গাজায় ইসরাইলের তাণ্ডব

27

বাইডেনের ফোনের পর আরও ৩৩ ফিলিস্তিনিকে হত্যা; সাত দিনে হামলায় নিহত অর্ধশতাধিক শিশু; আলজাজিরা ও এপির অফিস ভবন ধ্বংস; বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ঝড়
সমীকরণ প্রতিবেদন:
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় নিরস্ত্র লোকদের ওপর ইসরাইলের তাণ্ডব অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত শনিবার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ফোন করার পর আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে দখলদার বাহিনী। ওই ফোন কলে দৃশ্যত গাজায় ইহুদি হত্যাযজ্ঞের প্রতি সমর্থন জানান বাইডেন। চলমান তাণ্ডবকে ইসরাইলের ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি। একই সাথে রকেট হামলা থামাতে ফিলিস্তিনের প্রতি আহ্বান জানান। ওই ফোন কলের পরই গাজায় হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন নেতানিয়াহু। এরপর গতকাল রোববার ভোরে বিমান হামলা চালিয়ে অন্তত ৩৩ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রটির বাহিনী। এ দিকে জেরুসালেমের পবিত্র আল আকসা মসজিদকে ঘিরে ফিলিস্তিনি মুসলমান ও ইহুদি দেশটির চরম উত্তেজনার মধ্যে মুখ খুলেছে প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্র সৌদি আরব। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল ওআইসির জরুরি এক ভার্চুয়াল বৈঠকের আগে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের অমানবিক সহিংসতার নিন্দা জানান। অন্য দিকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ পরিস্থিতিতে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্য ও সঙ্কল্পবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ বিষয়ে গতকাল জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদেরও একটি বৈঠক হওয়ার কথা।
গত সোমবার থেকে ফিলিস্তিনিদের ওপর তাণ্ডব শুরু করে ইসরাইল। দফায় দফায় বিমান হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় অন্তত ১৮১ ফিলিস্তিনিকে। সন্তানসম্ভবা নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষও বাদ যায়নি তাদের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ থেকে। বিমান থেকে একের পর এক বোমা নিক্ষেপ করে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। বোমার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে পুলিশের বিভিন্ন ভবন। এমনকি আবাসিক ভবনেও বিমান হামলা চালিয়েছে দখলদার বাহিনী। গতকাল টানা সপ্তম দিনের মতো গাজার ওপর হামলে পড়ে দখলদার বাহিনী। উপত্যকায় সাম্প্রতিক তাণ্ডব শুরুর পর এ দিনই সবচেয়ে বেশি আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তারা। বিমান হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় দু’টি আবাসিক ভবন। হত্যা করা হয় অন্তত ৩৩ ফিলিস্তিনিকে। আহত হয়েছে আরো কয়েক ডজন মানুষ। শনিবার ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে হামাসের ড্রোন হামলা থামানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এর পরদিনই গাজায় হামাসের প্রধান ইয়াহিয়া আল সিনওয়ারের বাড়িতে বিমান হামলা চালায় দখলদার বাহিনী। খবর আলজাজিরা, মিডল ইস্ট মনিটর, রয়টার্স, সিএনবিসির।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৮১ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল। নিহতদের মধ্যে ৫২ শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছে সহস্রাধিক মানুষ। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন-হামাসও সাধ্যমতো রকেট হামলা চালিয়ে দখলদার বাহিনীকে পাল্টা জবাব দেয়ার চেষ্টা করছে। হামাসের শতাধিক রকেট হামলায় ইসরাইলে অন্তত ১০ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে এক ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন। এ দিকে গাজা উপত্যকার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের আগে ভোরেই সেখানে নতুন করে তাণ্ডব চালায় দখলদার বাহিনী।
হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা নেতানিয়াহুর
