চুয়াডাঙ্গা সোমবার , ১৫ আগস্ট ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চালের বাজার স্থিতিশীল রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জে সরকার

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
আগস্ট ১৫, ২০২২ ৯:০০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন: এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে মানুষের দীর্ঘদিনের হা হুতাশ। এর মধ্যে ইউরিয়া সার ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে আগুন লেগেছে বাজারে। বিশেষ করে দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য চালের দাম গত এক সপ্তাহে রকম ফের ২-১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে কেজিতে। এ নিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত তো বটেই টান লেগেছে অনেক সামর্থ্যবান পরিবারেও। অন্যান্য নিত্যপ্রায়োজনীয় জিনিসপত্রের মতোই হু হু করে চালের দাম বাড়ায় দুশ্চিন্তার শেষ নেই মানুষের। চালের ঊর্ধ্বমূল্য ঠেকাতে সরকার বেসরকারিভাবে ১০ লাখ ১০ হাজার টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই আমদানিতেও গতি নেই। এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৪ হাজার টন চাল আমদানি করেছেন ব্যবসায়ীরা। অন্য দিকে, অভ্যন্তরীণভাবে বোরো ধান, চাল সংগ্রহও ভাটা পড়েছে। এমতাবস্থায় সরকার ঊর্ধ্বমুখী চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশব্যাপী দুই হাজার ১৩ জন ডিলারের মাধ্যমে খোলা বাজারে চাল বিক্রি (ওএমএস) এবং একই সাথে খাদ্যবন্ধব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

গতকাল রোববার সচিবালয়ে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার এ তথ্য জানান। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় বছরের কর্মাভাবকালীন পাঁচ মাস (মার্চ-এপ্রিল, সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) পরিবারপ্রতি ১৫ টাকা কেজি দরে মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হয়। অন্য দিকে ওএমএস কর্মসূচির আওতায় যে কেউ ডিলারের কাছ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে সর্বোচ্চ ৫ কেজি চাল কিনতে পারেন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, গত ১১ জুলাই পর্যন্ত দেশে খাদ্যশস্যের সরকারি মোট মজুদ ১৮ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল ১৫ লাখ ২৯ হাজার টন, গম ১ লাখ ৪৯ হাজার টন এবং ধান ১ লাখ ৩০ হাজার টন। গত ২৮ এপ্রিল থেকে সরকার অভ্যন্তরীণভাবে বোরো ধান, চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু করে। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই সংগ্রহ অভিযান চলবে। জানা যায়, সরকার ২৭ টাকা কেজি তথা ১০৮০ টাকা মণে ধান, ৪০ টাকা কেজিতে সেদ্ধ চাল এবং ৩৯ টাকা কেজিতে আতপ চাল কেনার দাম নির্ধারণ করে দেয়। সরকারের টার্গেট ছিল এই সময়ের মধ্যে ৬ লাখ ৫০ হাজার টন বোরো ধান, ১৩ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ৫০ হাজার টন আতপ চাল অর্থাৎ মোট ২০ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহ করবে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহের হার হতাশাজনক। গত ১১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ধান, চাল সংগৃহীত হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৭ হাজার ৭৮৯ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ধান ২ লাখ ৩২ হাজার ৬২ টন, সিদ্ধ চাল ৯ লাখ ২১ হাজার ৫৩৩ টন এবং আতপ চাল ৩৫ হাজার ৪১৬ টন। গত ৬ আগস্ট দেশের সব আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের চিঠি দিয়েছে খাদ্য অধিদফতর। ওই চিঠিতে বলা হয়, চলতি (২০২২) বোরো মওসুমে ধান-চাল সংগ্রহের সময়সীমা আগামী ৩১ আগস্ট নির্ধারিত রয়েছে। সংগ্রহের নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার সমুদয় পরিমাণ ধান-চাল সংগ্রহের নির্দেশনা রয়েছে। ৩১ আগস্টের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার অবশিষ্ট ধান-চাল সংগ্রহ সম্পন্ন করতে হবে।

