চুয়াডাঙ্গা মঙ্গলবার , ২০ ডিসেম্বর ২০১৬

চুয়াডাঙ্গার ইতিহাস রচনার সমস্যা ও সম্ভাবনা প্রসঙ্গে -প্রফেসর আবদুল মোহিত চুয়াডাঙ্গা।

সমীকরণ প্রতিবেদন
ডিসেম্বর ২০, ২০১৬ ৫:০৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

চুয়াডাঙ্গার ইতিহাস রচনার সমস্যা ও সম্ভাবনা প্রসঙ্গে
-প্রফেসর আবদুল মোহিত
চুয়াডাঙ্গা।

প্রাচীন কাল থেকে বাংলার সুনাম তার অতিথি-আপ্যায়ন, কৃষিপণ্যজাত ধন-সম্পদ ও গৌরবের সুনাম দেশের ভেতরে এবং বহির্বিশে^ ছড়িয়ে আছে। বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের ভ্রমণকাহিনীতে তার নিদর্শন আছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নানা স্থানের সে সব কাহিনী পড়ে মুগ্ধ হলেও বইপত্রে কোথাও আমরা চুয়াডাঙ্গার উল্লেখ পাই না। তাই চুয়াডাঙ্গা সম্পর্কে ইতিহাসের কিছু খোঁজ-খবর নেওয়া যেতে পারে।
বৃহত্তর বাংলা অঞ্চলের নদ-নদী বহুল ভাগীরথী নদীর পূর্ব-তীরবর্তী বিশাল ভূখন্ড নিয়ে নদীয়া জেলা গঠিত। নদীয়ার ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্য ছাড়াও শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে সারা ভারতবর্ষে এর একটি আলাদা গুরুত্ব বহুকাল ধরে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এর ভৌগোলিক, প্রাকৃতিক, নৃতাত্ত্বিক, জীবন-জীবিকা, কৃষিউৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক চলন, ভাষা ও সংস্কৃতির বিন্যাস এবং বিভাজন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এসেছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে সারা ভারতবর্ষে নদীয়া একটি আলাদা ঐতিহ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল।
নদীয়াকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সেন যুগের শাসনামলে [১০৯৭-১২২৩] ও ১২০৪ সাল থেকে মুসলিম শাসনামলের কয়েক শতাব্দী এবং ১৭৫৭ সালে ইংরেজ অধিকার বিস্তৃত হওয়ার পরেও শিক্ষা-সংস্কৃতি-সমাজ-সভ্যতা-ইতিহাস নানা বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় প্রাণাবেগে সঞ্জীবিত হয়ে তার আত্ম-স্বাতন্ত্র্য অর্জন ও আত্মপ্রকাশের এক বিস্ময়কর সুযোগ লাভ করে। এছাড়াও শিক্ষা, শিল্প-নৈপুণ্য, কুটির শিল্প, মৃৎশিল্প, তাঁত শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদেশী বণিকদের আগমণ, পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার, সাহিত্য, সংগীত, নাট্যচর্চার একটি সুদূর প্রসারী প্রভাব বৃহত্তর নদীয়ার মানুষের জীবনধারার সাথে জড়িয়ে আছে। অবিভক্ত নদীয়া জেলা ছিল বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। বৃহত্তর নদীয়ার অংশ হিসাবে চুয়াডাঙ্গার বিস্তীর্ণ জনপদ সেই গৌরবময় উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে।Untitled-1
ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলাদেশের জেলাসমূহ গঠনের প্রাক্কালে বিশেষভাবে যেসব উপাদানের উপর ভিত্তি করে সমন্বিত সত্ত্বা হিসেবে বিকশিত হয়ে ওঠে সেদিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছিল। জেলার মহকুমাসমূহ গঠনের সময়ে সেই একই পদ্ধতি অনুসৃত হয়। তারই ফলশ্রুতি পরবর্তীকালে বহু যুগ ধরে সেই জনপদ তার অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে।
