জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে বিএনপি

199

সমীকরণ প্রতিবেদন:
চলতি মাস থেকেই সরকারবিরোধী আন্দোলন বেগবান করতে চায় বিএনপি। এর অংশ হিসেবে আগামী ২০ জুলাই চট্টগ্রামের বিভাগীয় মহাসমাবেশের মাধ্যমে আন্দোলনের সূচনা করার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বিগত সময়ে হরতাল অবরোধের কর্মসূচি দিয়ে বিপর্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবার এ ধরনের কোনো কর্মসূচি না দিয়েই সফলতা পেতে চায় দলটি। আন্দোলনের সঙ্গে যাতে সরাসরি জনগণ সম্পৃক্ত হয় সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে পরবর্তী ছক সাজানো হচ্ছে। বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেন, ঢাকাসহ সারাদেশে দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন ইস্যুর আন্দোলনে রাজপথ উত্তপ্ত করা সাধারণ মানুষের সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করে গণঅভ্যুত্থান ঘটানোই বিএনপির পরবর্তী পরিকল্পনা। এ লক্ষ্যে সাংগঠনিক প্রস্তুতি দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। আর আন্দোলনের ধরনের পরিবর্তন আনার বিষযটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সিনিয়র এই নেতার মতে, একসময় সরকারকে চাপে ফেলার আন্দোলন হিসেবে শুধু হরতাল অবরোধকেই ভাবা হতো। কিন্তু সময় পরিবর্তন হয়েছে। সাধারণ মানুষ আর ধ্বংসাত্মক কোনো কর্মসূচি চায় না। তবে অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চায়। কিন্তু পরিকল্পিত কোনো কর্মসূচি ও কার্যকরী দিক-নির্দেশনা ও নেতৃত্বের ঘাটতির কারণে আন্দোলন সফল হচ্ছে না। তাই জনগণকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ মাস থেকেই মাসব্যাপী কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। এই কর্মসূচিগুলো থেকেই জনগণ যাতে সম্পৃক্ত হয় তেমন নতুন ধরনের কর্মসূচি দেবে বিএনপি।
গত ২২ জুন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সারাদেশে বিভাগীয় মহাসমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপির স্থায়ী কমিটি। এর অংশ হিসেবে আগামী ২০ জুলাই বন্দর নগরীতে বিভাগীয় মহাসমাবেশ আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম বলেন, সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে। অনুমতি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে চাওয়া হয়েছে। এখনো অনুমতি না মিললেও পাওয়ার ব্যাপারে তারা আশাবাদী। এই কর্মসূচি থেকে নতুন ধারার রাজনীতি শুরু হবে মন্তব্য করে শামীম বলেন, এই সমাবেশে জনগণের উপস্থিতি প্রমাণ করবে তারা সরকারকে চায় না। খালেদা জিয়ার মুক্তি চায়। আর জনসম্পৃক্ত প্রতিটি ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে থাকতে চায়। বিএনপিও খালেদা জিয়ার মুক্তির পাশাপাশি জনগণের অধিকারের জন্য ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ সব ইস্যুতে মাঠে থাকার ঘোষণা দেবে মহাসমাবেশ থেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিএনপির দুর্বল কর্মসূচি দলের অনেক নেতাকর্মীই ভালোভাবে নেননি। মধ্যসারির কয়েকজন নেতা সিনিয়র নেতাদের সরাসরি বলেছে এই ইস্যুতে বিএনপির কঠোর কর্মসূচি দেয়া উচিত ছিল। বিএনপির কর্মসূচির সঙ্গে সাধারণ মানুষ সম্পৃক্ত হতো। জবাবে সিনিয়র নেতারা তাদের জানিয়েছে এ ব্যাপরে বড় ধরনের কর্মসূচি দেয়ার উচিত ছিল বলে মনে করেন দলের হাইকমান্ডও। কিন্তু আন্দোলনের জন্য সংগঠন গুছিয়ে আনার একেবারে শেষ পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ কোনো কর্মসূচিতে যাওয়া ঠিক হবে না বিবেচনায় দুর্বল কর্মসূচির মাধ্যমে দলের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। তবে এই ইস্যুতে কার্যকরী বড় ধরনের কর্মসূচি দেয়ার কথা এখনও ভাবা হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন বিএনপির মধ্য সারির প্রভাবশালী এক নেতা জানান, আসন্ন আন্দোলন কর্মসূচিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করাই বিএনপির প্রধান লক্ষ্য। এজন্য খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রধান দাবির সঙ্গে জনসম্পৃক্ত ইস্যুগুলোকে সামনে রেখেই আন্দোলন শুরু হবে। এরমধ্যে নিরাপদ সড়ক, গুম-খুন-ধর্ষণ নির্মূলে ব্যবস্থা নেয়ার দাবির পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম, নগরীতে যানজট, জলজট, বিষয়গুলো আসবে।
এই নেতা আরও বলেন, ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবী, উপজাতিসহ প্রতিদিনই বিভিন্ন দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। লোকবল কম থাকার কারণে ও অনেক বড় সমস্যার মাঝে ক্ষুদ্র সমস্যা নিয়ে ছোট পরিসরে আন্দোলন হওয়ায় মিডিয়ার দৃষ্টিতে আসে না। সে সব আন্দোলনকারীদের সঙ্গেও একাত্ম হতে চায় বিএনপি। সর্বস্তরের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে সুনির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে সব দাবি আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামার প্রস্তাব দিয়ে সর্বস্তরের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বিএনপি সূত্রমতে, এবার আন্দোলন সফল করতে বিএনপি সাংগঠনিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করে এনেছে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পুনর্গঠনও চলছে। সারাদেশে জেলা ও মহানগর কমিটি গঠনও দ্রুত গতিতে এগুচ্ছে। সারাদেশে দলের নেতাকর্মীদের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিএনপির ভবিষ্যৎ আন্দোলন সম্পর্কে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আন্দোলন ছাড়া অবস্থার পরিবর্তন হবে না। তবে যেই আন্দোলনের ফল পাওয়া যাবে না তেমন কর্মসূচিতে বিএনপি যেতে চায় না। আন্দোলনে সফল হতে হলে মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এজন্য মানুষকে রাস্তায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের এক তরফা জাতীয় নির্বাচনের পর দুই দফা সরকারবিরোধী আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি দীর্ঘদিন থেকে রাজপথের আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় রয়েছে। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দলের প্রধান খালেদা জিয়া বন্দি হওয়ার পরেও কঠোর কোনো কর্মসূচিতে যায়নি তারা। এমনকি গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক বিপর্যয়ের পর অনিয়মের অভিযোগ করলেও এখন পর্যন্ত নীরব আছে বিএনপি।