অন্য দিকে চালের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে বেসরকারিভাবে ১০ লাখ ১০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলেও গত ১১ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ৩৪ হাজার টন চাল দেশে এসেছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে আমদানির এই চাল দেশে আসার কথা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত আসবে কিনা এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশের অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি চালের বাজার যখন ঊর্ধ্বমুখী সেই মুহূর্তে দেশের অভ্যন্তরীণভাবে ধান-চাল সংগ্রহ এবং বিদেশ থেকে চাল আমদানিতে ধীরগতি সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আপাতত চালের বাজারে স্বস্তির আশা দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশাবাদী কারণ সামনে আমন উঠবে। সেই আউশ ওঠার জন্য আমরা বসে থাকব না, আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আমাদের বোরো সংগ্রহের শেষ সময়। আমরা ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৫০ লাখ পরিবার বা চার কোটি মানুষের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু করছি। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি একসাথে চালু হলে আমি মনে করি চালের দাম স্থিতিশীল অবস্থায় চলে আসবে। আমাদের সরকারি মজুদ আছে, আমরা তো মানুষের জন্যই মজুদ করি। যারা এ চাল নিবে তাদের তো বাজার থেকে আর চাল কিনতে হবে না। এখন চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, এখন দু’টি মৌসুমের সন্ধিক্ষণ, বোরো চলে গেছে, আমন আসবে। অনেক জায়গায় খরার কারণে মানুষ আমন লাগানো নিয়ে ভয়ভীতিতে আছে। এর সাথে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। পরিবহন খরচের হারের চেয়ে চালের দামটা বেশি বেড়েছে। সেখানে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীও আছে। এটা পরিষ্কার কথা, আমাদের অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে সেটাও আমরা মনিটরিং করছি। অবৈধ মজুদের বিষয়ে আমাদের তো নিয়মিত মনিটরিং আছেই। সেটা আরো জোরদার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আমরা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে মাঠে নামতে বলেছি। পাঁচটি মনিটরিং কমিটি হয়েছে আগেই, সেগুলো সক্রিয় হবে। জেলা প্রশাসকদের এখানে বসেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারা যাতে বা
জারটা পুরোপুরি মনিটরিং করেন। কোথাও অবৈধভাবে ধান ও চালের মজুদ থাকলে আগে যেভাবে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো হয়েছে সেভাবে চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সারে তেমন কোনো প্রভাব পড়ার কথা না। তবে ডিজেল বা জ্বালানিতে (বাড়ার কারণে) প্রভাব পড়েছে বা পড়বে। কারণ ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার হয় সেচের শ্যালো-টিউবওয়েলের জন্য। তারপর শাকসবজি, ফলমূল, কৃষি উপকরণ পরিবহনের জন্য অনেক ডিজেল খরচ হয়। তেলের দামের প্রভাব অবশ্যই প্রত্যক্ষভাবে কৃষির ওপর পড়বে। চাষিদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষকদের নগদসহায়তা দেয়া হবে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের আলাপ-আলোচনা চলছে। আমরা বিদ্যুতে ২০ শতাংশ ভর্তুকি দেই। ডিজেলে ভর্তুকি কৃষকদের আলাদাভাবে দেয়া একটু কঠিন। কাদেরকে দেব? ধনী-গরিব, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র চাষি নানা রকম চাষি আছে। যদি সবাইকেই (চাষিদের) দেই, তারপরও ডিজেল নিয়ে একজন চাষি গাড়ি বা অন্য কাজে ব্যবহার করবে না, এটা তো বিরাট সমস্যা। অনেক সময় দেখা যায়, স্লিপ দিলে সেটা বিক্রি করে দিয়ে…। কৃষিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে চাহিদার বিপরীতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপিসহ সব ধরনের সারের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। দেশের কোথাও যাতে কেউ কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করতে না পারে সে ব্যাপারে আমরা নিবিড়ভাবে মনিটর করছি। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করলে সংশ্লিষ্টদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, মানুষের কষ্ট লাঘবে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।