চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহে আরও ২২ জনের মৃত্যু

32

২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ২২৬ জনের প্রাণহানি, আক্রান্ত আরও ১২ হাজার ২৩৬ জন
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশে টানা পাঁচদিন করোনায় আক্রান্ত হয়ে দৈনিক ২০০-এর ওপরে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে আরও ১২ হাজার ২৩৬ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ২২৬ জনের শরীরে। এদিকে, গতকাল চুয়াডাঙ্গায় করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে আরও আটজনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১১০ জনের শরীরে। গত পাঁচদিনে চুয়াডাঙ্গা সদরে শনাক্তে হার ৪৬.২৫ শতাংশ। গতকাল মেহেরপুরে করোনা আক্রান্ত হয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৩ জন। গতকাল ঝিনাইদহে করোনা ও উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের। নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে আরও ৯৪ জনের শরীরে।
চুয়াডাঙ্গা:
জেলায় করোনা শনাক্তের হার কমে আসলেও চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় টানা পাঁচদিন ধরে শনাক্তের হার প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। গত পাঁচদিনে জেলায় মোট করোনা আক্রান্ত হয়েছে ৬১৬ জন। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ২৮৫ জন, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ১২৩ জন, দামুড়হুদা উপজেলায় ১০৭ জন ও জীবননগর উপজেলায় ১০১ জন। উপজেলাভিত্তিক আক্রান্তের বিবেচনায় সদর উপজেলায় গত পাঁচদিনে শনাক্তের হার ৪৬.২৫ শতাংশ, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ১৯.৯৬ শতাংশ, দামুড়হুদায় ১৭.৩৭ শতাংশ ও জীবননগরে ১৬.৩৯ শতাংশ।
গতকাল চুয়াডাঙ্গায় করোনা আক্রান্ত হয়ে একজন ও উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ জনসহ মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে আরও ১১০ জনের শরীরে। গতকাল জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ চুয়াডাঙ্গার ৪৬৩টি নমুনার ফলাফল প্রকাশ করে। এরমধ্যে ১১০টি নমুনার ফলাফল পজিটিভ ও ৩৫৩টি নমুনার ফলাফল নেগেটিভ এসেছে। জেলায় নতুন আক্রান্ত ১১০ জনের মধ্যে সদর উপজেলার ৬০ জন, আলমডাঙ্গা উপজেলার ২৫ জন, দামুড়হুদা উপজেলার ১৬ জন ও জীবননগরের ৯ জন রয়েছে। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ২৩.৭৫ শতাংশ। এনিয়ে জেলায় মোট করোনা আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ১৬৫ জন। আক্রান্তদের মধ্যে সদর উপজেলার ২ হাজার ২১২ জন, আলমডাঙ্গার ৮৮৩ জন, দামুড়হুদায় ১ হাজার ৭৭ জন ও জীবননগরে ৯৯৮ জন। গতকাল জেলায় নতুন ৩৫ জন সুস্থ হয়েছে। এনিয়ে জেলায় মোট সুস্থ হয়েছে ২ হাজার ৯১০ জন।
গতকাল জেলায় করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে এ নিয়ে জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের। এর মধ্যে ১৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে জেলায় ও করোনা আক্রান্ত হয়ে আরও ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে জেলার বাইরে। এদিকে, এখন পর্যন্ত জেলায় চিকিৎসা সেবা কাজে নিয়জিত ৮৪ জন স্বাস্থ্যকর্মী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৭১ জন সুস্থ হয়ে তাঁদের কর্মস্থলে পুনঃরায় যোগদান করেছেন। অন্য ১৩ জন প্রাতিষ্ঠানিক ও হোম আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়াও গতকাল আলমডাঙ্গায় করোনা উপসর্গ নিয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
গতকাল সদর হাসপাতালের আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুকুর আলী নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। নিহত শুকুর আলী চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুলচারা গ্রামের মৃত্যু তাজিম আলীর ছেলে।
