চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ২৩ জানুয়ারি ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চুয়াডাঙ্গা তথা দেশের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবি মকবুলার রহমানের বর্ণাঢ্য জীবনের প্রস্থান

সমীকরণ প্রতিবেদন
জানুয়ারি ২৩, ২০২১ ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

– এম এ মামুন
পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তা গুণি-জ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবি মানুষ পাঠান মানুষের কল্যাণের জন্য এবং এসব জ্ঞানী মানুষের কর্মের দ্বারা মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্র উপকৃত হয়। রাষ্ট্রের ও জাতির জন্য একজন গুণি মানুষ সৃষ্টিকর্তার মূল্যবান দান বললেও ভুল হবে না। সমাজে গুণিদের কদর সবাই করতে পারেন না। আবার গুণিরাও মানব সমাজে সবার চোখে সমাদৃত নাও হতে পারেন। আর গুণির কদর করা না করা বিষয়টি নির্ভর করে স্ব স্ব ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গির উপর। এতোক্ষণ যার সম্পর্কে দুটি কথা লেখার জন্য উপরের কথাগুলি বলা, তিনি আর কেউ নন আমাদের অতি পরিচিত, সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব চুয়াডাঙ্গা তথা দেশের প্রখ্যাত এবং অন্যতম বুদ্ধিজীবি, শিক্ষক, সমাজসেবক, সাংবাদিক ও সাহিত্যানুরাগী বীর মুক্তিযোদ্ধা, সুবক্তা কৃতি সন্তান অধুনালুপ্ত ‘পাক্ষিক গ্রাম’-এর সম্পাদক এম মকবুলার রহমান। যিনি জ্ঞানের উঁচ্চতায় এমন একটা স্থানে ছিলেন যে, তাঁর জ্ঞানের আলো গ্রহণ করতে হলে, সেই শক্তি ছাড়া ব্যক্তি মকবুলার রহমানকে কাছে পাওয়া বা স্পর্শ করা ছিল কঠিন ব্যাপার। ব্যক্তি মকবুলার রহমানের শরীরি উপস্থিতি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু গুণি ও বুদ্ধিজীবি মকবুলার রহমান আমাদের শ্রদ্ধা ভালোবাসার মনিকোঠাঁয় আছেন এবং থাকবেন। যাঁর মুল্যবান জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হচ্ছে এ সমাজে তাঁঁর অসংখ্য স্নেহধণ্য শিক্ষার্থী, স্নেহাসিস সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক কর্মী এবং শুভাকাঙ্খীগণ যেটা ইতিহাসের পাতাই সারাজীবন লেখা থাকবে। আমার বিশ্বাস এম মকবুলার রহমান অমর হয়ে থাকবেন তাঁর গুণবাচঁক চরিত্রে ভালোকাসা ভালোলাগার মানুষের মাঝে। এই গুণি মানুষটির জন্ম স্থান দেশের উর্বর ভুমি চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেরা নাগদাহ ইউনিয়নের নাগদাহ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। ১৯২৬ সাল ও বাংলা ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ১লা আষাঢ় মাসে নাগদাহ গ্রামের পিতা প্রয়াত ডা.মকছেদ আলী ও মাতা প্রয়াত মালেকা খাতুনের ঘর আলোকিত করেন এম মকবুলার রহমান। এলাকা তথা দেশের মানুষ এই গুণি ব্যক্তিকে তাঁর জীবদ্দশায় যে সব নামে ডাকতেন বা চিনতেন তা হলো- এম রহমান, মকবুল মিয়া ও এম মকবুলার রহমান।