নদীয়া জেলাকে কেন্দ্র করে যেমন বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যের [১৪৮৬-১৫৩৩] আবির্ভাব, ঘোষপাড়ার সতী মা, চাপড়ার বৃত্তিহুদায় সাহেবধনী সম্প্রদায়, মেহেরপুরে বলাহাড়ি সম্প্রদায়, ছেঁউড়িয়ায় বাউল সাধক লালন শাহ [১৭৭৮-১৮৯০], আলমডাঙ্গার মধুপুরের কুবির গোঁসাই [১৭৮৭-১৮৭৯] প্রমূখ লোকধর্মের সাধকগণের মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজে লোকায়ত জীবনযাপন এবং লোকশিক্ষার অন্তশ্চেতনাময় মুক্ত ভাবনা বৃহত্তর লোকসমাজে যেমন মান্যতা পায়, তেমনি নাগরিক সমাজের জ্ঞানীগুণী মানুষের ও বিদ্যার্থীদের সমাবেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিস্তার এক ভিন্ন স্বরূপের প্রকাশ ঘটিয়েছিল।
বর্তমান চুয়াডাঙ্গা জেলা ব্রিটিশ শাসনামলে অবিভক্ত বাংলার অন্যতম জেলা নদীয়ার মহকুমা ছিল। বাংলাদেশের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সম্ভবত সবচেয়ে অর্বাচীন শহর। নবাব আলিবর্দি খানের [১৭৪০-১৭৫৬] আমলে চুয়াডাঙ্গায় প্রথম জনবসতির সূচনা হয়। ১৭৪০ থেকে ৫০ সালের মধ্যে কোন এক সময়ে নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ সীমান্তবর্তী ইটেবাড়ি-মহারাজপুর গ্রামাঞ্চল থেকে ‘চুঙো মল্লিক’ নামে এক ব্যক্তি সপরিবারে ভৈরব নদী হয়ে মাথাভাঙা নদী পথে নদীর ধারে নির্জন উঁচু জায়গা দেখে সেখানে বসতি গড়ে তোলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে। এভাবেই চুয়াডাঙ্গা গ্রামের পত্তন হয়। চুয়াডাঙ্গার পুব দিক দিয়ে বয়ে গেছে নবগঙ্গা নদী। মধ্যবর্তী স্বল্প জায়গাটুকুই চুয়াডাঙ্গার মূলভূখন্ড। ১৭৯৭ সালের ফারসি রেকর্ডপত্রে জনপদটি ‘চুঙ্গোডাঙ্গা’ নামে নথিভুক্ত হতে দেখা যায়। ফারসি থেকে ইংরেজিতে লেখার সময়ে চুঙ্গোডাঙ্গা ‘চুয়াডাঙ্গা’ হয়ে গেছে। আজ থেকে ৫০/৬০ বছর আগেও বহু বয়স্ক মানুষের মুখে চুয়াডাঙ্গাকে ‘চুঙ্গোডাঙ্গা’ বলতে শোনা যেত।
১৮৫৬ সালে সমগ্র ভারতে রেল যোগাযোগের পরিকল্পনা গৃহীত হলে প্রথম ধাপে কলকাতা থেকে কুষ্টিয়া রেলপথে ১৮৬২ সালের ২৭শে নভেম্বর ট্রেন যোগাযোগ চালু হয়। সেই সুবাদে পশ্চিমে মেহেরপুর এবং পুবে ঝিনাইদহ মহকুমার সাথে সংযোগের জন্য চুয়াডাঙ্গা গ্রামের পুবপ্রান্তে রেলস্টেশন স্থাপন জরুরি হয়ে পড়ে। ফলে অজ-পাড়াগাঁ চুয়াডাঙ্গায় রাতারাতি কালুপোল থেকে থানা এবং দামুড়হুদা থেকে ১৮৬০ সালে চালু হওয়া মহকুমা সদর দপ্তর স্থানান্তরিত হয়। নিতান্তই অজ পাড়া-গাঁ চুয়াডাঙ্গা গ্রামটি অতিদ্রুত অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকান-পাটে সজ্জিত হয়ে শহর হিসেবে নবরূপে আত্মপ্রকাশ করে।
