেলা প্রশাসন কিছুটা সহযোগিতা করেছে। তা দিয়ে চিকিৎসা করেছি। সরকারের নিকট আবেদন, আমাকে যেন একটা ঘর করে দেয়। তাহলে হয়তো কিছুটা কষ্ট কমবে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তাদেরকে যাবতীয় কাগজপত্র নিয়ে আমার অফিসে আসতে বলা হয়েছিল। পরে আর আসেনি। তারা আসলে আমি তাদেরকে সরকারিভাবে বাড়ি করে দিব। এছাড়া বাচ্চাটির বাবা চাইলে দোকানও করে দেওয়া হবে।’

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।