মকবুলার রহমানের শিক্ষা জীবন শুরু হয় চুয়াডাঙ্গা জেলার পার্শবর্তী ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলার বেলতলা গ্রামের তাঁর নানার বাড়ি থেকে। বেলতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া শেষে তিনি তাঁর বাবার সাথে চলে আসেন আলমডাঙ্গার মুন্সীগঞ্জে। ভর্তি হন মুন্সীগঞ্জ একাডেমি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশের পর ১৯৩০ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যান ভারতের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ কলকাতার শান্তিনিকেতনে। শান্তি নিকেতন থেকে উচ্চতর শিক্ষালাভ করে দেশের মাটিতে ফিরে আসেন এবং মুন্সীগঞ্জ একাডেমিতে শিক্ষকতা শুরু করেন। নিজের এলাকা ও মানুষের উন্নয়নের কথা ভেবে শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গণে পা রাখেন এই গুণি মানুষটি। তৎকালিন সময়ে মুসলিম লীগের হয়ে এলাকায় সুখে-দুঃখে জনমানুষের কল্যাণে স্বচ্ছ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল তার আয়ত্বে।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সমাজের মানুষের কল্যাণে কাজ করতে যেয়ে জেহালা ইউনিয়ন বোর্ডেরও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শুধু জনপ্রতিনিধি হিসেবেই থেমে থাকেননি, তৎকালীন পাক সরকারের নানা বঞ্চনার প্রতিবাদ করতে এবং বর্তমান বাংলার মানুষের অধিকারের কথা বলতে ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নিজ উদ্যোগে নিজের প্রকাশনা ও সম্পাদনায় প্রকাশ করেন ‘পাক্ষিক গ্রাম’ নামের একটি পত্রিকা। অতি বিচক্ষণ এবং জ্ঞানি মকবুলার রহমানের যৌবনের গান বাজতে থাকে এলাকার জনমানুষের কানে। ক্রমেই হয়ে উঠেন একজন প্রজ্ঞাবান নেতা। রাজনৈতিক অঙ্গণের পাশাপাশি তৎকালীন চুয়াডাঙ্গা বর্তমান চুয়াডাঙ্গা জেলার উদীয়মান তরুণ সাংবাদিক প্রয়াত আতিয়ার রহমানের আমন্ত্রণে পত্রিকা প্রকাশের পাশাপাশি ১৯৬৬ সালের ১৭ সেপ্টম্বর চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নিযুক্ত হন এবং ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্বপালন করেন। এরপর ১৯৭৭ সালের ২০ নভেম্বরে প্রতিষ্ঠা হয় চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদ। এখানেও তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এছাড়া তিনি জেলার বহু শিক্ষা, সামাজিক, রাজনৈতিক ও বিবিধ সংগঠনের বিভিন্ন পদে দায়িত্বপালন করেছেন।
বহুগুণের অধিকারী এম মকবুলার রহমানের জীবনের সব থেকে স্মরণীয় সাল ছিল ১৯৭১ সাল। তিনি ছিলেন ৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের দক্ষিণ-পশ্চিম রনাঙ্গণের অন্যতম সংগঠক ও উপদেষ্টা ডা. আসহাবউল হকের ভগ্নিপতি। সে সুবাদে এবং আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে স্বাধীনতাযুদ্ধে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী ভূমিকার ছিল। যে কারণে পাকবাহিনীরা তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় এবং পাকহানাদাররা তাঁকে চরম নির্যাতনও করে। সেসময় তাঁকে মার্শাল কোর্টের রায়ে ক্রসফায়ারের আদেশও দেওয়া হয়। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ায় তিনি প্রাণে ঁেবচে যান। ১৯৮৪ সালে জাতীয় পার্টির উপজেলা নির্বাচনে স্বতন্ত্র উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হন। এ নির্বাচনে তিনি গরুরগাড়ী প্রতীক নিয়ে বিপুল ভোটে আলমাডাঙ্গার আরেক কৃতি সন্তান ব্যারিস্টার বাদল রশিদকে পরাজিত করে প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন।