১৮৬২ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগর থানার সমন্বয়ে নদীয়া জেলার অধীন চুয়াডাঙ্গা মহকুমা হিসাবে গঠিত হয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে নদীয়া জেলাকে দুইভাগ করে মেহেরপুর মহকুমার করিমপুর ও শিকারপুর Ñ দুটি থানা কৃষ্ণনগর মহকুমার সাথে যুক্ত করে রানাঘাট মহকুমা নিয়ে নদীয়া জেলা পশ্চিমবঙ্গে এবং অবশিষ্ট গাংনী ও মেহেরপুর এই দুটি থানা নিয়ে গঠিত মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া মহকুমা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে নবগঠিত কুষ্টিয়া জেলার জন্ম হয়। ফলে একই নদীয়া জেলা দুই ভাগ হয়ে দুই দেশের অন্তর্গত হওয়ায় দুই অংশের আধাআধি মানুষ পরস্পর উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। দেশভাগ তাই এ অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবনে বয়ে আনে চরম বিড়ম্বনা এবং এক মহাবিপর্যয়।
১৯৪৭ থেকে নবগঠিত কুষ্টিয়া জেলার সাথে সম্পৃক্ত থেকে কেটে যায় পাকিস্তান আমলের ২৩ বছর। ১৯৮৪ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলা হিসাবে ঘোষিত হওয়ার ফলে  চুয়াডাঙ্গার প্রশাসনিক গুরুত্ব যেমন বেড়ে গেছে, তেমনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে তার দায়িত্ব এবং মর্যাদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। চুয়াডাঙ্গা জেলার মোট আয়তন ১১৭০.৮৭ বর্গকিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে চুয়াডাঙ্গা বাংলাদেশের ৫৪তম জেলা। মোট জনসংখ্যা ১১,২৯,০১৫। জেলার মোট উপজেলা ৪টি Ñ চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা,  দামুড়হুদা ও জীবননগর। পৌরসভা ৩টি — চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা ও দর্শনা। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড ৪০টি, মহল্লা ৬৯টি ও গ্রাম ৫২১টি।
খুলনা বিভাগের অন্তর্গত চুয়াডাঙ্গা জেলার উত্তর-পূর্বে কুষ্টিয়া জেলা, উত্তর-পশ্চিমে মেহেরপুর জেলা, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে ঝিনাইদহ জেলা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলা অবস্থিত। চুয়াডাঙ্গা জেলার মোট আয়তন ১১৭৪.১০ বর্গকিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে চুয়াডাঙ্গা বাংলাদেশের ৫৪তম জেলা। দেশের ভৌগোলিক পরিসীমায় ২৩.২২ ডিগ্রি থেকে ২৩.৩৯ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮.৩৭ডিগ্রি থেকে ৮৯.০৩ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা জেলা অবস্থিত।


১৮৭১ সালের জনগণনা অনুযায়ী জানা যায় যে, চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে ধর্মীয় হিসাবে জনগোষ্ঠীর হার মুসলিম ৫৯.৯৬% এবং হিন্দু ৪১.০৫%। সমগ্র চুয়াডাঙ্গা জেলার জন্য এই বিবরণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৪৭ সালের আগে এই জেলার ৫২১টি গ্রাম ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বসবাসের বিবেচনায় ৩টি শ্রেণী লক্ষ্য করা গেছে। কিছু গ্রাম মুসলিম প্রধান, কিছু গ্রাম হিন্দু প্রধান ও কিছু গ্রামের হিন্দু-মুসলমানের মিলিত বসবাস রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সুফি-সাধক, ওলি-আউলিয়া, পীর-দরবেশ, কুতুব-মাশায়েখ বুজুর্গ ব্যক্তিবর্গের আগমনের ফলে চুয়াডাঙ্গার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইসলাম বিস্তার লাভ করে। ১৪১৪ খ্রিস্টাব্দে আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানীর লেখা এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, ‘বাংলাদেশের শুধু শহরে বা নগরাঞ্চলে নয় Ñ এমন কোন গ্রাম বা জনপদ নেই যেখানে কোন মহান সাধকের পদধূলি পড়েনি।’ চুয়াডাঙ্গা জেলার গ্রামাঞ্চলে একটু অনুসন্ধান করলেই এর যথার্থতা এবং প্রমাণ পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত চুয়াডাঙ্গা এলাকায়ও সুলতানী আমলের [১২০৬Ñ১৫২৬] পরে থেকে মোগল আমল [১৫২৬-১৭৬৫ খ্রিঃ] পর্যন্ত সেই ধারা এবং তার কর্মকান্ডের বিস্তার অব্যাহত ছিল। চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে প্রায় প্রতিটি গ্রামে দরগা, আস্তানা, মসজিদ, কবর বা মহান সুফি-সাধকদের উপস্থিতির স্মৃতি শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও তার সব চিহ্ন আজও মুছে যায়নি। তাছাড়া  এ জেলায় নূরনগর, জাফরপুর, মোর্তজাপুর, কুতুবপুর, উজলপুর, খোরশেদপুর, নেহালপুর, হায়দারপুর, মানিকডিহি, হাসনহাটি, নুরুল্লাহ্পুর, জামালপুর, এরশাদপুর, কামালপুর, করিমপুর, ওসমানপুর, ফতেহপুর, এনায়েতপুর, মাদারহুদা, মানিকনগর, খাদিমপুর, ভালাইপুর, কাবিলনগর, হাকিমপুর, আসাননগর, ফরিদপুর, মুন্সীপুর-কুতুবপুর, পীরপুর-কুল্লাহ, হেমায়েতপুর, চারুলিয়া, ইব্রাহিমপুর, পীরপুর, মজলিশপুর, সুলতানপুর, শাহপুর, মানিকপুর, হাবিবপুর, মোক্তারপুর, মিনাজপুর ইত্যাদি গ্রাম-জনপদ বহু ওলি-আউলিয়া, সুফি-সাধক, কুতুব-মাশায়েখ, পীর-দরবেশ, বুজুর্গব্যক্তির নামের স্মৃতি বুকে ধারণ করে শতশত বছর ধরে এখনও বিরাজমান।
চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বসবাস রয়েছে। দেশভাগ, দেশত্যাগ ইত্যাদি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা টানাপোড়েনের কারণে এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের অবস্থা এখন ক্ষীয়মান। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের প্রায় সাত দশক পরে দেশভাগ, দেশত্যাগ ইত্যাদি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা টানাপোড়েনের কারণে বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলায় হিন্দু অধিবাসীর সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ২৯, ৯৮৫। বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলায় নতুন-পুরনো ও ছোট-বড় মিলিয়ে মোট মন্দিরের সংখ্যা ৮৭।
চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা এলাকায় ১৮০৯ সালে ক্রিশ্চিয়ান মিশনারি সোসাইটি প্রথম কার্পাসডাঙ্গা এলাকায় খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তাঁরা তাঁদের কাজে সফল হতে পারেননি। ১৮৩০ সালের দিকে পাদ্রী রেভারেন্ড এস. হেরসেলের উদ্যোগে খ্রিস্টধর্ম প্রচার শুরু হয়। ১৮৪৩ সালে কার্পাসডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত গির্জাটিই চুয়াডাঙ্গা জেলার সবচেয়ে পুরনো গির্জা। কার্পাসডাঙ্গায় খ্রিস্টান সমাজের ধারাবাহিক বিস্তারের মধ্য দিয়ে বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলার সদর উপজেলায় চুয়াডাঙ্গা শহরে, ডিঙ্গেদহ, খেজুরা, ডিহি কেষ্টপুর, হিজলগাড়ি, ফুলবাড়ি ও দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা, বাগাডাঙ্গা এবং দর্শনায় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোক বাস করে। এ জেলায় চার্চ অব বাংলাদেশ (প্রোটেস্ট্যান্ট) বা এসেব্লিজ অব গড (এ জি), রোমান ক্যাথলিক, সেভেনন্থ ডে অব এসেমব্লিজ Ñ এই তিন সম্প্রদায়ের খ্রিস্টানের বসবাস রয়েছে। এদের সব মিলিয়ে জনসংখ্যা প্রায় ২০০০-এর কাছাকাছি। বর্তমানে সব সম্প্রদায় মিলিয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলায় মোট ৬টি গির্জা রয়েছে। খ্রিস্টান সমাজের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয় মূলত গির্জাকে কেন্দ্র করে।
চুয়াডাঙ্গা জেলায় বসবাসরত আদিবাসী সম্প্রদায় বুনো বা বাগদী বা সর্দার নামে কথিত হয়ে থাকে। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার হায়দারপুর, ডিহি মিশনপাড়া, ফুলবাড়ি, আলমডাঙ্গা উপজেলার রেলস্টেশন পাড়া, ঘোলদাড়ী, আইলহাস, দুর্গাপুর দামুড়হুদা উপজেলার নিশ্চিন্তপুর সংলগ্ন আদিবাসী পাড়া, দর্শনা পৌর এলাকার মেমনগর কুঠিপাড়া, পুড়োপাড়া, জীবননগর উপজেলার মনোহরপুর, শিয়ালমারী, আন্দুলবাড়িয়া, সড়াবাড়িয়া, গয়েশপুর, সুবলপুর, রায়পুর, পীরগাছা, সুটিয়া, ইত্যাদি অঞ্চলে সব মিলিয়ে বর্তমানে ৭ হাজারের  বেশি আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করে।
চুয়াডাঙ্গার এই বিস্তীর্ণ জনপদ সম্পর্কে তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ববহ। এক. চুয়াডাঙ্গার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মাথাভাঙ্গা ছাড়া  ভৈরব, কুমার, নবগঙ্গা, ভাইমারা, ভাটই, মাহেশ্বরীÑÑসব নদীই পূর্বগামী। ফলে পদ্মা নদীর দক্ষিণে সমগ্র দক্ষিণবঙ্গ ভারতসহ এবং বহির্বিশ্বের সাথে অবাধে ব্যবসা-বাণিজ্যের আদান-প্রদান, প্রচার-প্রসারের ও যোগাযোগের একমাত্র উপায় ছিল নদীপথ। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল ভৈরব নদের। এই অঞ্চলে উৎপাদিত ধান, গম, যব, ভুট্টা, মুগ, মসুর, ছোলা, খেসারি, সরিষা, তিসি, কুসুম ফুল, বাদাম, সূর্যমুখী, পাট, কার্পাস তুলা, খেজুর গুড়, দেশী চিনি, আখের গুড়, ধনে, কালজিরা ইত্যাদি দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করে বিদেশী বণিকদের কাছেও বাংলাদেশের পণ্যের সুনাম ছড়িয়েছে।
দুই. বিদেশী পর্যটকসহ লক্ষণ সেন, বিজয় সেন, যশোররাজ প্রতাদিত্য, স¤্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহসহ সুলতানী এবং মোগল আদলের অসংখ্য শাসক শ্রেণীর লোক-লস্করের যাতায়াত ছিল ভৈরব নদীপথেই।
