চুয়াডাঙ্গা বুধবার , ২০ মার্চ ২০১৯
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জাতীয় নির্বাচনের প্রতিক্রিয়া উপজেলায় : ভোটার উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা

সমীকরণ প্রতিবেদন
মার্চ ২০, ২০১৯ ৯:৩০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

চুয়াডাঙ্গায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচন উপলক্ষে বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা সভা অনুষ্ঠিত
এসএম শাফায়েত:
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা সভা। অবাধ, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আয়োজিত সভায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, ইউপি চেয়ারম্যান, প্রিজাইডিং অফিসার, সুধীজন এবং মিডিয়া কর্মীদের বক্তব্যে উঠে আসে নানা আশঙ্কার কথা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়মের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এই উপজেলা নির্বাচনে একই রকম ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটবে কী না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন আলোচক-প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অনেকে। এদিকে, ভোটের বাকী আর কয়েকদিন। কিন্তু এখনও নিরুত্তাপ ভোটের মাঠ। যে কারণে সাধারণ ভোটাররা আদৌ ভোট দিতে কেন্দ্রে আসবে কী না এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। কারণ জানতে চাইলে সামনে আসে সদ্য সমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হালচিত্র। বক্তাদের দাবি, সংসদ নির্বাচনের যত অনিয়ম, কারচুপি, কেন্দ্র দখল, জালভোটসহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে তা সাধারণ ভোটারদের মাঝে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি করেছে। যার ফলে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন সাধারণ ভোটাররা। তাদের মধ্যে ভোট নিয়ে নেই কোন উৎসাহ। তবে অতীতের সবকিছু ভুলে বর্তমান ও আগামী নিয়ে ভাবনার কথা বলেছেন অতিথিরা।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১০টায় সদর উপজেলা পরিষদ হলরুমে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে নির্বাচন উপলক্ষ্যে বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা সভা আহ্বান করা হয়।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক গোপাল চন্দ্র দাস। তিনি বলেন, ‘কেউ যদি নির্বাচনের আগের রাতে কিংবা নির্বাচনের দিন কোন প্রকার আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেন তবে কঠোর হস্তে দমন করা হবে। ওইদিন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চাইলে গুলিও করতে পারবে। কোন প্রকার প্রভাব বিস্তার চলবে না। এই নির্বাচন শতভাগ অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা- কোন প্রকার প্রভাব বিস্তার চলবে না, কোন প্রকার আচরণ বিধি লঙ্ঘন চলবে না। সারাদেশের মধ্যে খুলনা বিভাগ, খুলনা বিভাগের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা জেলা ১ নম্বর হবে এই নির্বাচনে।’
তিনি নির্বাচনী কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘অতীতের যে কোন নির্বাচনের থেকে এ নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসারদের প্রচুর টাকা দেয়া হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ভোট কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কারো বাড়িতে গিয়ে খাওয়ার দরকার নাই। কেন্দ্রে খিচুড়ি রান্না করে খাবেন। নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে নিজেদের নিরপেক্ষ রাখতে হবে। কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না। নির্বাচনী মালামাল গ্রহণ করে কেন্দ্রে যাবেন এবং রাত্রিযাপন করবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত সকলে। এর ব্যত্যয় ঘটলে তার বিরুদ্ধে নির্বাচনী কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ প্রয়োগ করতে বাধ্য হবো। যেখানে সর্বোচ্চ সাঁজা দুই বছরের কারাদন্ড।