চুয়াডাঙ্গায় এক দিনে সর্বোচ্চ ৫৭ জন শনাক্ত, উপসর্গে একজনের মৃত্যু

118

ঝিনাইদহে করোনায় প্রাণ গেল ব্যাংক কর্মকর্তার, নতুন ৫১ জনসহ মেহেরপুরে আরও ৩২ জন আক্রান্ত
সমীকরণ প্রতিবেদক:
সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ১৩ হাজার ১১৮ জনে। একই সময়ে নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৩৬ জন। এ নিয়ে দেশে মোট করোনা রোগী শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৮ লাখ ২৬ হাজার ৯২২ জনে। এর আগের দিন ১২ জুন দেশে করোনায় ৩৯ জনের মৃত্যুর খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এছাড়া আরও ১ হাজার ৬৩৭ জনের করোনা শনাক্তের কথাও জানানো হয়। সেই তুলনায় আজি করোনায় মৃত্যু ও শনাক্ত অনেক বেড়েছে। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ২ হাজার ২৪২ জন। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ৭ লাখ ৬৬ হাজার ২৬৬ জন। এই সময়ে ১৮ হাজার ৪৭৩ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তবে আগের নমুনাসহ পরীক্ষা করা হয়েছে ১৮ হাজার ৭৪৯টি। নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ১২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৪৭ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ঢাকা বিভাগে ১৫ জন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৯, রাজশাহী বিভাগে ৬ জন, খুলনা বিভাগে ৮, বরিশাল বিভাগে একজন, সিলেট বিভাগে দুইজন, রংপুর বিভাগে চারজন ও ময়মনসিংহ বিভাগে ২ জন মারা গেছেন। ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়াদের মধ্যে ৩২ জন পুরুষ এবং ১৫ জন নারী। এদের মধ্যে বাসায় ২ জন ছাড়া বাকিরা হাসপাতালে মারা গেছেন। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়াদের মধ্যে ২৯ জনেরই বয়স ৬০ বছরের বেশি। এছাড়া ৫১ থেকে ৬০ বছরের আটজন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের চারজন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের পাঁচজন, ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে একজন রয়েছেন।
চুয়াডাঙ্গা:
চুয়াডাঙ্গায় একদিনে সর্বোচ্চ ৫৭ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছরে এটাই এক দিনের সর্বোচ্চ শনাক্ত। এর আগে গত ৩ জুনে ১৮৮ জনের নমুনা পনীক্ষায় ৫১ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। গতকাল রোববার রাত নয়টায় জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ এ তথ্য জানায়। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হারও একদিনে এটাই সর্বোচ্চ ৭৫.২৪ শতাংশ। এদিকে নতুন আক্রন্ত ৫৭ জনের মধ্যে দামুড়হুদা উপজেলারই ২০ জন, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ১৩ জন, আলমডাঙ্গার ২ জন ও জীবননগরের ৭ জন রয়েছে। এনিয়ে জেলায় মোট করোনা আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ২২২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে সদর উপজেলার ১ হাজার ১০২ জন, আলমডাঙ্গার ৩৮৭ জন, দামুড়হুদায় ৫৩৩ জন ও জীবননগরে ২৫৭ জন।
জানা যায়, গত শনিবার জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা পরীক্ষার জন্য চার উপজেলা থেকে ৮৯টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে প্রেরণ করে। গতকাল পূর্বের পেন্ডিং নমুনাসহ মোট ১৩২টি নমুনার ফলাফল প্রকাশ করে। এর মধ্যে ৫৭ জনের করোনা ফলাফল পজিটিভ আসে, বাকী ৭৫টি নমুনার ফলাফল নেগেটিভ। গত শনিবার ৫৬টি নমুনা পরীক্ষায় ৩৭ জনের করোনা ফলাফল পজিটিভ এসেছে। এতে জেলায় করোনা শনাক্তের হার বেড়ে দাঁড়িয় ৬৬ শতাংশে। এদিকে গতকাল ১৩২ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৫৭ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার পূর্বের রেকর্ড ভেঙে এবার ৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
গতকাল জেলায় করোনা থেকে নতুন কেউ সুস্থ হয়নি। এখন পর্যন্ত জেলায় মোট সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৮৮৬ জন। এর মধ্যে সদর উপজেলার ৯৯৫ জন, আলমডাঙ্গার ৩৪৩, দামুড়হুদার ৩৫১ ও জীবননগরে ১৯৭ জন। জেলায় বর্তমানে করোনা আক্রান্ত হয়ে হোম ও হাসপাতালের আইসোলেশনে থাকা রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাড়িয়েছে ৩২২ জনে।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী জেলা থেকে এ পর্যন্ত মোট নমুনা সংগ্রহ ১১ হাজার ৭৫টি, প্রাপ্ত ফলাফল ১০ হাজার ৬৬৩টি, পজিটিভ ২ হাজার ২৭৯ জন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চুয়াডায় ৩২২ জন করোনাক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় অবস্থানকালে আক্রান্ত হয়েছেন ৭৮ জন, আলমডাঙ্গায় ২৪ জন, দামুড়হুদায় ১৬৫ জন ও জীবননগরে ৫৫ জন। আক্রান্তদের মধ্যে বর্তমানে ২৮৩ জন হোম আইসোলেশনে আছেন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৬৫ জন, আলমডাঙ্গায় ২০ জন, দামুড়হুদায় ১৪৪ জন ও জীবননগরে ৫৪ জন। প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে আছেন সদর উপজেলার ১২ জন, আলমডাঙ্গার ৩ জন, দামুড়হুদার ২০ জন ও জীবননগরের ১ জন জনসহ মোট ৩৬ জন। চুয়াডাঙ্গায় করোনা আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ৭১ জনের। এরমধ্যে সদর উপজেলার ২৫ জন, আলমডাঙ্গায় ১৭ জন, দামুড়হুদায় ১৮ জন ও জীবননগরে ৪ জন। চুয়াডাঙ্গায় আক্রান্ত অন্য ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এ জেলার বাইরে। উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলার বাইরে চিকিৎসাধীন রয়েছে অন্য ৩ জন।