তিন. হজরত খান জাহান আলী ১৪১৯ খ্রিষ্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে ভৈরব নদী পথে বাগেরহাট অঞ্চলে যাবার সময়ে   চুয়াডাঙ্গা জেলার ভৈরবনদের পশ্চিম তীরের দামুড়হুদার একটি গ্রামে সাময়িক শিবির স্থাপন করেন। এখানে তাঁর  লক্ষাধিক সঙ্গী সাথীসহ দীর্ঘ যাত্রাপথের ক্লান্তি দূর করার জন্য বিশ্রাম গ্রহণ, অসুস্থ যাত্রীদের সেবা শুশ্রƒষা এবং রসদপত্র, খাবার পানি, ইত্যাদি সংগ্রহের জন্য কয়েক মাস অবস্থান করেন। তিনি এখানে নিজেদের পানীয় জলের প্রয়োজন মিটানোর জন্য একটি দিঘি খনন করেন। দিঘির পশ্চিম পারে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি বহু আগেই ধ্বংস হয়ে গেছ্।ে তবে তার ভিতের চিহ্ন এখনও টের পাওয়া যায়।
খান জাহান আলি এই জায়গা থেকে পরবর্তী গন্তব্য বারোবাজারে রওনা হওয়ার আগে এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের কাজে তাঁর সঙ্গী মেহেরুল্লাহ শাহকে খলিফা নিযুক্ত করে আরও তিনজন  বুজুর্গ আওলিয়া ÑÑ শেখ ফরিদ, মালেকুল গাউস ও সৈয়দ মুহম্মদ জহিরুদ্দিন ওরফে মেহমান শাহকে এই গ্রামে রেখে যান। ইসলাম প্রচারের কাজে নিয়োজিত এই ‘চার আওলিয়া’ থেকে এই গ্রামের নাম হয় ‘চারুলিয়া।’ খান জাহান আলির এই অনুসারীবর্গ ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে ধর্মীয় সাধনা ও বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে নানারকম জনহিতকর কাজে আমৃত্যু নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। এঁদের সুপরিকল্পিতভাবে ব্যাপক প্রচার ও জনকল্যাণমূলক কর্মতৎপরতার ফলে এ অঞ্চলে শান্তিপূর্ণভাবে ইসলাম ধর্মের বিকাশ ও মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। এই সব সাধকদের নিঃস্বার্থ জনসেবা এবং অনাড়ম্বর দৈনন্দিন জীবনাচরণে মুগ্ধ হয়ে এ অঞ্চলের বহু লোক তাঁদের ভক্ত-মুরিদে পরিণত হয়ে ধীরে ধীরে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন।
চুয়াডাঙ্গা জেলা হজরত খানজাহান আলির প্রশাসনিক এলাকার অন্তর্গত না হলেও চারুলিয়ায় তাঁর এই অবস্থান এ অঞ্চলের সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে সুদূর প্রসারী ভূমিকা এবং ছাপ রেখে যায়। চুয়াডাঙ্গার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এমন অসংখ্য সাধকের অবিস্মরণীয় ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।


একজন খ্যাতসামা ইতিহাসবিদ বলেছেন : নো ডকুমেন্ট, নো হিস্ট্রি অর্থাৎ প্রামাণিক উপাদান ছাড়া ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়। ইতিহাসের বিষয়ানুগ উপাদান সংগ্রহ, সহায়ক ইতিহাস গ্রন্থাদি ব্যবহার করা, পারিবারিক প্রাচীন দলিলপত্র, ফরমানাদি ও নথিপত্রাদি অনুসন্ধান, প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য, লোকায়ত সাহিত্য, মেয়েলী গীতে, নকশি কাঁথায় সামাজিক ইতিহাসের বহুসূত্র খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। ধাঁধা, প্রবাদ, ছড়া বা গানেও অনেক উপাদান পাওয়া যায়। যেমন, ‘বাজে কাজে কাটনা কামাই’ প্রবাদটি স্মরণ করিয়ে দেয় যখন ঘরে ঘরে কাপড় বোনার জন্য নৈমিত্তিক সুতো কাটা হতো, সেই সময়ের কথা। নবাব আলিবর্দি খানের আমলে [১৭৪২Ñ১৭৫৭] ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে হোগলডাঙ্গা গ্রামের পাশ দিয়ে সে সময়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদীপথে আসা বর্গীদের হামলা মোকাবিলা করে বিতাড়িত করে। হোগলডাঙ্গা গ্রামে গতি-পাল্টানো মরা-ভৈরব নদীর সংঘর্ষের জায়গাটি এখনও ‘বর্গীখাল’ নামে পরিচিত। বর্গি হাঙ্গামা সে সময়ে এ দেশে শিশু ও নারীহরণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি এমন অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যে, বর্গিদের ভীতিকর উল্লেখ শিশুদের ঘুমপাড়ানি ছড়া-গানে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
