চুয়াডাঙ্গায় স্কুলছাত্রী রুবিনা হত্যাকান্ডের একমাস অতিবাহিতের পথে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ হত্যার সত্যতা মিললেও আটক হয়নি হত্যাকারী : আজ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন

367

অঞ্জন মল্লিক: চুয়াডাঙ্গা গোরস্থান পাড়ার আলোচিত স্কুলছাত্রী রুবিনা হত্যাকান্ডের ১৯দিন অতিবাহিত হয়েছে। হত্যার এ ঘটনার তদন্ত ঠিকভাবে হচ্ছে না। সাথে সাথে মামলার প্রধান আসামী হুমায়ুন বাঙালসহ অন্যান্য আসামীরা বাড়িতে এসে থাকলেও তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না, এমনটাই দাবি করা হচ্ছে রুবিনার পরিবার ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে।
এদিকে, স্কুলছাত্রী রুবিনা হত্যাকান্ডের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছে “শিশু রুবিনা আত্মহত্যা করেনি, তাকে ধর্ষণ শেষে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে”। তবে এ হত্যাকান্ডের কারণ সম্পর্কে কিছু জানাতে পারেনি পুুলিশ। বক্তব্য মতে, আসামীদের আটক করা গেলে তবেই জানা যাবে মূল কারণ।
কোমলমতি স্কুলছাত্র রুবিনা হত্যাকারীসহ সকল আসামীদের বিচারের দাবিতে ফুঁসে ওঠে এলাকাবাসী। গত ৭ মে রবিবার বেলা ১২টার দিকে স্থানীয় নারী-পুরুষ ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসক কার্যালয় চত্বরে ঘন্টাব্যাপী মানববন্ধন করে। পরে বিক্ষোভকারীরা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর স্মারকলিপি পেশ করে। তার পরেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি প্রশাসনের পক্ষ থেকে। ইতিমধ্যে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। যেখানে স্পষ্ট হয়েছে রুবিনাকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রেখে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার কথা। তবে এখনও মূল আসামী হুমায়ুন বাঙালকে আটক করতে না পারায় প্রশাসনের প্রতি নিন্দা প্রকাশ করেছে এলাকাবাসী।
স্কুলছাত্রী রুবিনার পরিবারের দাবি, তাদের মেয়ে রুবিনাকে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এ কথা অনেক আগেই প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন হত্যাকারীদের দ্বারা অর্থের প্রলোভনে প্রভাবিত হয়ে আটক করতে গড়িমসি করছে। তারা আরো জানায় তাদের মেয়ে হত্যার মূল আসামী হুমায়ুন বাঙাল হত্যাকান্ডের পর খুলনায় পাড়ি জমিয়েছে। এ ব্যাপারে বেশ কয়েক দফা পুলিশ খোঁজ খবরও নিয়েছে তার

