চুয়াডাঙ্গা সোমবার , ২১ মার্চ ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জীবননগরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে বাসক পাতা

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
মার্চ ২১, ২০২২ ৮:০৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

মিঠুন মাহমুদ:

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার সীমান্ত ইউনিয়নের গঙ্গাদাশপুরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয়েছে ওষুধ পাতা বাসকের। বাসক পাতা অনেকের কাছে প্রয়োজনীয় মনে নাহলেও ভেষজ চিকিৎসায় এ গাছের পাতার জুড়ি নেই। বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে কিংবা জমির ফসলের নিরাপত্তার জন্য আইল (বেড়া) দেওয়ার জন্য এটি লাগিয়ে থাকেন। বহুকাল থেকে গ্রামের সাধারণ মানুষ ঠাণ্ডা-কাঁশির ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে আসলেও আমাদের দেশে বাসকের বাণিজ্যিকভাবে চাষ নেই বললেই চলে। সম্প্রতি জীবননগর উপজেলার গঙ্গাদাশপুর গ্রামে বাসক পাতার চাষ হতে দেখা যাচ্ছে।

গঙ্গাদাশপুর গ্রামের জবেদ আলীর বাড়ি থেকে শুরু করে ইনামুলের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে এবং গ্রামের বেশ কিছু মাঠে প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে এই পাতার চাষ হচ্ছে। প্রথমদিকে গবাদি পশুর হাত থেকে জমির ফসল রক্ষার জন্য বেড়া এবং বাড়ির সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বাসক পাতার গাছ লাগানো হলেও এখন ধারণা পাল্টেছে। দেশের বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা এসে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মণ কাঁচা পাতা ৩ শ টাকা এবং প্রতি মণ শুকনা পাতা ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা দরে ক্রয় করছেন। আর এ কারণে বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে এটি চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন স্থানীয়রা।

বাসকের বৈজ্ঞানিক নাম আধাটোডা ভাসিকা (অফযধঃড়ফধ ঠধংরপধ)। এটি আর্দ্র ও সমতলভূমিতে বেশি হয়ে থাকে। বাসকের আরেক নাম বসায় বা বাকসা। সবুজ ও হালকা হলুদ রঙের ডালপালাযুক্ত ১ থেকে ২ মিটার উঁচু গাছ, ঋতুভেদে সর্বদায় প্রায় সবুজ থাকে। পাতা বেশ বড়। গঙ্গাদাশপুর গ্রামের হাফেজ ইকবাল হোসেন, বাদল, জামাল উদ্দিনসহ প্রায় ১৫ জনের মতো কৃষক তাঁদের বাড়ি ও ফসলি জমির পাশে গত ৩-৪ বছর ধরে বাসক পাতা গাছের চাষ করছেন। এই গ্রামের জিয়ারুল ইসলাম চার বছর আগে প্রথম তাঁর বাড়ির চারপাশে বাসক পাতার গাছ লাগান। উদ্দেশ্য ছিল বেড়া দিয়ে জমি রক্ষা, অন্যদিকে সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি। দু’বছর পর যশোর থেকে আসা কিছু লোক নামমূল্য টাকায় বাসকের সবুজ পাতা কিনে নিয়ে যান। এরপর থেকে নিয়মিত তাঁরা এসে টাকার বিনিময়ে বাসকের পাতা সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে থাকেন।

জিয়ারুলের দেখাদেখি গ্রামের অনেকেই বাসক গাছের চাষ শুরু করেন। এই বাসক গাছ একদিকে গবাদি পশুর হাত থেকে জমির ফসল রক্ষায় বেড়া হিসেবে কাজ করে, অন্যদিকে এর পাতা বিক্রি করা হয়। দেশের বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা এসে কৃষকদের কাছ থেকে এই পাতা সংগ্রহ করে নিয়ে যান। এই গ্রামের কৃষকরা বছরে ৩ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত এই বাসক পাতা বিক্রি করেন। এ ছাড়া সারা বছরই স্থানীয়রা ঠাণ্ডা-কাঁশির ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন।

জীবননগর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানা গেছে, স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় সীমান্ত ইউনিয়নের গঙ্গাদাশপুর গ্রামের জিয়ারুল ইসলাম, আফসার আলী, বাদল হোসেনসহ গ্রামের আরও বেশকিছু কৃষক বাসক পাতার চাষ শুরু করেছেন। এটার বাণিজ্যিক বাজার মূল্য এবং চাহিদাও ভালো।

বাসক পাতার পাইকারী ক্রেতা যশোরের ইদ্রিস আলী জানান, তিনি জীবননগর উপজেলার গঙ্গাদাশপুরসহ এলাকার বেশকিছু  গ্রাম থেকে কাঁচা ও শুকনা বাসক পাতা ক্রয় করে থাকেন। বছরে তিনি ৩-৪ বার এই পাতা ক্রয় করেন। এক মণ কাঁচা পাতা ৩ শ টাকা আর এক মণ শুকনা বাসক পাতা ১ হাজার থেকে ১৩০০ টাকা পর্যন্ত দরে ক্রয় করে থাকেন। এই পাতা কৃষক পর্যায় থেকে ক্রয় করে তিনি বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেন।

কৃষি কর্মকর্তা মো. আতিকুর আলম জানান, জীবননগর উপজেলায় প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে বাসক পাতা চাষ হচ্ছে। এ অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটি বাসক গাছ চাষের জন্য উপযোগী। ফলে রাস্তা ও বাড়ির পাশের পড়ে থাকা অব্যবহৃত জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিরাট এক পরিবর্তন ঘটবে।

জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আয়ুর্বেদিক মেডিকেল অফিসার ডা. আফিন্দা রাজ্জাক বলেন, বাসকের কাঁচা ও শুকনো পাতা ঔষধি হিসেবে কাজে লাগে। বাসকের পাতায় ভাসিসিন নামের ক্ষারীয় পদার্থ ও তেল থাকে। শ্বাসনালীর লালাগ্রন্থিকে সক্রিয় করে বলে বাসক শ্লেষ্মনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাসক পাতার রস ব্যবহার করা হয়। এতে সর্দি, কাঁশি ও শ্বাসনালীর প্রদাহমূলক ব্যধিতে বিশেষ উপকারী। যেহেতু বর্তমানে বাসক পাতার বাণিজ্যিক মূল্য রয়েছে, সে ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে পরিবর্তন ঘটতে পারে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।