চুয়াডাঙ্গা বুধবার , ৩১ আগস্ট ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চার ধরনের বিচ্যুতিতে দেশের অর্থনীতি

অর্থনীতিতে চাপ থাকলেও সঙ্কট নেই; ২০২৪ সালের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
আগস্ট ৩১, ২০২২ ৮:০৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন: ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ না হওয়া, কর সংগ্রহে দুর্বলতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বৈষম্য- এই চার ধরনের বিচ্যুতিতে আক্রান্ত দেশের অর্থনীতি। অর্থনীতিতে চাপ থাকলেও সঙ্কট নেই। তবে আগামী ২০২৪ সালের আগে পরিস্থিতির স্বাভাবিক হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, পুঁজিবাদের বিকাশে সব দেশেই লুণ্ঠন হয়। বাংলাদেশে প্রথমে আর্থিক খাতে লুণ্ঠন হয়েছে। দ্বিতীয় হয়েছে পুঁজিবাজারে। এখন তৃতীয় লুণ্ঠন সরকারি প্রণোদনায় অতি মূল্যায়িত প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান করছে। তবে অন্য দেশে লুণ্ঠনের পরে বিচারব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে তা দেখা যাচ্ছে না।
রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইআরএফ কার্যালয়ে অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ইআরএফ সংলাপে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দেশের অর্থনীতির এমন বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। সংগঠনের সভাপতি শারমিন রিনভীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক এসএম রাশিদুল ইসলাম। অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এসব বিচ্যুতি ঠিক মোকাবেলা করা না গেলে পরবর্তী উত্তরণ পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। একই সাথে যে অর্জন হয়েছে সেটিও টেকসই হবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি জটিল এবং সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশে এবং বিশে^ এরকম পরিস্থিতি হতে পারে তা আগেই বলা হয়েছিল। পাশাপাশি এ ধরনের সঙ্কট মোকাবেলায় স্বল্প মেয়াদি স্থিতিকরণ কর্মসূচি জরুরি উল্লেখ করা হয়েছিল। যে কারণে জিডিপির অভিলাষ সংযত করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আর্থিক ও বৈদেশিক লেনদেন নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে। বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বিনিময় হার এবং মূল্যস্ফীতিতে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা দ্রুত শেষ হবে না।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশের মূল সমস্যা বৈদেশিক লেনদেনে নয়। মূল সমস্যা আর্থিক খাতের দুর্বলতা। প্রয়োজনীয় রাজস্ব সংগ্রহ না হওয়া। যে কারণে জ¦ালানিতে ভর্তুকি, দরিদ্র্যদের খাদ্যসহায়তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি মূলত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ দ্বারা ধাবিত। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি। এটা জিডিপির ২৩ বা ২৪ শতাংশে আটকে আছে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ৫ বা ৬ শতাংশ থেকে ৭ বা ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগও (এফডিআই) হয়নি। এফডিআই জিডিপির এক শতাংশের নিচে, যা গতিশীল অর্থনীতির জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বেশি হলে সেগুলোর সুবিধা নিয়ে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা ঘটেনি। বাংলাদেশের অবস্থা এক ইঞ্জিনে চলা অ্যারোপ্লেনের মতো। যে বেশি দূর যেতে পারে না। কিছু দূর চলার পর রানওয়ে খুঁজতে থাকে। অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় বলেন, এক দশক ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৫ থেকে ৭ শতাংশ হারে। এর অর্থ আয় বাড়ছে। তাহলে কর সংগ্রহ হচ্ছে না কেন? কর সংগ্রহ করতে না পারার কারণে এখন আমদানি করা যাচ্ছে না। খাদ্যসহায়তা বাড়ানো যাচ্ছে না। শুল্ক কমাতে পারছে না। পরোক্ষ কর থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করতে হচ্ছে বেশি, যা সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলছে।
দেবপ্রিয় বলেন, সরকার ভৌত অবকাঠামো যে পরিমাণ বিনিয়োগ করছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সেই বরাদ্দ থাকছে না। ২০টি মেগা প্রকল্পের জন্য জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। অথচ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকছে জিডিপির এক শতাংশ। শিক্ষাতেও সমপরিমাণ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক শক্তি বৈধতার জন্য খুব দ্রুততার সাথে দৃশ্যমান ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন করতে চাচ্ছে। রাজনৈতিক ঘাটতি পুরনের চেষ্টা হচ্ছে। কারণ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগের ফলাফল আসতে দশকের বেশি সময় লাগে। রাজনৈতিক চক্রে এই সময় নেই। পাশাপাশি সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের কারণে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বৈষম্য হচ্ছে। করোনার সময় সহায়তা বিতরণে বড় ধরনের বৈষম্য দেখা দিয়েছে। যার যা প্রাপ্য তা নথিভুক্ত হয়নি। ফলে প্রমাণিত হয়েছে সরকারের সেবা পাওয়ায় দুর্বল নাগরিকদের অভিগমন সহজ নয়।
সিপিডির এই সম্মানীয় ফেলো বলেন, দেশে প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবসায়িক পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে না। বিশেষ জায়গা থেকে বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়া হচ্ছে। এতে মেধাভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ব্যক্তি বিনিয়োগ বিকশিত হচ্ছে না। এর ফলে ক্ষতি হচ্ছে সরকার, মানুষ ও দেশের। বিদ্যুৎ, জ্বালানিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ তুলে নেয়া হয়েছে। বিচারের সুযোগও তুলে নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্জনও আছে। বিচ্যুতিও আছে। এই বিচ্যুতি অর্জনকে দুর্বল করে দিতে পারে। তবে বাংলাদেশ অনেক সমস্যা উত্তরণ করে এই অবস্থায় এসেছে। আশা করা যায় আগামীতেও সমস্যা উত্তরণ করে এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, এখানে প্রতিযোগিতার চেয়ে সংযোগকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে জবাবদিহিতার জায়গা দুর্বল হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে প্রধান রাজনৈতিক শক্তির। দেবপ্রিয় বলেন, অর্থনীতির রোগ নির্ণয় হয়েছে। এ বিষয়ে ঐকমত্যও আছে। এখন দরকার নিরাময়। কিভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায়, তার উপায় খুঁজে বের করা জরুরি। এ জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি সঙ্কটে নেই, চাপে আছে। তবে সামষ্টিক অর্থনীতিতে এখন যে অস্থিরতা চলছে, তা সহসাই কাটবে না। ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত এ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থাকবে। যারা বলছেন শিগগিরই সঙ্কট কেটে যাবে, তারা চটজলদি রাজনৈতিক চিন্তা থেকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। এতে বাজারে অস্থিতিশীলতা ও আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, বিনিময় হার বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার সাথে অর্থ পাচারের সংযোগ থাকতে পারে। জ্বালানি তেলের দাম ৩৪ থেকে ৪৪ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে ৫ টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত অনৈতিক অব্যবস্থাপনার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় বলেন, আগামী দুই-তিন মাস মাসের মধ্যে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে বলে যারা মন্তব্য করেছেন, তাদের ধারণা ঠিক নয়। এ ধরনের মন্তব্যে বাজারে আরো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আগামী ২০২৪ সালের আগে পরিস্থিতির স্বাভাবিক হবে না। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু হবে না আমরা কখনো এ কথা বলিনি। আমরা এর অর্থায়ন পদ্ধতি নিয়ে বলেছিলাম। পদ্মা সেতুর জন্য অবশ্যই বর্তমান সরকার প্রশংসা দাবি রাখে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।