নবাব আলিবর্দি খান হরিণ শিকার করতে প্রায়ই ভৈরব নদী পথে দামুড়হুদা এলাকায় আসতেন। এমন কথা জগন্নাথপুর, শিবনগর, চন্দ্রবাস ও অন্যান্য গ্রামেও শোনা যায়। একবার শিকারে এসে শিবনগর গ্রামে খানজাহান আলির শিষ্যদের তৈরি মসজিদটি কালক্রমে ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হলে নবাব আলিবর্দি খান সেই মসজিদটি সংস্কারের নির্দেশ দেন।। মসজিদটির অস্তিত্ব বর্তমান থাকলেও সংস্কারের পর সংস্কারে আদিরূপ ধ্বংস হয়ে গেছে।
মানিকপীরের গানে বাঁকার জয়ন্ত ময়রার উপাখ্যানে নানা রূপকে কিংবা প্রতীকের অভিজ্ঞানে ধরা আছে সময়ের ইতিহাস।  চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে প্রাপ্ত কিছু ঐতিহাসিক প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন যেমন, খান জাহান আলির সময়ের চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে প্রাপ্ত বেশ কিছু প্রাচীন মুদ্রা, মধ্যযুগে ব্যবহৃত মশলা পেশার জন্য কালো ও বেলে পাথরের শিলপাটা, ঘোষবিলা গ্রামে হজরত শাহনূর বাগদাদী (রহ:) ব্যবহৃত দ্রব্যাদি, ঘোলদাড়ি মসজিদ এবং মসজিদের ভিতরের পোড়ামাটির কারুকাজ, কড়চাডাঙ্গা ষোড়শ শতকের মন্দির, চারুলিয়ার ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের টেরাকোটা নকশা, আড়িয়া চক গ্রামে গাজির থান/দরগা, হজরত শাহনূর বাগদাদী (রহ:) ব্যবহৃত দ্রব্যাদি ইতিহাসের বহু উপাদানই মানুষের চোখের আড়ালে রয়ে গেছে। কালুপোল গ্রামে চিত্রা নদীর তীরে রয়েছে ১৪০০ সালের প্রথম দিকে নির্মিত রাজা গন্ধর্ব রায়ের রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। নিঃসন্দেহে চুয়াডাঙ্গা জেলার এটাই সবচেয়ে বড় পুরনো ঐতিহাসিক নিদর্শন যার চিহ্ন এখনও টিকে রয়েছে।
ইতিহাস থাকে বইয়ের পাতায়, ইতিহাস থাকে মহাফেজখানায়, ইতিহাস থাকে সাহিত্যের মর্মবাণীতে মিশে, মানুষের মুখে মুখে আর সব থেকে বেশি থাকে জনপদে, হাটে-বাটে-মাঠে, পুকুর-দিঘি-জলাশয়, নদীনালা, খালেবিলে নানা আকারে, গল্প গাথা কথায়, সরাসরি কিংবা খোলসের আড়ালে। আর সে ইতিহাসের পাঠ নিতে গেলে আগে থাকা চাই ইতিহাসের কালজ্ঞান, তারপরে নিতে হবে ইতিহাস রচনার পদ্ধতিগতভাবে ‘নিবিড় পাঠ’ ও সমীক্ষা। শুধু তাই নয়, দক্ষ হতে হবে ক্ষেত্র-জরিপে।  চুয়াডাঙ্গা জেলার বহু গ্রামের নামের সাথে ইতিহাসের উপাদান জড়িয়ে আছে। সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া যাবে গ্রামের মাঠের নামগুলি থেকে। খোলা রাখা চাই চোখ কান আর মন। চোখের সামনেই খোলা আছে আমাদের ফেলে আসা ইতিহাসের সোনালি পাতা।
—————

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।