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান পিপিএম (বার) বলেন, ‘আমরা আপনাদের সহযোগিতায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত। এ জেলায় যা কিছু ভালো তার সুফল আপনারাই ভোগ করবেন। একটা সুষ্ঠু নির্বাচন যদি হয়, সেটির সুফল আপনারা যেভাবে ভোগ করবেন। যদি সুষ্ঠু না হয় তার দুর্ভোগ আপনাদেরকেই ভোগ করতে হবে। সুতরাং সহযোগিতা উভয় পক্ষ থেকে আসতে হবে। কেন্দ্রে যারা আইন-শৃঙ্খলা ও ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকবে তাদের পুরোপুরি নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করবো। সম্মানিত ভোটাররা সবাই নিশ্চিন্তে ভোট কেন্দ্রে আসবে। যার ভোট যে দেবে, যাকে খুশি তাকে দেবে। কোথাও কোন প্রভাব বিস্তার হবে না, এ ক্ষেত্রে আমরা সর্বাত্মক ভাবে চেষ্টা করবো। সুষ্ঠু ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে আমাদের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোথাও কোন অপ্রিতিকর বিশৃঙ্খল ঘটনার খবর পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে আমরা প্রস্তুত। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সকলের আন্তরিকতা প্রয়োজন।’
চুয়াডাঙ্গা-৬ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ানের পরিচালক লে. কর্ণেল ইমাম হাসান মৃধা বলেন, ‘নির্বাচনে বিজিবি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে প্রস্তুত থাকবে। যদি কোথাও কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সমর্থনের প্রয়োজন হয় তবে বিজিবি তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে। আমরা (বিজিবি) চুয়াডাঙ্গার নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করবো। আপনারা সার্বিক পরিস্থিতি আমাদেরকে জানাবেন। আগামী ২০/২১ তারিখ থেকে চুয়াডাঙ্গার চারটি উপজেলায় বিজিবি’র ১ প্লাটুন করে ফোর্স স্ট্রাইকিং থাকবে। আমি আশা করি, আগামী নির্বাচন আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অত্যন্ত সুন্দর এবং উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠিত হবে।’
উন্মুক্ত এই আলোচনায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে বক্তব্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী আসাদুল হক বিশ্বাস বলেন, ‘আমার বিশ্বাস আছে এ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাবে হবে। সঠিক ভাবে নির্বাচন হবে এই প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলেছি। আমরা কোনও প্রার্থী কারো বিরুদ্ধে কথা না বলে যোগ্যতা অনুযায়ী জনগণের কাছে ভোট দেয়ার আহ্বান জানাবো। আমার বিশ্বাস সুন্দর পরিবেশের মধ্যে দিয়েই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটন বলেন, ‘আমাদের দেশে নির্বাচন একটা উৎসবে রূপ নেয়। সেই নির্বাচন যদি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ হয় তাহলে সব শ্রেণী পেশার, বিশেষ করে ভোটাররা মনে করে তাদের উৎসব পরিপূর্ণ হয়েছে। তাই এই নির্বাচনটা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করতে হবে। এ কাজে প্রশাসনের সঙ্গে দায়িত্ব আমাদেরও। আমরা সবাই সবার অবস্থান থেকে চাইলেই এ নির্বাচন ভাবে সম্পন্ন হবে। অতীতে কী হয়েছে সেটা বড় কথা নয়। বর্তমানে সামনে যে নির্বাচন আসছে সেটা অত্যন্ত স্বচ্ছ করতে হবে।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী নঈম হাসান জোয়ার্দার বলেন, ‘আমরা যতই বলি ভোটারের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য। আমাদের কথা মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না। কারণ আমরা তাদের মতো কথা বলতে পারিনা। প্রতি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সমন্বয়ে সেমিনার করলে ভোটারদের উপস্থিতি ভালো হবে। এবং প্রিজাইডিং অফিসারদের মধ্যে যেন ভয়ভীতি না থাকে তাহলে ভোট চুরির সম্ভাবনা থাকবে না।’
জাকের পার্টির চেয়ারম্যান প্রার্থী শফি উদ্দীন বলেন, ‘ভোটাররা কেন্দ্রে আসতে একটু অনীহা প্রকাশ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি- প্রত্যেক ইউপি চেয়ারম্যান যদি একদিন করে মাইক দিয়ে প্রচার করে তাদের এলাকায়, তবে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে পারে।’
বাংলাদেশের ওয়ার্কাস পার্টির চেয়ারম্যান প্রার্থী মামুন অর রশিদ বলেন, ‘বিগত একাদশ জাতীং সংসদ নির্বাচনে যা হয়েছে তা আর আমরা স্মরণ করতে চাই না। আমরা চাই সুষ্ঠু, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে বিগত দিনের যে কালিমা তা মুছতে।’
ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী আজিজুল হক হযরত বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারণাকালে আমি সদর উপজেলার সকল ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় ঘুরেছি। সব জায়গায় লক্ষ্য করেছি সেখানকার প্রার্থীদের মাঝে ভোট নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পরই এক শ্রেণীর মানুষ সাধারণ জনগণের মধ্যে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমরা ভোট প্রার্থনা করছি, আর তারা ভোট না দিতে যাওয়ার জন্য নিরুৎসাহিত করছে।’
ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী মামুন অর রশিদ আঙ্গুর বলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে ডিজিটাল ব্যানার-ফেস্টুন এখনও ঝুলছে। প্রশাসনের নির্দেশনায় আমরা অনেকে সরিয়ে ফেলেছি। আবার অনেকে এখনও সেভাবেই রেখে দিয়েছেন।’
গরীব রুহানী মাসুম বলেন, ‘কোন প্রতিপক্ষ যেন প্রভাব বিস্তার না করতে পারে এ ব্যাপারে প্রশাসন আমাদের সহযোগিতা করলে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও সুন্দর হবে।’
মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী সাহাজাদী আলম মিলির কোন অভিযোগ না থাকলেও প্রচারণায় কিছুটা সংকটের কথা তুলে ধরেন অপরপ্রার্থী মাসুমা আক্তার। তিনি উল্লেখ করেন, তার ফুটবল প্রতীকের পোস্টার-ব্যানার বিভিন্ন স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে তিনি প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন।
ইউপি চেয়ারম্যানদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মোমিনপুর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক জোয়ার্দ্দার। তিনি বলেন, ‘বিগত নির্বাচনের তুলনায় এই ভোট নিরুত্তাপ। ভোটাররা ভোট দিতে যাবে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে এরকম মানসিকতা তৈরি হয়েছে। এরূপ মানসিকতা কেনো হয়েছে, কীভাবে হয়েছে আমি বলতে পারবো না। কিন্তু এখন প্রার্থীদের দায়িত্ব ভোটারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।’
বেগমপুর ইউপি চেয়ারম্যান আলী হোসেন বলেন, ‘এই নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সদর উপজেলার যে ৫জন চেয়ারম্যান প্রার্থী রয়েছেন তাদের আন্তরিকতা থাকতে হবে। তাদের আন্তরিকতা থাকলে সাধারণ ভোটাররা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পারবে। তবে জনগণের মাঝে ভোট নিয়ে খুব একটা উৎসাহ নেই। যেহেতু কিছুদিন আগে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, সেই নির্বাচনে মানুষজন ভোট দিতে পারেনি। এ কারণে তাদের মধ্যে ভোটের আন্তরিকতা অনেকটা কমে গেছে। আমি চাইবো এই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটের অধিকার যেন ফিরে পায়। বর্তমান সরকারের প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যেন প্রশাসনের সঙ্গে আন্তরিকতা রেখে কাজ করে।’
নির্বাচনে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম নিয়ে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, ‘প্রত্যেকটা প্রার্থী প্রতিটি কেন্দ্রে ১ জন করে পোলিং এজেন্ট, যা আগের দিন সন্ধ্যায় কেন্দ্রে জমা দিলে ভালো হয়। কিন্তু ভোট গ্রহণের দিন প্রার্থীল পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতি হতে অনেক দেরি হয়, যে কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম কিছুটা বাঁধাগ্রস্ত হয়। এবং ভোট গণনার সময় ১ জন উপস্থিত থাকবেন প্রার্থীর প্রতিনিধি।’
এ ছাড়াও বক্তব্য রাখেন কুতুবপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবু হাসানুজ্জামান মানিক, তিতুদহ ইউপি চেয়ারম্যান আক্তার হোসেন, আলুকদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ইসলাম উদ্দীন বিশ্বাস, পদ্মবিলা ইউপি চেয়ারম্যান আবু তাহের বিশ্বাস, শংকরচন্দ্র ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান, প্রিজাইডিং অফিসার মনিরুজ্জামান প্রমুখ। বিশেষ এ আইন-শৃঙ্খলা সভায় সভাপতিত্ব করেন সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াশীমুল বারী।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।