গাজায় ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলা শুরুর পর অন্তত দুই দফায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। শনিবারও ফোনে কথা হয়েছে তাদের। হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীকে বাইডেন বলেছেন, গাজা থেকে হামাস ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর রকেট হামলা ঠেকাতে তাদের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। তাদের এই অধিকারের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। বাইডেনের সাথে এই ফোনালাপের পর নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হামাসকে এমন বার্তা পাঠানো যে, পরেরবার তারা চাইলেও আর রকেট হামলা চালাতে পারবে না। সেই সক্ষমতা তাদের থাকবে না।
এ দিকে তাণ্ডবের ধারাবাহিকতায় গাজায় আলজাজিরার অফিস ভবন গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার মুখে পড়েছে ইসরাইল। ১২ তলাবিশিষ্ট ওই ভবনটিতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েট প্রেসেরও (এপি) ব্যুরো কার্যালয় ছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় ছাড়াও আবাসিক কাজেও ব্যবহৃত হতো ভবনটি। শনিবার বিমান হামলা চালিয়ে ভবনটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। জো বাইডেনের সাথে ফোনালাপে আল জালা নামের ওই ভবনে হামলা নিয়েও কথা বলেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, হামাসের সাথে যুক্ত নয় এমন ব্যক্তিদের আগেই সেখান থেকে বের করে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে ইসরাইল।
এ দিকে সংবাদমাধ্যমে হামলার ঘটনায় সমালোচনার মুখে এ নিয়ে কথা বলেছেন হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জেন সাকি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ইসরাইলের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা হয়েছে। তাদের বলা হয়েছে, সাংবাদিক ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আল জালা ভবনে হামলাকে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে আলজাজিরা কর্তৃপক্ষ। আলজাজিরার ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডক্টর মোস্তফা সোয়াগ বলেছেন, ‘আলজাজিরা ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত আল জালা টাওয়ারে হামলা স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের আহ্বান তারা যেন ইসরাইলের এমন বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানায়। সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার জন্য তারা যেন ইসরাইলকে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসে।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর শনিবার প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের ফোনে কথা বলেছেন বাইডেন। ফোনালাপে গাজা থেকে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে হামাসের রকেট হামলা থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। যে গাজা উপত্যকায় ইসরাইল ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, যেখানে নারী ও শিশুসহ দেড় শতাধিক মানুষকে তারা হত্যা করেছে, ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে হাজার হাজার মানুষ, সেই গাজার শাসক দল হামাসের কোনো প্রতিনিধির সাথে কথা বলেননি বাইডেন। ফলে আব্বাসের সাথে তার ফোনালাপ কোনো কাজে আসবে না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এর আগে গত বুধবারও ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন বাইডেন।
হামাস বলছে, ফিলিস্তিনিদের বলপূর্বক তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের প্রতিবাদে ইসরাইলে রকেট হামলা চালিয়েছে তারা। তবে নিজ বাড়িঘর থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি বাইডেন। গাজায় ইসরাইলের নির্বিচারে বিমান হামলায় নারী, শিশুসহ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি নিয়েও কোনো কথা বলেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এসব উপেক্ষা করে ইসরাইলের ‘আত্মরক্ষা’র বয়ান হাজির করেছেন তিনি।
