চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ৮ জানুয়ারি ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে সংলাপ : ভারী হচ্ছে বর্জনের পাল্লা

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জানুয়ারি ৮, ২০২২ ৪:৫৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে রাষ্ট্রপতির চলমান সংলাপ ধীরে ধীরে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে এই সংলাপ বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে সরকারি দলের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি। একই পথে হেঁটেছে বাম গণতান্ত্রিক জোটভুক্ত সিপিবি, বাসদ, এলডিপি, জেএসডি, গণফোরামের একটি অংশ ও চরমোনাইয়ের পীর মাওলানা মোহাম্মদ রেজাউল করিমের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সংলাপে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দেয়া দলগুলো বলেছে, রাষ্ট্রপতির এই সংলাপ অর্থহীন, আইওয়াশ। অতীতেও এই ধরনের সংলাপ হয়েছে, কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। সরকারের অনুগতদের দিয়েই কমিশন গঠন করা হয়েছে।

দলগুলোর নেতাদের অভিমত, দলীয় সরকারের অধীনে দেশে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারে কোনো বিকল্প নেই। যদি কোনো সংলপ হতে হয়, এই ইস্যুতে হতে পারে। গত ২০ ডিসেম্বর থেকে রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ শুরু করেছেন। ইসি গঠনে আইন না থাকায় আগের দুইবারের মতো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নিয়োগের প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির মেয়াদ আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি শেষ হচ্ছে। তার মধ্যেই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে রাষ্ট্রপতিকে। এ লক্ষ্যে বঙ্গভবন থেকে এখন পর্যন্ত ২৭টি দলকে সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ২০১৬ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপের মধ্য দিয়ে কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন এই কমিশন গঠন করেছিলেন রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ। কিন্তু এই ইসি নিয়ে বিতর্কের কোনো শেষ নেই। সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে গত কয়েক বছরে স্থানীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচনও বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। বিশেষত, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন মহাবিতর্কের জন্ম দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওই নির্বাচন সম্পূর্ণভাবেই ইসির নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। নির্বাচন আগের রাতেই হয়ে গেছে বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ইসি পুনর্গঠনে এবারের সংলাপ নিয়ে শুরু থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিপরীতমুখী আলোচনার সূত্রপাত হয়। সংলাপে খুব একটা যে সাড়া পাওয়া যাবে না, তা আগেই থেকেই কিছুটা টের পাওয়া যাচ্ছিল।

বিএনপি চিঠি পাওয়ার আগেই সংলাপে যোগ না দেয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছে, বিগত দু’টি নির্বাচন কমিশন গঠনের পূর্বে রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে নিবন্ধনকৃত রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নিয়ে তাদের মতামত দিয়েছিল। বিএনপি মনে করে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকালীন সময়ের নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং নিরপেক্ষ প্রশাসনের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা ব্যতীত নির্বাচন কমিশনের গঠন নিয়ে সংলাপ শুধু সময়ের অপচয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলীয় সরকার বহাল রেখে নির্বাচন কমিশন কখনোই স্বাধীনভাবে নিরপেক্ষ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারবে না। দলটি বলেছে, নির্বাচনকালীন সময়ে নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার ব্যতিরেকে সুষ্ঠু, অবাধ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কোনো নির্বাচন কমিশনই অনুষ্ঠান করতে পারবে না। রাষ্ট্রপতি নিজেই বলেছেন তার কোনো ক্ষমতা নেই পরিবর্তন করার। সেই কারণে রাষ্ট্রপতির সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ কোনো ইতিবাচক ফলাফল আনতে পারবে না। বিএনপি অর্থহীন কোনো সংলাপে অংশগ্রহণ করবে না। এলডিপির প্রধান কর্নেল (অব:) অলি আহমদ সংলাপে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রপতির সাথে সংলাপ মানে হচ্ছে চা-চক্র, চা খাওয়া। আগেও আমরা এরকম সংলাপে গেছি কোনো ফল আসেনি। আমরা মনে করি, এই সংলাপ অর্থহীন। চা খেতে বা জনগণের টাকা নষ্ট করতে এলডিপি বঙ্গভবনে যাবে না। অর্থহীন এই সংলাপে অংশ নেবো না।

গণফোরামের একাংশের সভাপতি মোস্তফা মহসিন মন্টু সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, দেশের মানুষ বিশ্বাস করে, রাষ্ট্রপতির এই সংলাপ কার্যত একটি নাটকীয় আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। চলমান সংলাপ দেশবাসীর কাছে আগের মতোই চাতুর্যপূর্ণ সংলাপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে দেশে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের গ্যারান্টি এখন অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্যে আমরা ইতোমধ্যে জাতীয় সরকারের প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছি। তিনি বলেন, সংলাপ হবে নির্বাচন কমিশন নিয়ে নয়। সংলাপ হতে পারে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয় সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে।

বাসদ জানিয়েছে, ২০১২ ও ২০১৬ সালের সংলাপে তাদের মতামত আমলে নেয়া হয়নি। আর সিপিবি সভাপতি বলেপ্রণ, নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রধান মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করীম বলেছেন, জনগণ মনে করছে, রাষ্ট্রপতির সংলাপে ফলপ্রসূ কিছু হবে না। অতীতের দু’টি সংলাপ যেমন জনপ্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ েেহয়্ছ, চলমান সংলাপও এর ব্যতিক্রম কিছু হবে বলে জনগণ মনে করে না। জানা গেছে, মাঠের বিরোধী দল হিসেবে বিবেচিত বিএনপি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে। ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্ট ছাড়াও এই দাবিতে বৃহত্তর রাজনৈতিক মঞ্চ গড়ে তোলা হতে পারে। খুব শিগগিরই রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বিএনপি এসব ইস্যুতে সিরিজ বৈঠক করবে। সংলাপ বর্জনকারী বিভিন্ন দলকেও এই মতবিনিময়ে ডাকা হবে। তাদের মতামতের ভিত্তিতে সরকারবিরোধী কর্মপরিকল্পনা সাজানো হবে। সার্চ কমিটির মাধ্যমে সরকারের অনুগতদের বাইরে কাউকে দিয়ে যে কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠন সম্ভব নয়, তা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খানও। তিনি বলেছেন, নির্বাচন কমিশন গঠন করার জন্য সার্চ কমিটি করে কোনো লাভ হবে না। সরকারের পছন্দের তালিকাভুক্ত লোক দিয়েই নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে। বর্তমান কে এম নুরুল হুদা কমিশন আইনের সঠিক প্রয়োগ করে নাগরিক অধিকার সুরক্ষা ও ভালো নির্বাচন করতে পারত, যা বাস্তবে হয়নি।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।