জাতীয় গ্রীডের সাথে গোটা দক্ষিনাঞ্চলের বিদ্যুত সরবরাহ বিচ্ছিন্ন : ঝড়ে ভাঙা টাওয়ার মেরামতে অনিশ্চয়তা অসহ্য গরমে অসহনীয় লোডশেডিং : এ যেন মরার উপর খাড়ার ঘা চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহের প্রায় ছয় লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকসহ জনজীবন বিপর্যস্ত : স্থানীয় পত্রিকা প্রকাশে বিপত্তি

340

এমএ মামুন/কাজল চৌধুরী: বৈরী আবহাওয়া প্রচন্ড তাপদাহ তার উপর বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং এই দু’য়ে চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ’র মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছে। বিপাকে পড়েছে এই্ দুই জেলার প্রায় ছয় লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক। অনিশ্চয়তায় জাতীয় গ্রীডের টাওয়ার মেরামতের কাজও। দিনের ২৪ঘন্টার মধ্যে ১২ঘন্টায় লোডশেডিং। চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলার প্রায় ছয় লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকসহ এই দুই জেলার লাখ লাখ মানুষ অসহনীয় লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তীর শিকার। সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে গ্রাহকরা অসহনীয় লোডশেডিংয়ে ভোগান্তীতে পড়েছে। মানুষ বিদ্যুতের এই বিপর্যয় থেকে মুক্তি পেতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছে। বিদ্যুতের অসহনীয় লোডশেডিং ও তাপ প্রবাহের কারণে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালসহ জেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলিতে সকল বয়সের মানুষ অস্বাভাবিক হারে ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এদিকে, বাংলাদেশ  দোকান মালিক সমিতি চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার পক্ষ থেকে চুয়াডাঙ্গায় নিরিবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবীতে ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে এক আল্টিমেটামসহ স্মারকলিপি প্রদান করেছে। তবে, কর্তৃপক্ষের ভাষ্য জাতীয় গ্রীডের মেরামত কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পূর্ব-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কোন সম্ভাবনায় নেই।
মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চুয়াডাঙ্গা জোনাল অফিসের ডিজিএম হাবিবুর রহমান ও ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী সবুক্তগীন শোভন জানান, গত ১লা মে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের ২৩০ কেভি’র উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জাতীয় গ্রীডের টাওয়ার ঝড়ে ভেঙে যায়। এরপর থেকে  দেশের পূর্ব-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। এর ফলে উল্লেখিত অঞ্চলগুলিতে অসহনীয় লোডশেডিং শুরু হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা জেলায় মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও ওজোপাডিকো’র সর্বমোট ২ লাখ ১৫ হাজার আবাসিক অনাবাসিক গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে ১০ ভাগ অনাবাসিক অবশিষ্ট ৯০ ভাগ আবাসিক গ্রাহক। তবে, চুয়াডাঙ্গা বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের আওতাধীন চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা শহরে ওজোপাডিকো’র রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার গ্রাহক। এই ৩০ হাজার গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১৮ মেগাওয়াট। অথচ চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা ও মেহেরপুর শহর মিলে বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ১২ মেগাওয়াট। তবে, কর্তৃপক্ষ এই অল্প সরবরাহের কারণ দেখালেও সাধারণ গ্রাহকরা তা মানতে নারাজ। গ্রাহকদের অভিযোগ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে গ্রাহকরা অসহনীয় লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তবে, গ্রাহকের কথা পুরোপুরি স্বীকার না করলেও উল্লেখিত দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যাক্তিরা গ্রাহকদের অভাবনীয় ভোগান্তীর কথা স্বীকার করেন। তারা আরো জানান, ঝড়ে ভেঙে পড়া জাতীয় গ্রীড টাওয়ার মেরামতে প্রায় চার মাস সময় লাগবে। আর এই সময় পর্যন্ত স্বাভাবিক বিদ্যুত সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।