গাজায় হামাস নেতার বাড়িতে হামলা : রোববার ভোররাতে ইয়াহিয়া আল সিনওয়ারের বাড়িতে হামলা হয় বলে হামাস পরিচালিত টেলিভিশন স্টেশন জানিয়েছে। সিনওয়ার ২০১৭ সাল থেকে গাজায় হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এ হামলার জবাবে হামাসের যোদ্ধারা ইসরাইলের বাণিজ্যিক রাজধানী তেল আবিবের দিকে এক পশলা রকেট ছোড়ে। এ ছাড়া ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী ফিলিস্তিনি ছিটমহলটিতে গতকাল ইসরাইলি হামলায় অন্তত তিনজন নিহত ও বহু আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ছিটমহলটিজুড়ে রাতভর ব্যাপক বোমাবর্ষণের শব্দ পাওয়া গেছে। অন্য দিকে তেল আবিবের দিকে ছুটে আসা রকেটের জন্য বাজানো সাইরেনের শব্দে ইসরাইলিরা হুড়োহুড়ি করে ভূগর্ভের আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে ছুটতে শুরু করেন, এ সময় ১০ জনের মতো লোক আহত হন বলে চিকিৎসাকর্মীরা জানিয়েছেন। হামাস, ইসলামিক জিহাদ ও গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সোমবার থেকে শনিবার পর্যন্ত ইসরাইলের দিকে দুই হাজার ৩০০ রকেট ছুড়েছে বলে দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে। এর মধ্যে এক হাজারটি তারা বাধা দিয়ে ধ্বংস করেছে ও ৩৮০টি রকেট গাজার ভেতরেই পড়েছে বলে দাবি ইসরাইলি বাহিনীর। আর ফিলিস্তিনের ঘনবসতিপূর্ণ ছিটমহলটিতে তারা এক হাজারেরও বেশি বার বিমান হামলা চালিয়েছে ও গোলাবর্ষণ করেছে জানিয়ে হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবস্থান লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে। দেশে দেশে ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভ : ২০১৪ সালে গাজা যুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ ফিলিস্তিন-ইসরাইল সঙ্ঘাতে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানায়, ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদে দোহা, লন্ডন, প্যারিস, সিডনি, মেলবোর্ন ও মাদ্রিদসহ বিভিন্ন বড় শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে বিশাল বিক্ষোভ : লন্ডনে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে কয়েক হাজার লোক বিক্ষোভ মিছিল করেছে। বিক্ষোভকারীরা ‘ফিলিস্তিন মুক্ত করো’ স্লোগান দিয়ে মিছিল নিয়ে লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে ইসরাইলি দূতাবাসের সামনে হাজির হয়। শনিবারের এ প্রতিবাদের আয়োজকরা ‘ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরাইলের বর্বর সহিংসতা ও নিপীড়ন’ অনুমোদন করা বন্ধ করতে যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। যুক্তরাজ্যের ফিলিস্তিন সংহতি ক্যাম্পেইন, ফ্রেন্ডস অব আল আকসা, ফিলিস্তিন ফোরাম, স্টপ দ্য ওয়ার কোলিশ্যন ও ব্রিটেনে মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন নামের কয়েকটি সংগঠন মিলে এই প্রতিবাদের আয়োজন করে। আয়োজকদের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলে, ‘ইসরাইলের এই বর্বরতার বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য সরকারের এ মুহূর্তে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।’ তারা আরো বলেন, ইসরাইলের এই হামলা যুদ্ধাপরাধ, কারণ এতে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে আর তাদেরকে সামরিক, কূটনৈতিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে এই অপরাধে শামিল হচ্ছে যুক্তরাজ্য।’ ইরাক : ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে জড়ো হন। বিক্ষোভকারীরা ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে উপস্থিত হয়েছিলেন। বাগদাদ ছাড়াও দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ ব্যাবিলন, দাই কার, ডিওয়ানিয়েহ ও বসরাতেও সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কাতার : রাজধানী দোহাতে কয়েক হাজার মানুষ ফিলিস্তিনি পতাকা উড়িয়ে সংহতি জানান। শহরটিতে বসবাসরত এক ফিলিস্তিনি বলেন, আমাদের দেশে ইসরাইল কর্তৃক গণহত্যার বিরুদ্ধে আমি অবস্থান নিচ্ছি। দেশের স্বাধীনতার জন্য যা প্রয়োজন তা আমরা করব। ফিলিস্তিনে না থাকায় এখানে আমি জড়ো হয়েছি। আমি খুব ক্ষুব্ধ। ফ্রান্স : উত্তর প্যারিসের বার্বস এলাকায় কয়েক শ’ মানুষ জড়ো হয়ে ইসরাইলি হামলার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানান। ইহুদিবিদ্বেষের আশঙ্কায় সেখানে চার সহস্রাধিক পুলিশ মোতায়েন করেছিল কর্তৃপক্ষ। সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকায় পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জল কামান নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বিক্ষোভকারীরা আবর্জনার ঝুড়িতে আগুন লাগিয়ে এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। স্পেন : মাদ্রিদে প্রায় আড়াই হাজার তরুণ ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে সংহতি সমাবেশ ও মিছিল করেছেন। এ সময় তারা স্লোগান দেন, এটি যুদ্ধ নয়, এটি গণহত্যা। লেবানন : লেবানন-ইসরাইল সীমান্তে কয়েক শ’ লেবানিজ ও