জেলার কৃর্তিমান প্রয়াত এই মানবের গুণের সীমানায় বয়স কখনো বার্ধক্যের আচঁড় লাগতে দেয়নি। সবসময় জমিদারী ও আয়েসি জীবনযাপন করেছেন তিনি। বাবার সম্পদের প্রতি তাঁর তেমন আধিক্ষ্য ছিলনা। এমনকি সংসার জীবনটাও ছিল বিলাসিতার পরশমাখা। যদিও তিনি হাট ও ভূষিমালের ব্যবসা করেছেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও ছিল তাঁর উদাসিনতা। ব্যবসার অনেকাংশই দেখভাল করতেন তাঁর স্ত্রী উম্মে আছিয়া বানু। বিগত ২০২০ সালের রমজান মাসে এই জ্ঞানী মহিরুহুর জীবদ্দশায় তাঁর ও তার স্ত্রী উম্মে আছিয়া বানুর সানিধ্যে ঘন্টাব্যাপী আলাপচারিতার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। যদিও তিনি তখন বিছানাগত ছিলেন। তবে, আমার সরব উপস্থিতিতে তিনি আমকে চিনেছিলেন এবং দেশ-জাতি ও জাতির আগামী ভবিষ্যত নিয়ে অনেক কথা অনেক স্মৃতি-রোমন্থন করেছিলেন। বলেছিলেন ‘মামুন অনেক দেরী করে ফেলেছো। আসলে ঠিকই তবে, একেবারেই অবেলায়। এই পড়ন্ত সময়ে তোমাকে কি আর বলবো। তারপরেও মকবুলার রহমান তাঁর প্রচন্ড অসুস্থতার মাঝেও বহু স্মৃতির তুলিতে বর্তমান সমাজ, রাষ্ট্র ও আগামীর প্রজন্মকে আশীর্বাদ করে চমৎকার এক চিত্র তুলে ধরেছিলেন যা লিখতে গেলে অনেক কথা। তবে, সর্বশেষ বলেছিলেন, মামুন তোমরা সাবধানে থেকো, ভালো থেকো এই প্রত্যাশা রাখি।’ আশা ছিল আবারও দেখতে যাবো এবং শুনবো তাঁর জ্ঞানের কথা। কিন্তু আর যাওয়া হয়নি। গত বৃহস্পতিবার ২১ জানুয়ারি আমার একাত্তর টিভির একটি সংবাদ সংগ্রহের কাজে জ্ঞানবীর মকবুলার রহমানের বাড়ির পাশ দিয়ে আলমডাঙ্গার দিকে যাচ্ছিলাম। তখনও অন্তর দৃষ্টিতে দেখলাম তিনি হইতো চার দেয়ালে সেই ঐতিহাসিক খাঁটে স্ত্রী উম্মে আছিয়া বানুর সাথে জীবনের অনেক স্মৃতি নিয়ে গল্প করছেন, হয়তো ভালোই আছেন। না আমার এমন ধারণা অবশেষে ভুল হলো। বেলা যখন ৬টা প্রায় আমি আলমডাঙ্গায়। তখন দৈনিক সময়ের সমীকরণের প্রধান সম্পাদক বড় ভাই নাজমুল হক স্বপন আমাকে মোবাইল ফোনে বলেছিলেন, মামুন শ্রদ্ধেয় মকবুলার রহমানকে নিয়ে যে লেখাটা তুমি লিখতে চেয়েছিলে সেটা লিখে ফেল। আমি বলেছিলাম ঠিক আছে বড় ভাই। আলমডাঙ্গা থেকে ফিরে রাত ৯টার দিকে সময়ের সমীকরণের অফিসে বসে সংবাদ রচনা করছিলাম, এমন সময় এম মকবুলার রহমানের একমাত্র পুত্র মুস্তাফিজুর রহমান পুলক পাশে বসা নাজমুল হক স্বপন ভাইয়ের মোবাইলে কল করে কান্নাজড়িত কন্ঠে জানালেন আমাদের কৃতি সন্তান দেশের অন্যতম বুদ্ধিজীবি এম মকবুলার রহমান আমাদের মায়া ত্যাগ করে তাঁর ইহকালের বণার্ঢ্য জীবন থেকে পরপারে প্রস্থান করেছেন। এসময় ফোনটা রেখেই স্বপন ভাই ব্যথিত স্বরেই বললেন, ‘মামুন জেলার আরেক বটবৃক্ষকে আমরা হারালাম। জানি না কতদিতে এই শূন্যতা পূরণ হবে।’ সুপ্রিয় পাঠক পৃথিবীতে মানুষ জন্মাবে আবার সৃষ্টিকর্তার বিধি-বিধান অনুয়ায়ী ইহকাল থেকে পরকালে পাড়ি দেবে, এটা সবার মেনে নিতে হবে। তবে, কারো কারো পরকালে চলে যাওয়া একটি পরিবারেই কষ্ট বা ক্ষতি হয় না। দেশ জাতি ও সমাজের মানুষের পথ নির্দেশকের অবিভাবক্তের অপূরনীয় ক্ষতিও হয়। সব শেষে এটাই বলতে হয়, এম মকবুলার রহমানের সাথে যার যে হিসাবই থাকুক না কেন, আমরা সবাই চাই নিস্কন্টক ভালোবাসায় তাঁর ওপারের যাত্রা মসৃণ হোক। সৃষ্টিকর্তা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুক এই কামনা করি।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।