চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরসহ সারাদেশে সংসারের সমৃদ্ধি কামনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীদের সিঁদুর প্রদান

375

বিদায়ের সুর ও বিষাদের ছায়ায় ভক্তদের শ্রদ্ধা ভালবাসায় দেবী দুর্গার বিসর্জন
ডেস্ক রিপোর্ট: ‘দুর্গতিনাশিনী’ দেবী দুর্গাকে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাম্বলীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। গতকাল শুক্রবার চোখের জলে ‘মা দুর্গাকে’ বিদায় জানানো হয়। শুক্রবার চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরসহ সারাদেশে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিভিন্ন নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মাধ্যমে পাঁচ দিনের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও মহানবমীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নারী-পুরুষ ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। বিজয়া দশমীর দিনে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তারা এ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, লোকালয় থেকে বিদায় নিলেন দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা। অবশ্য বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু হয় সকাল থেকেই। মুখে পান পাতা বুলিয়ে, সিঁদুর ছুঁইয়ে মিষ্টি মুখ করিয়ে সারা হয় আনুষ্ঠানিকতা। বিষাদের সুর বাজে ম-পে ম-পে। শেষ পর্যন্ত ভক্তের মনে মেঘ আর আকাশে বিষাদের ঘন মেঘ জমিয়ে বিদায় নেন দুর্গতিনাশিনী। তবে বিষাদের মাঝেও ভক্তমনের সান্তনা-মঙ্গলময় বার্তা নিয়ে সামনের বছর আবার আসবেন দেবী। এই আশার মধ্য দিয়েই শেষ হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। গতকাল শুক্রবার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় পাঁচ দিনব্যাপী এই আয়োজন। ভক্তদের চোখের জলে ভাসিয়ে এদিন সপরিবারে দেবী দুর্গা বাবার বাড়ি থেকে ফিরে গেলেন স্বামীর ঘরে কৈলাসে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের কাম, ক্রোধ, হিংসা, লালসার মতো আসুরিক প্রবৃত্তি বিসর্জন দেয়াই মূলত বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এ প্রবৃত্তিগুলোকে বিসর্জন দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য। সনাতন বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসেন নৌকায় চড়ে। তবে স্বর্গালোকে বিদায় নেন ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে। যার ফল হচ্ছে শস্যশ্যামলা হয়ে উঠবে পৃথিবী। দূর হবে খাদ্য সংকট। গমন ঘোটকে। অর্থাৎ ঘোড়ায় চড়ে। যা চুড়ান্ত অমঙ্গলজনক। জলস্থর বৃদ্ধি পাবে। বন্যার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। গমনে সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা। দেবীর আগমন ও গমনে বদলে যায় বিশ্ব চরাচর। গোটা বছরের শুভ-অশুভ ইঙ্গিত দিয়ে যান দেবী।
দেবীর বিদায়ের আয়োজন শুরু হয় সকাল থেকেই। এবার জেলার ১১৩টি ম-পে করা হয় দশমী পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন। বিষাদের সুর ছিল ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টাসহ বিভিন্ন বাদ্যে, ছায়া ছিল আলোকিত করা ধূপ আরতিতে এবং দেবীর পূজা-আর্চনায়। বিসর্জনের আগে সকাল থেকে চুয়াডাঙ্গা বড়বাজার মন্দিরে চলে সিঁদুর খেলা আর আনন্দ উৎসব। বিকাল সাড়ে ৩টায় প্রতিমা বিসর্জনের উদ্দেশ্যে বের করা হয় বিজয়া শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি মন্দির প্রাঙ্গন থেকে শুরু হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ঘুরে শহীদ হাসান চত্ত্বরে এসে পৌছুলে ঢাক-কাসর আর গানের তালে তালে নাচতে থাকে ভক্তরা। প্রায় আধা ঘন্টাব্যাপী সড়ক জুড়ে আনন্দ উৎসবে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা শহর। বেলা সাড়ে ৫টা নাগাত মাথাভাঙ্গা নদীর জ্বীনতলা মল্লিকপাড়া ঘাটে গিয়ে দেবী বিসর্জন দেওয়া হয়। এ সময় ঢাকের শব্দে আর ধূপের গন্ধে মুখরিত হয়ে উঠে গোটাঘাট এলাকা। একই স্থানে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার বিজয়া বিসর্জন করে বেলগাছী দুর্গা মন্দিরের ভক্তরা।


সরোজগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছে, প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে গতকাল শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজার আনুষ্ঠানিকতা। বিশুদ্ধ পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার সরোজগঞ্জ কাছারিপাড়ায় পূজা উৎযাপন হয়েছে। এ উপলক্ষে সরোজগঞ্জ কাছারিপাড়া ও বোয়ালিয়া, ধুতুরধাট দাসপাড়া, তেঘরিসহ চুয়াডাঙ্গার শংকরচন্দ্র ও কুতুবপুর এবং তিতুদহ ইউনিয়ানের বিভিন্ন পূজা মন্দিরে দেবী দূর্গাসহ অন্যান্য দেব দেবীকে এ শোভাযাত্রা বের হয়। সেখানে বিসর্জনের মাধ্যমে তাদের আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানো হয়।

আলমডাঙ্গা অফিস জানিয়েছে, আলমডাঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ৫ দিনব্যাপি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দূর্গোৎসব। গতকাল শুক্রবার বিকেলে আলমডাঙ্গার কুমার নদীতে পৌর এলাকার সকল পূজা ম-পের প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়। পৌর এলাকার রথতলা, বাবুপাড়া, কলেজপাড়া, স্টেশনপাড়া, আনন্দধাম, ক্যানেলপাড়া, গোবিন্দপুর, আনন্দধাম দাসপাড়া, পূরাতন বাসস্ট্যান্ডপাড়া, গোবিন্দপুর দাসপাড়া, কালিদাসপুর, ফরিদপুর পূজা ম-পের প্রতিমা কুমার নদী পাড়ে আনা হয়। পূজা আর্চনার পর কুমার নদীর দেবী দূর্গার বিসর্জন দেয়া হয়। বিসর্জন স্থলে উপস্থিত ছিলেন পৌর মেয়র হাসান কাদির গনু, উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) সীমা শারমিন, থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জিহাদ ফকরুল আলম খান, জেলা আওয়ামী লীগৈর সহ-সভাপতি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের জেলা যুগ্ম আহবায়ক প্রশান্ত অধিকারী, উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী মাষ্টার, সাংগঠনিক সম্পাদক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান কাজী খালেদুর রহমান অরুন, আওয়ামী লীগ নেতা সমীর দে, উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক আতিয়ার রহমান, বিআরডিবির চেয়ারম্যান মহিদুল ইসলাম মহিদ, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু মুসা, সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা ও শিক্ষানুরাগী লিয়াতক আলী লিপু মোল্লা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বেলগাছি ইউপি চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম মন্টু, প্রেসক্লাবের সভাপতি খন্দকার শাহ আলম মন্টু, সাধারণ সম্পাদক খন্দকার হামিদুল ইসলাম আজম, উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি ডা. অমল কুমার বিশ^াস, সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার বিশ^াস, পৌর সভাপতি পরিমল কুমার ঘোষ, সাধারণ সম্পাদক জয় বিশ^াস, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষেদের সভাপতি মনিন্দ্রনাথ দত্ত, সাধারণ সম্পাদক বিশ^জিৎ সাধূখা, পৌর সভাপতি লিপন বিশ^াস, সাধারণ সম্পাদক পলাশ আচার্য প্রমূখ।