ফিলিস্তিনি জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। অনেকে সীমান্ত দেয়াল টপকানোর চেষ্টা করলে ইসরাইলি বাহিনী গুলি ছোড়ে। এতে এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। শনিবার কয়েকজন বিক্ষোভকারী পেট্রলবোমা ও পাথর ছুড়ে দেয়ালের ওপর দিয়ে। সীমান্তের ওদায়সেহ গ্রামের এই বিক্ষোভে হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর পতাকা নিয়েও অনেকে অংশগ্রহণ করেন। কাশ্মির : ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে ফিলিস্তিনের সমর্থকদের বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। পুলিশ অন্তত ২০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করেছে। শুক্রবার শ্রীনগরে জুমার নামাজের পর বেশ কয়েকজন মানুষ ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে রাজপথে মিছিল করেছেন। মিছিলে ফিলিস্তিনের পক্ষে ও ইসরাইলবিরোধী স্লোগান দেয়া হয়। জার্মানি : ফিলিস্তিনিদের একটি সংগঠনে ডাকে কয়েক হাজার মানুষ বার্লিন ও অন্যান্য শহরে বিক্ষোভ করেছেন। বিক্ষোভকারীরা ইসরাইলকে বয়কট করো স্লোগান দেন। কয়েকজন পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়েছেন। ফ্রাঙ্কফুর্ট, লেইপজিগ ও হ্যামবুর্গেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় পদযাত্রা : গাজায় হামলার প্রতিবাদে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে কয়েক হাজার এবং মেলবোর্নে কয়েক শ’ মানুষ পদযাত্রা করেছেন। শনিবার সিডনিতে মিছিল শুরুর আগে নগরীর টাউন হলের সামনে প্রতিবাদকারীরা জড়ো হয়ে ‘ফিলিস্তিন মুক্ত করো, মুক্ত করো’ এবং ‘গাজা মুক্ত করো’ বলে স্লোগান দেয়। সিডনিতে ওয়ালা আবু-ঈদ নামের একজন প্রতিবাদকারী রয়টার্সকে বলেন, “আমি একটি বিপ্লব দেখছি। আমি দেখছি ক্ষুব্ধ জনতা, যারা আর চুপ করে থাকবে না। নিপীড়ন ও সহিংসতায় উত্ত্যক্ত লোকজন এখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।” একই দিন মেলবোর্নে ভিক্টোরিয়া স্টেট লাইব্রেরির সামনে জড়ো হয়ে ‘ফিলিস্তিন মুক্ত করো’ লেখা পোস্টার হাতে পদযাত্রা করে পার্লামেন্ট হাউজের দিকে এগিয়ে যায় প্রতিবাদকারীরা। সৌদি আরবের নিন্দা : ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের অব্যাহত হামলার নিন্দা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সামরিক অভিযান বন্ধে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ। চলমান সহিংসতার সপ্তম দিনে ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) একটি জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠকের শুরুতে টেলিভিশনের ভাষণে কথা বলছিলেন। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরুসালেমের পবিত্র স্থানগুলোর পবিত্রতা লঙ্ঘন এবং ফিলিস্তিনিদের পূর্ব জেরুসালেমে তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করার নিন্দা করেন। তিনি এ ক্ষেত্রে বিপজ্জনক প্রবণতা বন্ধের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায়িত্ব পালন, সামরিক অভিযান বন্ধে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার এবং দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের ভিত্তিতে শান্তি আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। ঐক্যের এখনই সময়- তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী : ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি ও সঙ্কল্প দেখানোর সময় এসেছে এবং তুরস্ক এ জন্য যে কোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু। গতকাল ওআইসির এক বিশেষ বৈঠকে তিনি এ কথা বলেছেন। ফিলিস্তিনে ইসরাইলের হামলা নিয়ে আলোচনার সময় কাভুসোগলু বলেছিলেন যে ইসরাইল সংবাদমাধ্যমের সদস্যদেরও টার্গেট করেছে। এ ছাড়া যারা গাজায় প্রাণ হারিয়েছেন তাদের অর্ধেক নারী ও শিশু। কাভুসোগলু বলেন, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কর্তব্য রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে ওআইসিরও বড় দায়িত্ব রয়েছে।
আলজাজিরা, এপির কার্যালয় ধ্বংসে বিস্ময় : ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস ব্যবহার করত এ অভিযোগ তুলে গাজার একটি ১২ তলা ভবনকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইল। আল জালা নামের ওই ভবনেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও কাতারভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আলজাজিরার কার্যালয় ছিল। এ ছাড়াও আরো অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় এবং অ্যাপার্টমেন্ট ছিল। ভবনটির মালিক ভবনের সঙ্গে হামাসের সংশ্লিষ্টতা উড়িয়ে দিয়েছেন।