এ দিকে আমাদের ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানিয়েছে, ঝিনাইদহ জেলার প্রায় সাড়ে তিন লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক। কলকারখানা বন্ধ থাকছে প্রায় সময়। সেচ কাজে পাওয়া যাচ্ছে না বিদ্যুৎ। স্থানীয় পত্রিকা প্রকাশে ঘটছে বিপত্তি। গরমে মানুষের প্রান ওষ্ঠাগত। মানুষ ও প্রনীকুল সব যেন হাঁসফাঁস করছে। বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কোন প্রশান্তি মিলছে না। নেই আরামদায়ক কোন পরিবেশ। ঘনঘন এই লোডশেডিং অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। আগের দিনে এতো গরম পড়েনি বলে মানুষ লোডশেডিংয়ের জ্বালা বুঝতো না- এমন কথা বলাবলি করছে মানুষ। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে কেন এই ভয়াবহ লোডশেডিং? অনুসন্ধান করে জানা গেছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ত্রুটির কারণে উৎপাদন কম হচ্ছে। ফলে গ্রীডগুলোকে লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। সেইসাথে নরসিংদী জেলায় বৈদ্যুতিক একটি বড় টাওয়ার ভেঙে পড়ার কারণে জাতীয় গ্রীডের সাথে গোটা দক্ষিনাঞ্চল বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এই দুটি কারণে দেশের ৩২টি জেলায় চলছে স্মরন কালের ভয়াবহ লোডশেডিং। তথ্য নিয়ে জানা গেছে, ঝিনাইদহ জেলায় পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৪২১। অন্যদিকে ওয়েষ্টজোন পাওয়ার ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এর গোটা জেলায় গ্রাহক সংখ্যা প্রায় এক লাখ। পল্লী বিদ্যুৎ ও ওজোপাডিকো মিলে মোট গ্রাহক হবে সাড়ে তিন লাখের উপরে। এসব গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন ঝিনাইদহ জেলায় বিদ্যুৎ দরকার নব্বই মেগাওয়াট। ঝিনাইদহ পল্লী বিদ্যুতের জিএম প্রকৌশলী আলতাফ হোসেন জানান, পল্লী বিদ্যুতের যে গ্রাহক রয়েছে তাতে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে ৫৫ মেগাওয়াট বরাদ্দ প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেওয়া হয় ১৮ থেকে ২০ মেগাওয়াট। এই বরাদ্দ দিয়ে ফিডারগুলো সর্বক্ষন চালু রাখা সম্ভব নয়। যে কারণে নিরুপায় হয়ে লোডশেডিং করতে হয়। তিনি বলেন, গ্রাহকরা মনে করেন বিদ্যুত আটকে রেখে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। কিন্তু আসলে বিদ্যুৎ যখনই উৎপাদন তখনই সরবরাহ করতে হয়। ভ্রান্ত ধারনার কারণে গ্রামাঞ্চলে পল্লী বিদ্যুতের কর্মীদের নাজেহাল, এমনকি মারধর করা হচ্ছে। তিনি বলেন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ভেঙে পড়া টাওয়ার মেরামত হলে পরিস্থতি অনেকটা স্বাভাবিক হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ঝিনাইদহ ওজোপাডিকো’র নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম জানান, আমরা গ্রাহকদের সেবা দিতে কোন কার্পন্য করি না। বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে না পারলে আমাদের করার কিছুই নেই। তিনি বলেন ওজোপাডিকো’র চাহিদা যা ছিল দিনকে দিন তা বাড়ছে। গ্রাহকদের বুঝতে হবে বিদ্যুৎ আটকে রাখার জিনিস নয়। তিনি বলেন পিক আওয়ারে আমাদের চাহিদা ৪২ আর অফপিক আওয়ারে ৩০। কিন্তু এর বিপরীতে পিক আওয়ারে ২২ ও অফ পিকে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুত সরবরাহ করা হয়। তারপরও ঝড় বৃষ্টি ও ত্রুটির কারণে গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধা হয়। অভিযোগ উঠেছে বিদ্যুৎ বিভাগের উপর প্রভাব বিস্তার করার কারণে অনেক ফিডারের গ্রাহকরা বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত হন। নেতাদের মেয়ের বিয়ে, জরুরী মিটিং, প্রশাসনের লোকজনের সভা ইত্যাদী কারণে অন্য ফিডার বন্ধ করে প্রভাবশালীদের চাহিদা মেটাতে হয়। ঝিনাইদহ গ্রীড স্টেশনের কর্মকর্তারা এই তথ্য দিয়ে বলেন, আমরা খুব বিপদে আছি। এদিকে সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ বিনা নোটিশে অনেক সময় বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়। রোববার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বন্ধ রেখে গাছের ডালপালা কাটার কারণে মানুষ বিপাকে পড়েন। আবার সময়ের কাজ সময়ে না করার কারণে লাইনে ত্রুটি দেখা দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হচ্ছে।