দর্শনা অফিস জানিয়েছে, দর্শনা মাথাভাঙ্গা নদীতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েছে সনাতন ধর্মালম্বী হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। গতকাল শুক্রবার বিকাল ৪টা থেকে একে একে বিভিন্ন স্থানের প্রতিমা মাথাভাঙ্গা নদীর পাড়ে আসে। এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিজিবি, পুলিশ ও আনছার বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দর্শনা মেমনগর নদীর ঘাটে একে একে ৬টি প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়। এসব প্রতিমার মধ্যে ছিলো দর্শনা পৌরসভা এলাকার কেরুজ শ্রী শ্রী মন্দির, পুরাতন বাজার শ্রী শ্রী মন্দির, দর্শনা হরিজন সম্প্রদায়ের মন্দির, দর্শনা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মন্দির, মুচিপাড়া মন্দির ও পারকৃষ্ণপুর হালদারপাড়া মন্দিরের প্রতিমা মেমনগর মাথাভাঙ্গা নদীর ঘাটে বিসর্জন দেয়। প্রতিমা বিসর্জনের সময় নদীর দু’পাড়ে বিভিন্ন ধর্মে হাজার হাজার মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া এক প্লাটন বিজিবি, পুলিশ ও আনছার বাহিনীর সদস্যদের কড়া নিরাপত্তায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জন দেয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। এসময় নদীর দু’পাড়ে ঢাক-ঢোল বাদ্যযন্ত্রে মুখরিত হয়ে ওঠে। এছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের আবাল বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ নেচে গেয়ে আনন্দে মাথাভাঙ্গা নদীর দু’পাড় উৎসব মুখোর করে তোলে। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে কিনা জানতে চাইলে দামুড়হুদা উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও দর্শনা পুরাতন বাজার মন্দির কমিটির সভাপতি উত্তম কুমার দেবনাথ বলেন, দামুড়হুদা উপজেলায় এ বছর ২১টি প্রতিমা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পালিত হয়েছে এবং প্রতিমা বিসর্জনে কোন সমস্য হয়নি। প্রতিটি মন্দিরে দুইজন পুলিশ ও ৬ জন করে নারী-পুরুষ আনছার সদস্য সার্বক্ষন নিরাপত্তা দিয়েছে। আমাদের উপজেলায় হিন্দু-মুসলিম সবার সহযোগিতায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে দিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গা উৎসব পালনে সহযোগিতা করার জন্য সকলকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

মেহেরপুর অফিস জানিয়েছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা উৎসব শেষ হয়েছে। বিসর্জন ও উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে গতকাল শুক্রবার দশমীর সন্ধ্যায় মেহেরপুর ভৈরব নদীতে বিসর্জন দেয়া হয়। এর আগে এ দিন বিকালে মেহেরপুর শহরের কালী মন্দির, হরিসভা মন্দির, নায়েব বাড়ি মন্দির, মালোপাড়া মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দির থেকে হিন্দু ধর্মালম্বীরা প্রতিমা নিয়ে মেহেরপুর শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিন করে। পরে সন্ধ্যার দিকে মেহেরপুর ভৈরব নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়।


মুজিবনগর অফিস জানিয়েছে, মুজিবনগরে ৫টি পূজা ম-পের প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। গতকাল শুক্রবার বিকেল থেকে মুজিবনগর উপজেলার মহাজনপুর, কোমরপুর, মোনাখালী, দারিয়াপুর-খাঁনপুর ও বল্লভপুর পূজাম-পের প্রতিমা ভৈরব নদীতে বিসর্জন দেয়া হয়। এদিকে বিকেল থেকে সাজ সাজ রবে দেবীর অভয়বাণী ধারণ করে পায়ে হেটে, রিক্সায় চড়ে নেচে-গেয়ে এগিয়ে চলতে থাকে দুর্গাপপূজার বিজয়ী শোভাযাত্রা। ট্রাকে ও ভ্যানে পথে পথে শত শত মানুষের সাধুবাদ ও কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে নিয়ে যাওয়া হয় বিসর্জনস্থলে। সেখানে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়, উচ্ছ্বাসের মাত্রা আরও তীব্রতর হয় সেখানেও। উচ্ছ্বাস দেখতে সে স্থানগুলোতে নামে হাজারো মানুষের ঢল। পর্যায়ক্রমে ঘাটে প্রতিমা নামানোর সময় ঘণ্টা, উলুধ্বনি ও ঢাক ঢোলের আনন্দ-উল্লাসে বিসর্জনস্থল পায় ভিন্ন মাত্রা। প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে ফিরে আসার দৃশ্য শোকাবহ আর প্রতিমা বিসর্জন দিতে যাওয়ার সময় উল্লাসের চিত্রই যেন পাল্টে যায় ক্ষনিকের মধ্যে। আনন্দ-উল্লাসের এ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে উপস্থিত দর্শনার্থীদের কড়ানাড়ে এক অন্য চিন্তা। অন্যের বিশ্বাসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দেবীকে বিসর্জন দিতে পেরে খুশি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।