এপির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গ্যারি প্রুট ইসরাইলের এ হামলায় ‘স্তম্ভিত’ হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। ভবনটিতে এপির ডজনখানেক সাংবাদিক ও ফ্রিল্যান্সার থাকলেও হামলার আগে আগে তারা সেখান থেকে সরে যেতে সক্ষম হয় বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি। “আজ যা হলো, তার কারণে বিশ্ব এখন গাজায় কী হচ্ছে সে সম্পর্কে আরেকটু কম জানবে”- বলেছেন তিনি। আলজাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মোস্তাফা সোয়াগ আল জালা ভবনে হামলাকে ‘বর্বর’ অ্যাখ্যা দিয়ে এর জন্য ইসরাইলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন। “জঘন্য এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল গণমাধ্যমকে চুপ করিয়ে দেয়া এবং গাজার জনগণের অবর্ণনীয় কষ্ট ও হত্যাযজ্ঞকে আড়াল করা”- এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন। ইসরাইল যুদ্ধাপরাধ করছে-ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা : ফিলিস্তিনের গাজা উপকূলে ইসরাইল যুদ্ধাপরাধ করছে বলে অভিযোগ করেছে ইহুদি অধ্যুষিত রাষ্ট্রটির একটি মানবাধিকার সংস্থা। শনিবার এক বিবৃতিতে তারা এ অভিযোগ জানায়। ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা বিসলেম বলেছে, গাজায় ইসরাইল যুদ্ধাপরাধ করছে। একই সাথে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এর বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও হতাহত হওয়ার আগে ইসরাইলকে তাদের নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে। চলমান সহিংসতার কথা উল্লেখ করে সেখানে আরো বলা হয়, ২০১৪ সালের পর গাজা উপকূলে এত ভয়াবহ রকমের ধ্বংসযজ্ঞ আর চালায়নি ইসরাইল। ১৪ বছর ধরে ইসরাইলি অবরোধ আরোপের কারণে অঞ্চলটির ২০ লাখ বাসিন্দা মানবিক সঙ্কটের সম্মুখীন হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ চীনের : ইসরাইলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা করেছে চীন। দীর্ঘ কয়েক দশকজুড়ে চলা এই সমস্যা নিরসনে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদকে আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। এত দিন পর্যন্ত জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ যে এই সঙ্কট সমাধান করতে পারেনি, তার দায়ও যুক্তরাষ্ট্রের বলে মনে করে চীন। গতকাল রোববার চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা সিনহুয়াকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, ‘ওই অঞ্চলে যে সঙ্কট চলছে, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে অনেক আগেই তা সমাধান করতে পারত নিরাপত্তা পরিষদ। দুঃখজনক হলেও সত্য, তা এখনো করা যায়নি, আর এর প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।’ ‘চীন মনে করে, সেখানকার পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়া বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই নিরাপত্তা পরিষদের উদ্যোগী হওয়া উচিত।’
হোয়াইট হাউজের নৈশভোজ বর্জন : পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে হোয়াইট হাউজের নৈশভোজ বর্জন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম নেতাদের একাংশ। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের হামলার প্রতি সমর্থন জানিয়ে হোয়াইট হাউজ থেকে একটি টুইটবার্তা প্রকাশের পরই এ আহ্বান জানান তারা। ইসরাইলের পক্ষ নেয়ায় হোয়াইট হাউজে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ঈদ নৈশভোজ বর্জনের এই ডাক দেন যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম নেতাদের একটি সংগঠন। গত শনিবার ‘আমেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইন’ নামে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি মুসলিম সংগঠনের পক্ষ থেকে (অ্যাডভোকেসি গ্রুপ) এই আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ‘প্যালেস্টাইনের সাথে ঈদ’ (ঈদ উইথ প্যালেস্টাইন) নামে একটি প্রতিবাদী সেøাগানও নির্ধারণ করেছেন তারা। এই টুইট প্রকাশের কিছু সময় পর একটি বিবৃতি দেয়া হয় আমেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইনের পক্ষ থেকে।