এদিকে, গতকাল করোনা উপসর্গ নিয়ে এ কে এম ফজলুল হক বাবু (৪৮) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রোববার সদর হাসপাতালের ইয়োলোজোনে অবস্থার অবনতি হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক ফজলুল হক বাবুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার্ড করেন। সকালেই পরিবারের সদস্যরা ফজলুল হককে নিয়ে ঢাকার উদ্যেশ্যে সদর হাসপাতাল ত্যাগ করে। ঢাকা যাওয়ার পধিমধ্যে আরিচাঘাটে পৌঁছালে ফজলুল হকের মৃত্যু হয়। সদর হাসপাতালের করোনা ইউনিট সূত্রে জানা যায়, করোনা উপসর্গ থাকায় ফজলুল হককে হাসপাতালের ইয়োলো জোনে ভর্তি রাখা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন ফজলুল হকের অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে রেফার্ড করা হয়। রেফার্ড করার পূর্বে তার শরীর থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য রমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
মেহেরপুর:
মেহেরপুরে নতুন করে আরও ৩২ জন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৮ জন, গাংনীতে ১৭ জন এবং মুজিবনগরে ৭ জন রয়েছেন। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় মেহেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. নাসির উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
সিভিল সার্জন অফিস সুত্রে জানা গেছে, নতুন প্রাপ্ত রিপোর্টের ৫৪টির মধ্যে পজিটিভ ৩২টি। ৩২টি পজিটিভের মধ্যদিয়ে জেলায় মোট পজিটিভ সংখ্যা ১৭৯টি। এর মধ্যে সদরে ৩৮, গাংনী ৮৬ ও মুজিবনগরে ৫৫টি। জেলায় এ পর্যন্ত মৃত্যু ২৬ জনের। এর মধ্যে সদর ১০, গাংনী ১০ ও মুজিবনগরে ৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ৯১৬ জন। তিনি সবাইকে সামাজিক দূরত্ব, নিয়মিত সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোবার অভ্যাস, মাস্ক ব্যবহার, জন সমাগম এড়িয়ে এবং হাঁচি-কাশির শিষ্ঠাচার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহবান জানান।
ঝিনাইদহ:
হঠাৎ করেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে ঝিনাইদেহে। এতে হাসপাতালে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। এদিকে, আইসিইউ না থাকায় দেখা দিচ্ছে মৃত্যু নিয়ে শঙ্কা। এমন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরাও। গতকাল জেরায় ৫১ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আর করোনায় প্রাণ হারিয়েছে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা।
ঝিনাইদহ সিভির সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রোববার সকালে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ ল্যাব থেকে ১১৩টি নমুনার পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে ৫১ জন আক্রান্ত হন। এ নিয়ে ঝিনাইদহে নতুন শনাক্তদের নিয়ে এখন পর্যন্ত মোট করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৬ জন। আর মোট মৃত্যু হয়েছে ৫৮ জনের। তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৭৮ ব্যক্তির লাশ দাফন করেছে।
এদিকে আক্রান্তের সংখ্যা হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে করোনা আক্রান্ত রোগীর চাপ বাড়তে শুরু করেছে। হাসপাতালে আইসিইউ না থাকায় রোগীদের অবস্থা খারাপ হলে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। এসব রোগী অনেকে আবার আইসিইউ না পেয়ে মারাও যাচ্ছেন।
মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘করোনায় নমুনা পরীক্ষা কম হওয়ার কারণে আক্রান্তের সংখ্যাও কম হচ্ছে। গতকাল অন্য দিনের তুলনার নমুনা পরীক্ষার হার বেশি হওয়ায় আক্রান্তের হারও বেড়েছে। আমি মনে করি পরীক্ষার সংখ্যা আরও বাড়ালে আক্রান্তের সংখ্যাও আরও বাড়তে পারে।’
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. লিমন পারভেজ জানান, ‘পরিস্থিতি আবার খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমরা নিজেরাই নতুন পরিস্থিতিতে হতভম্ব।’ তিনি মনে করছেন করোনার নতুন কোনো ধরনের বিস্তার ঘটতে পারে। তিনি জানান, বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মানুষ মারা যাচ্ছেন।
এদিকে, গতকাল রোববার শৈলকুপা জনতা ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার আরিফুল ইসলাম (৩৯) করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তিনি ঝিনাইদহ শহরের পাগলাকানাই ব্যাকা ব্রিজ পাড়ার রবিউল খোন্দকারের ছেলে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে তাঁকে স্থানীয় পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয় বলে উপ-পরিচালক আব্দুল হামিদ খান জানান।