চুয়াডাঙ্গা বুধবার , ১৬ নভেম্বর ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চুয়াডাঙ্গার কলাবাড়ী-রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম করে আপাতত নিরাপত্তাকর্মী ও আয়া নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ

চুয়াডাঙ্গা জেলা শিক্ষা অফিসার বললেন, ‘প্রধান শিক্ষকের শ্যালক বিটিভির প্রতিনিধি রাশেদীন আমাকে বলেছে, ও সব কিছু ম্যানেজ করে ফেলেছে’
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
নভেম্বর ১৬, ২০২২ ৯:৪১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

৪টি পদে নিয়োগ দিতে ৪১ লাখ টাকার আর্থিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগ!

বিশেষ প্রতিবেদক:
৪টি পদে নিয়োগ দিতে ৪১ লাখ টাকার আর্থিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ার পর আবারো চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কলাবাড়ী-রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম করে আপাতত নিরাপত্তাকর্মী ও আয়া নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১০ নভেম্বর) চুয়াডাঙ্গা ভিক্টরিয়া জুবেলি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে গোপনে অনুষ্ঠিত এ নিয়োগ সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় আর্থিক সুবিধা নিয়ে অনিয়মে সহযোগীতা করেছেন জেলা শিক্ষা অফিসার আতাউর রহমান ও দামুড়হুদা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল মতিন, শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) প্রতিনিধি নিয়োগ পরীক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও চুয়াডাঙ্গা ভিক্টরিয়া জুবেলী সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিল্লাল হোসেন এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বজলু ও ওই বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির বিদ্যুৎসাহী সদস্য তার আপন শ্যালক বহু অপকর্মের হোতা চুয়াডাঙ্গা শহরের রেলবাজারে অবস্থিত চুয়াডাঙ্গা কামিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক (কৃষি) ও বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার জেলা প্রতিনিধি ওয়াহিদ মোঃ রাশেদীন আমিন।

কলাবাড়ী-রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বজলু জানান, বিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তে ল্যাব এ্যাসিসটেন্ট, অফিস সহায়ক, নিরাপত্তাকর্মী ও আয়া পদে নিয়োগ দেয়ার জন্য ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল দৈনিক শিক্ষা ও স্থানীয় দৈনিক মাথাভাঙ্গা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর এসব পদে ৪০ জন আবেদন করেন। এর মধ্যে ল্যাব এ্যাসিসটেন্ট পদে ৯ জন, অফিস সহায়ক পদে ১৩জন, নিরাপত্তাকর্মী পদে ৬ জন ও আয়া পদে ১২ জন নিয়োগ প্রত্যাশী আবেদনপত্র করেন।

গোপন সমঝোতায় নিয়োগের ব্যাপারে এক লিখিত অভিযোগে জানা যায়, নিয়োগ প্রত্যাশীদের চারজনের সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয় ব্যাবস্থাপনা কমিটির সভাপতি এবং বিদ্যুৎসাহী সদস্যের সঙ্গে গোপনে ৪১ লাখ টাকা আর্থিক সুবিধা নেয়ার সমঝোতা হয়। এ বিষয়টি জানাজানি হলে তা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। চাঞ্চল্যকর এই বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম খান, জেলা শিক্ষা অফিসারকে তদন্তসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। ওই সময় জেলা শিক্ষা অফিসার আতাউর রহমান তদন্ত কমিটি গঠন করেন। অনিয়ম করে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্র তৈরি করার কারনে শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) প্রতিনিধি নিয়োগ পরীক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও চুয়াডাঙ্গা সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিল আরা চৌধুরী ২৭ জুন’২২ পরীক্ষা স্থগিত করেন। এ ঘটনা তদন্তে দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা বেগমকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন, জেলা শিক্ষা অফিসের পরিদর্শক আনোয়ার হোসেন ও দামুড়হুদা উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাডেমীক সুপারভাইজার রাফিজুল ইসলাম। এ তদন্তের পর তদন্ত কমিটির সুপারিশের মধ্যে ছিলো আবার নতুন করে পত্রিকার মাধ্যমে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। এরপর যথাযথ নিয়ম মেনে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। কিন্তু সেগুলোর একটিও না মেনে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বজলু এবং ওই বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির বিদ্যুৎসাহী সদস্য তার আপন শ্যালক বহু অপকর্মের হোতা চুয়াডাঙ্গা শহরের রেলবাজারে অবস্থিত চুয়াডাঙ্গা কামিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক (কৃষি) ও বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার জেলা প্রতিনিধি ওয়াহিদ মোঃ রাশেদীন আমিন রাজন অর্থ বাণিজ্যের মাধ্যমে দামুড়হুদা উপজেলার জুড়ানপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের ফরজ আলীর ছেলে রিপন আলীকে ৯ লাখ টাকা ও একই উপজেলার রামনগর গ্রামের ছাগবার আলীর মেয়ে জুলেখা খাতুনকে ৮ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া করিয়ে দেয়। এ অনিয়মে আর্থিক সুবিধা নিয়ে সহযোগীতা করেন চুয়াডাঙ্গা জেলা শিক্ষা অফিসার আতাউর রহমান ও দামুড়হুদা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল মতিন ও শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) প্রতিনিধি নিয়োগ পরীক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও চুয়াডাঙ্গা ভিক্টরিয়া জুবেলী সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিল্লাল হোসেন। পরবর্তীতে নিদৃষ্ট আরো ২জন নিয়োগ পাবেন। এরা হলো, ল্যাব এ্যাসিসটেন্ট হিসাবে দামুড়হুদা উপজেলার জুড়ানপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে আব্দুর রাব্বি ও অফিস সহায়ক হিসাবে একই ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের জিয়াউর রহমানের ছেলে ইয়াছিন আলী। এ দুজনের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা করে মোট ২৪ লাখ টাকা নিয়ে তাদের নিয়োগ চুড়ান্ত করে রাখা হয়েছে।