করোনা উপসর্গ নিয়ে সদর হাসপাতালের ইয়োলো জোনে মৃত্যু হওয়া পাঁচজন হলেন- চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার গুলশানপাড়ার মহর আলীর মেয়ে নাসিমা খাতুন (৬০), সদর উপজেলার কুশাঘাটা এলাকার মৃত নূর বক্সের মেয়ে সকিনা বেগম, আলমডাঙ্গা উপজেলার কুলপালা গ্রামের মৃত মফিদুল ইসলামের স্ত্রী মফিদা খাতুন (৮০), একই উপজেলার বাঁশবাড়িয়া গ্রামের রিকাত মণ্ডলের ছেলে জনাব আলী (৬৫) ও দামুড়হুদা উপজেলার কুড়ালগাছি গ্রামের আব্দুর সাত্তারের মেয়ে আশেরা বেগম (৪৪)। এছাড়াও আলমডাঙ্গায় করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হওয়া অন্য ছয়জন হলেন- কালিদাস পুর গ্রামের বাবলু আলী (৪৮), পারকুলা গ্রামের দরবেশ আলী (৬২), কালিদাসপুর গ্রামের মৃত রমজান আলীর ছেলে বাবলুর রহমান (৫৫), গোবিন্দপুর মাঠপাড়ার ঘরজামাই আব্দুস সাত্তার (৬০), পারকুলা গ্রামের মৃত মানিক জোয়ার্দ্দারের ছেলে ফিকির চাঁদ জোয়ার্দ্দার (৬০) ও অনুপনগরের ইদবার আলীর স্ত্রী আনারী খাতুন (৬৭)।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম ফাতেহ্ আকরাম জানান, গতকাল জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে সদর হাসপাতাল আইসোলেশনে একজন ও ইয়োলো জোনে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পর করোনা প্রটোকলে নিহতের লাশ পরিবারের সদস্যদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। করোনায় মৃত্যু হওয়া নতুন একজনসহ জেলায় আক্রান্ত হয়ে হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে মৃত্যু হয়েছে মোট ১৩২ জনের ও জেলার বাইরে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৬ জনের।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা পরীক্ষার জন্য গত সোমবার ৪৭৮টি, মঙ্গলবার ৩৭৩টি ও বুধবার ৪৭৮টি নমুনা সংগ্রহ করে করোনা পরীক্ষার জন্য কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে প্রেরণ করে। গতকাল উক্ত নমুনা ও পূর্বের পেন্ডিং নমুনার মধ্যে ৪৬৩টি নমুনার ফলাফল প্রকাশ করে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। গতকাল জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ আরও ৪৩৮টি নমুনা সংগ্রহ করে করোনা পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করেছে।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী জেলা থেকে এ পর্যন্ত মোট নমুনা সংগ্রহ ১৮ হাজার ৯৮১টি, প্রাপ্ত ফলাফল ১৮ হাজার ৬৫৩টি, পজিটিভ ৫ হাজার ১৬৫ জন। জেলায় বর্তমানে ২ হাজার ১০৪ জন হোম আইসোলেশন ও হাসপাতালের আইসোলেশনে রয়েছে। এরমধ্যে হোম আইসোলেশনে আছে ১ হাজার ৯৮০ জন ও হাসপাতাল আইসোলেশনে ১২৩ জন। জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের। এরমধ্যে জেলায় আক্রান্ত হয়ে জেলার হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে মৃত্যু হয়েছে ১৩২ জনের। এছাড়া চুয়াডাঙ্গায় আক্রান্ত অন্য ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে জেলার বাইরে।
মেহেরপুর:
মেহেরপুরে প্রতিদিনই করোনা আক্রান্ত হয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রাত নয়টায় মেহেরপুর সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ পরীক্ষিত ২২৪টি নমুনার ফলাফল প্রকাশ করে এর মধ্যে ৫৩টি নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে। নতুন আক্রান্ত ৫৩ জনের মধ্যে সদর উপজেলার ২৯ জন, গাংনী উপজেলার ১৬ জন ও মুজিবনগর উপজেলার ৮ জন রয়েছে। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ২৩.৬৬ শতাংশ।
মেহেরপুর সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মেহেরপুর জেলায় মোট পজিটিভ রোগীর সংখ্যা ৮৪৬ জন। এর মধ্যে সদরে ২৭২ জন, গাংনীতে ৪৬৭ ও মুজিবনগরে ১০৭ জন। এ পর্যন্ত মেহেরপুরে মারা গেছেন মোট ৮৮ জন। এর মধ্যে সদর উপজেলার ৩৭ জন, গাংনী ৩১ জন ও মুজিবনগরে ২০ জন।
ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহে গত ২৪ ঘন্টায় করোনা ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৯৪ জন। জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেলিনা বেগম জানান, গত বুধবার সকাল ৮ টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮ টা পর্যন্ত সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে চারজন ও উপসর্গ নিয়ে তিনজনসহ মোট ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তিনি আরও জানান, গতকাল ২৭৭ জনের নমুনার ফলাফল এসেছে। এদের মধ্যে ৯৪ জনের ফলাফল পজিটিভ এসেছে। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ৩৩.৯৩ শতাংশ। এনিয়ে নিয়ে জেলায় মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়ালো ৬ হাজার ৩৯ জন। এ জেলায় গত ২৪ ঘন্টায় কেউ সুস্থ হয়নি। গতকাল করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হওয়া চারজনের লাশ দাফন করেছে ইফার লাশ দাফন কমিটি। এরা হলেন- মহেশপুরের বগা গ্রামের আলী আরজানের ছেলে ইমান হোসেন (৩৫), শৈলকুপার কাজী ওয়াহিদের ছেলে কাজী শামীম হোসেন (৫৭), ঝিনাইদহ শহরের নতুন হাটখোলা সড়কের আবুল হোসেনের স্ত্রী পিরোজা বেগম ও হরিণাকুণ্ডুর মান্দিয়া গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে আকরাম হোসেন (৬২)।
সারা দেশ:
সারা দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এনিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ১৭ হাজার ২৭৮ জনে। এর আগে, ১১ জুলাই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২৩০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এনিয়ে টানা পাঁচদিন দুই শতাধিক মৃত্যু দেখলো দেশ। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ১২ হাজার ২৩৬ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে । এনিয়ে দেশে শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ১০ লাখ ৭১ হাজার ৭৭৪ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৬ হাজার ৬০৪ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হলেও ৪৪ হাজার ৯৪১ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। যেখানে শনাক্তের হার ২৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। এ পর্যন্ত শনাক্তের মোট হার ১৫ শতাংশ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, একদিনে নতুন করে সুস্থ হয়েছেন ৮ হাজার ৩৯৫ জন। এনিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীর সংখ্যা ৯ লাখ ৫ হাজার ৮০৭ জন। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মারা যাওয়া ২২৬ জনের মধ্যে ১০০ বছরের বেশি বয়সী দুজন। ৯১ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে তিনজন, ৮১ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে ২২ জন, ৭১ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে ৪৪ জন, ৬১ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে ৫০ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ৪৯ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ৩৬ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ১২ জন, ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ছয়জন, ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে একজন ও ০ থেকে ১০ বছরের মধ্যে একজন রয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়াদের মধ্যে পুরুষ ১৪০ জন ও মহিলা ৮৬ জন। যাদের মধ্যে বাসায় ২০ জন ছাড়া বাকিরা হাসপাতালে মারা গেছেন। একইসময়ে বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৭৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৪২ জন, রাজশাহী বিভাগে ২৪ জন, খুলনা বিভাগে ৫২ জন, বরিশাল বিভাগে ছয়জন, সিলেট বিভাগে পাঁচজন, রংপুর বিভাগে ১৩ জন ও ময়মনসিংহ বিভাগে ১০ জন মারা গেছেন। গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম ৩ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এর ১০দিন পর ১৮ মার্চ দেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম একজন ব্যক্তির মৃত্যু হয়।