পরেও আটক হয়নি হুমায়ুন। ফলে বিচারের আশাম্লান হয়ে যাচ্ছে বলে রুবিনার পরিবার জানায়।
এ ব্যাপারে রুবিনার মা চায়না খাতুন এ সমীকরণ প্রতিবেদককে জানান, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত নানাভাবে চাপসৃষ্টি ও হুমকি ধামকী দেওয়া হচ্ছে আমাকে ও আমার পরিবারকে। পুলিশ এ ব্যাপারে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপও নিচ্ছে না। আসামী হুমায়ুন বাঙাল এরই মধ্যে একদিন বাড়ি এসেছিল, রহস্য জনক কারণে তারপরও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নি। রুবিনার মা আরো বলেন, এলাকার প্রভাবশালী সুদকারবারী হুমায়ুন বাঙাল আমার মেয়েকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করেছে। হত্যাকান্ড ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে গলায় ওড়না পেচিয়ে বাড়ির আমগাছের একটি ডালে ঝুলিয়ে রেখে যায়। পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। এরপর পুলিশ আসে তদন্ত করে চলে যায়। কাজের কাজ কিছুই হয়না। এখন পুলিশ ময়না তদন্ত রিপোর্ট হাতে পেয়েছে। তাতে প্রমাণও মিলেছে। তাই আসামীদের দ্রুত গ্রেফতার করে তার ও তার সহযোগীদের আটক করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
প্রতিবেশিদের মধ্যে অনেকের দাবি, আসামি হুমায়ুন বাঙালের ব্যবহার মোটেও ভালো না। স্বভাবচরিত্রের দিক থেকেও সে এলাকার চিহ্নিত লম্পট। বহুবিবাহের সাথে জড়িত হুমায়ুন সুদকারবারি ও ধোকাবাজি করে বীরদর্পে চলে। ভাবের দিক থেকেও ষোলআনা আবার চিটারিগিরির দিক থেকেও কম নয়। এখন সে খুলনায় তার আরেক স্ত্রির কাছে আছে বলে অনেকে নিশ্চিত করে। এ ঘটনার পর একদিন বাড়িতেও এসেছিল সে, তবে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নি। বরং পুলিশ তাকে নিরাপত্তা দিতে এসেছিল বলে অনেকে অভিযোগ তোলে।
এদিকে, হত্যাকান্ডের পর কয়েক দফা মানবন্ধন করার পরে এখনও রুবিনার পরিবার সুবিচার না পাওয়ায় আজ রোববার চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সামনে মানবন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের কথা জানিয়েছে রুবিনার পরিবার। তারা জানিয়েছে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আর হত্যাকারী হুমায়ুন বাঙালের ফাঁসির দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হবে।
উল্লেখ্য, চুয়াডাঙ্গা পৌর শহরের দক্ষিণ গোরস্তানপাড়ার রবিউল হকের মেয়ে রুবিনা আখতার (১৪)। সে প্রভাতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী। গত ২ মে দুপুর ১টার দিকে রহস্য জনক ভাবে তার মৃত্যু হয়। লাশ পাওয়া যায় বাড়ির মধ্যে থাকা একটি আমগাছ থেকে ঝুলন্ত অবস্থায়। তার মৃত্যুকে ওই সময় প্রাথমিকভাবে সবাই আত্মহত্যা বলে ধারণা করে। ২ মে সন্ধ্যায় পুলিশ লাশ উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। পরদিন লাশের ময়নাতদন্ত হয়।  এ ঘটনায় মা চায়না খাতুন বাদী হয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে। এতে ৫ জনকে আসামী করা হয়। আসামীরা হলো মৃত রুবিনার প্রতিবেশী হুমায়ুন বাঙাল, তার স্ত্রী আরজিনা খাতুন, মেয়ে সীমা খাতুন, সাদ্দাম ও মানিক।। এদিকে ঘটনার পর থেকে এলাকায় ছিল নানা গুঞ্জন। প্রতিবেশী মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে হুমায়ুন বাঙালকে (৪৩) ঘিরে ছিল আলোচনা সমালোচনার ঝড়। স্কুলছাত্রী রুবিনাকে হত্যার অনেক আগে থেকেই হুমায়ুন বাঙালের নজর ছিল রুবিনার উপর। বিভিন্ন সময় তাকে দিয়ে গা টিপিয়ে নিতো। হত্যার কিছুদিন আগে গা টেপানোর সময় রুবিনার চরমভাবে শীলতাহানি করে হুমায়ুন বাঙাল। রুবিনা তার অসহায় দরিদ্র মা চায়না খাতুনকে বললে তিনি জোর প্রতিবাদ জানিয়ে হুমায়ুন বাঙালের স্ত্রীসহ নিকটজনদের জানিয়েও প্রতিকার পাননি। বরং উল্টো খারাপ আচরণ সহ্য করতে হয় তাদেরকে। রুবিনার মা বাসা বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।
মেয়েকে নিয়ে মা-বাবার ছিল চোখভরা স্বপ্ন আর মনভরা আশা। সেই স্বপ্ন ভেঙে দেওয়ার জন্য কাক চক্ষুর হুমায়ুন বাঙাল যে আগে থেকে ঔৎপেতে ছিল তা রুবিনার পরিবারের কাছে অজানা ছিল। এবার মেয়ের মৃত্যুর পর তা পরিষ্কার হলেও আর কিছুই করার নেই তাদের। হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে তবেই শিশু রুবিনার আত্মার শান্তি মিলবে বলে আশা সকলের।