এদিকে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক বরাবর গত রবিবার (১৩ নভেম্বর) এ নিয়োগ পরীক্ষা আবারো নেয়ার জন্য একটি আবেদনপত্র দিয়েছেন দামুড়হুদা উপজেলার রামনগর গ্রামের জিয়াউর রহমানের ছেলে রকিবুল হাসান। ওই পত্রে তিনি জানান, কলাবাড়ী-রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন নিরাপত্তাকর্মী পদে প্রার্থী হয়ে আবেদন করার পরও পরীক্ষার দিন তাকে ডাকা হয়নি। গত বুধবার (৯ নভেম্বর) বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বজলু তার পছন্দের প্রার্থী গোপালপুর গ্রামের ফরজ আলীর ছেলে রিপন আলীকে (৩৬) তার বাড়ীতে ডেকে ৯ লাখ টাকা নিয়ে তাকে পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা বলেন। যা বৈধ হয়নি।

এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বজলু বলেন, ‘এ বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠানের চারটি পদে নতুন করে নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। এর মধ্যে নিরাপত্তাকর্মী ও আয়া পদে দুজনকে নিয়োগ দেয়া হবে। ওই পরীক্ষায় আর্থিক সুবিধা নেয়া দুজন ছাড়া আর কোন প্রার্থী কেনো উপস্থিত ছিলোনা, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেকটি পদে ৩জন প্রার্থী উপস্থিত না হলে পরীক্ষা নেয়া যাবে না। আমরা সেই নিয়ম মেনেই পরীক্ষা শেষ করেছি। এবার যথাযথ প্রক্রিয়ায় তাদের নিয়োগ দেয়া হবে।’

চুয়াডাঙ্গা জেলা শিক্ষা অফিসার আতাউর রহমান বলেন, ‘ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের শ্যালক বিটিভির প্রতিনিধি রাশেদীন আমাকে বলেছে, ও সব কিছু ম্যানেজ করে ফেলেছে। ওই কথা শুনে আমি আমার মত ব্যবস্থা নিয়েছি।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা বেগম বলেন, ‘বিদ্যালয়ের নিয়োগ কমিটি যদি নিয়োগ সংক্রান্ত কোন অনিয়ম করে থাকে তা তদন্ত করে যথাযথ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম খান বলেন, ‘উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির জেলা পর্যায়ের সভায় কলাবাড়ী-রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়ম বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানে এ ব্যাপারটি দেখার জন্য জেলা শিক্ষা অফিসারকে দায়িত্ব দেয়া হয়। পরবর্তীতে আমার সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেয়ার কথা ছিলো। তাছাড়া নিয়োগ পরীক্ষা সংক্রাস্ত এক প্রার্থীরও লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়া কিভাবে হলো তা তদন্ত করে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

উল্লেখ্য, প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বজলুর দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী উল্লেখিত চারটি পদের নিয়োগ চুড়ান্তের জন্য প্রায় ১১ মাস আগেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পছন্দের ব্যক্তিদেরকে নিয়ে কৌশলে তিনি জুড়ানপুর ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেনকে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও তার শ্যালক ওয়াহিদ মোঃ রাশেদীন আমিনকে বিদ্যুৎসাহী সদস্য করেন। কমিটি গঠনের কিছু দিনের মধ্যেই অনেকটাই তাড়াহুড়ো করে চারটি পদে নিয়োগের জন্য দৈনিক পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। চারটি পদের অনুকূলে ৪০টি চাকরী প্রত্যাশীর আবেদন জমা পড়লে উল্লেখিত চার পদের চার জন, প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির কাছে শুরু দৌঁড়ঝাঁপ শুরু করেন। এরই এক পর্যায়ে প্রার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে শুরু হয় দরকষাকষি। পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ওই চার প্রার্থীকে চুড়ান্ত করা হয়েছিলো।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।