চুয়াডাঙ্গা শহরে বখাটেদের উত্ত্যক্তের শিকার ছাত্রীরা

300

images3চুয়াডাঙ্গা শহরে বখাটেদের উত্ত্যক্তের শিকার ছাত্রীরা
ইভটিজিংয়ের কারণে বাড়ছে বাল্যবিয়ে: নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি
অঞ্জন দত্ত: চুয়াডাঙ্গায় স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের উত্ত্যক্তের ঘটনা বেড়েই চলেছে। স্কুল-কলেজ, কোচিং ও প্রাইভেটে যাওয়া-আসার পথে বিভিন্ন অলিগলিতে বখাটেদের উত্ত্যক্তের শিকার হচ্ছে ছাত্রীরা। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ঝিনুক মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় ও রাহেলা খাতুন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়সহ জেলা শহরের স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা প্রতিনিয়তই বখাটেদের ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে। স্কুল-কলেজ ও কোচিংয়ে যাতায়াতের সময় তাদের বিভিন্ন অলিগলিসহ প্রধান সড়কেও উত্ত্যক্ত করছে বখাটেরা। সড়কে প্রকাশ্যে ছাত্রী উত্ত্যক্ত করা হলেও পথচারীরা নির্বাক দর্শক-শ্রোতার ভূমিকায় থাকে, কারণ যে প্রতিবাদ করে তার ওপরেও চড়াও হয় বখাটেরা। অন্যদিকে উত্ত্যক্তের শিকার কিছুকিছু ছাত্রীর অভিভাবক এর প্রতিবাদ করলেও কিছুতেই থামছে না বখাটেদের দৌরাত্ম। ফলে যেমন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে ভীতি সৃষ্টি হচ্ছে। তেমনি লোকলজ্জার ভয়ে নিরাপত্তাহীনতার কারণে মেয়ের ভবিষ্যত বিসর্জন দিয়ে অপ্রাপ্ত বয়সেই মেয়ের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন অভিভাবকেরা। যার কারণে শত চেষ্টার পরও বাল্যবিয়ে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চুয়াডাঙ্গা শহরের শহীদ আবুল কাশেম সড়কের শাপলা গেট, ভেনাস অটোর গলি, পোস্ট অফিসের গলি, ওয়াপদা এলাকা, ইমার্জেন্সী রোড, সাতভাই পুকুরপাড়- মুক্তিপাড়া-সিনেমাহল সড়ক, শিশু স্বর্গের সামনের সড়ক, কেদারগঞ্জ ফিরোজ রোডসহ শহরের বেশকয়েকটি অলি-গলিতে দল বেঁধে বখাটে যুবকদের দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে দেখা গেছে। বখাটেদের প্রাণকেন্দ্রে পরিনত হয়েছে ভিজে স্কুল মাঠ বা চাঁদমারী মাঠ। ঝিনুক স্কুলের পাশেই খেলার মাঠ হওয়ায় সহজেই সেখানে অবস্থান নেয় সঙ্গবদ্ধ বখাটেরা। যারা শহরে হাই ফাই বাইক হাকিয়ে বেড়ায়। স্কুল কলেজ শুরু এবং ছুটির সময় তার আশপাশেই অবস্থান নেয় তারা। শুধু স্কুল কলেজই নয়, শহরের বিভিন্ন স্থানে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা অবধি কিশোরী-যুবতীদের উত্ত্যক্ত করে বখাটেরা। অনেক বখাটে আবার তার গলাই ঝোলানো ক্যামেরা দিয়ে মেয়েদের অজান্তে তার ছবি তুলছে। ওই ছবি দেয়া হচ্ছে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। স্কুলগামী ছাত্রী ও কিশোরী-যুবতিদের ছবি তুলে অশ্লীল কথা লিখে ফেসবুকে আপলোড, কোমলমতি এসব ছাত্রীদের সাথে কৌশলে প্রেমজ সম্পর্ক তৈরী, প্রকাশ্যে স্কুলগামী ছাত্রীদের নিয়ে অশ্লীল মন্তব্যসহ প্রতিনিয়ত বখাটেদের ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে এসমস্ত মেয়ে শিক্ষার্থীরা।
শহরের বিভিন্ন স্থান ঘুরে আরো দেখা যায়, নামিদামী কোম্পানীর মোটরসাইকেল নিয়ে বিভিন্ন রং-ঢংয়ের পোশাকে উচ্ছৃঙ্খল যুবকরা স্কুল কলেজ ও কোচিং প্রাইভেটের রাস্তার প্রবেশ মুখে ছুটির আগে ও পরে দাঁড়িয়ে ছাত্রীদের ইভটিজিং করে থাকে। অধিকাংশ ইভটিজারই ক্ষমতাসীনসহ স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় রয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের সাথে ইভটিজারদের সখ্যতা রয়েছেও বলে জানিয়েছেন অভিভাবকেরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন ভীত সন্ত্রস্ত স্কুলছাত্রী অভিযোগের সুরে জানায়, প্রতিদিনই আমরা কয়েকজন সহপাঠী একসাথে স্কুল ও কোচিংয়ে যাতায়াত করি। শহরের কয়েকটি অলি-গলি ঘুরে আমাদের যাতায়াত করতে হয়। যাওয়া এবং আসার পথে কিছু বখাটে যুবক আমাদের উদ্দেশ্য করে আজেবাজে কথা বলে আর কৌশলে ছবিও তোলে। প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো অশ্লীল মন্তব্য করে। আবার অনেক বখাটে ছেলেরা আমাদের ছবি ফেসবুকে খারাপ ভাবে ছেড়ে দেওয়ার ভয়ও দেখায়।
এবিষয়ে এক অভিভাবক সমীকরণকে জানান, আমরা আমাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে সবর্দা চিন্তিত থাকি যে মেয়েটা রাস্তায় ইভটিজিংয়ের শিকার হয় কিনা! সমাজের সকল স্তরের লোকজনের ইভটিজিং প্রতিরোধে এগিয়ে আসার আহবান জানান এই অভিভাবক।
এবিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম জানান, ইভটিজিং প্রতিরোধে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। অভিযোগ পেলেই ইভটিজারদের আটক করে আইনের আওতায় নেয়া হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক সায়মা ইউনুস সমীকরণকে বলেন, ভুক্তভোগীসহ সমাজের সর্বস্তরের লোকজনের প্রতিবাদ করতে হবে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, গণ্যমান্য ব্যক্তিরা যদি ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করে তাহলে সমাজ থেকে এটা দূর করা সম্ভব। ইতোমধ্যে চুয়াডাঙ্গায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ইভটিজারদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাল্যবিয়ে এবং ইভটিজিং প্রতিরোধে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
নৈতিকতা, সামাজিক শৃঙ্খলাবোধ, পারিবারিক সচেতনতা ও শিক্ষা, বিনোদন ও খেলাধুলা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী, স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে শিক্ষামূলক নাটক, সিনেমা, ক্ষমতার সুষ্ঠু ব্যবহার ও সন্তানের প্রতি পিতা মাতার দায়িত্ববোধ এবং মাদকদ্রব্য, পর্ণোগ্রাফীর উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বিত কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণে সমাজ থেকে ইভটিজিং দূর করা সম্ভব।