চুয়াডাঙ্গা বুধবার , ৭ ডিসেম্বর ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

গাংনীতে দেরিতে বিতরণ ও ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

কৃষি প্রণোদনা পেয়েও কাজে আসছে না কৃষকদের
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
ডিসেম্বর ৭, ২০২২ ৯:১৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

Girl in a jacket

প্রতিবেদক, মেহেরপুর:
খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে উন্নত জাতের ফসল আবাদের লক্ষ্যে সরকার কৃষকদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফসলের বীজ ও সার প্রণোদনা দিলেও তা কাজে আসছে না কৃষকদের। মৌসুমের শুরুতে প্রণোদনা দেওয়ার কথা থাকলেও ফসল আবাদের অন্তত মাসখানেক পর প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে চাষীদের। অপরদিকে ৯টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের স্বজনপ্রীতির কারণেও প্রকৃত চাষীদের বঞ্চিত করে চাষী নয়, এমন মানুষদের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। ফলে ওই প্রণোদনার বীজ ও সারের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে কালোবাজারে। এতে সরকারের মোটা অংকের টাকা খরচ হলেও মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তবে কৃষি অফিস বলছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কৃষক নির্বাচনের পত্র দেরিতে আসায় প্রণোদনা বিতরণে বিলম্ব হয়েছে।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে, উপজেলায় ২ হাজার ৪০০ জন চাষীকে গম, ১ হাজার জনকে ভুট্টা, ৫ হাজার ৫ শ জনকে সরিষা, ৭৬০ জনকে কলাই বীজ, ১ শ জনকে মুগ, ২৫০ জনকে মসূর ও ৫০ জনকে পেঁয়াজ বীজ ও সার প্রদান করা হয়। মাসখানেক আগে কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর বিভিন্ন ইউনিয়নে কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি অফিসার সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের অবহিত করে কৃষি অফিস। জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকার প্রকৃত চাষী ছাড়াও চাষী নন, এমন লোকজনদের তালিকাভুক্ত করেন। এদের মধ্যে অনেকেই নিকটাত্মীয় ও রাজনৈতিক আস্থাভাজন রয়েছে। একদিকে জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে কৃষকদের নামের তালিকা প্রাপ্তি অন্যদিকে দেরিতে বীজ সরবরাহের কারণে সঠিক সময়ে কৃষকদের হাতে তা পৌঁছায়নি। বাধ্য হয়ে চাষীরা নিজে বাজার থেকে বীজ ক্রয় করে তা বপন করেছেন খেতে। বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে নতুন নতুন জাতের ফসল আবাদের।
চাষীরা জানান, এভাবে প্রণোদনা না দিয়ে এই অর্থ যদি সারের ওপর ভর্তূকি বাড়ানো হয়, তাহলে সকল চাষী উপকৃত হবেন। এদিকে জনপ্রতিনিধিদের স্বজনপ্রীতির কারণে অনেকে সার ও বীজ সহায়তা পেয়েছেন। যাদের অনেকেই চাষের সাথে সম্পৃক্ত না। আবার অনেকেই আছেন, যারা নিজেরা কখনো চাষ করেন না। এমন মানুষগুলো প্রণোদনার সার ও বীজ উত্তোলন করে কালো বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। আবার সময় মতো ডাল জাতীয় ফসলের বীজ হাতে না পেয়ে চাষীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কৃষি অফিস থেকে যখন বীজ প্রদান করা হয়েছে, তখন ডাল জাতীয় ফসলের বীজ বপনের সময় পেরিয়ে গেছে। তাই অনেকেই সেই ডাল জাতীয় বীজ ডাল হিসেবে খাচ্ছেন।
কাজীপুর গ্রামের চাষী আব্দুল মালেকসহ কয়েকজন গম চাষী জানান, তারা ১৫ দিন আগে গম বপন করেছেন। কিন্তু গমবীজ প্রণোদনা পেয়েছেন মাত্র তিনদিন আগে। কলাই চাষী কামারখালী গ্রামের আবুল হোসেনসহ কয়েকজন জানান, কলাই ও সরিষা আবাদ করা হয়েছে মাসখানেক আগে। অথচ সপ্তাহ খানেক আগে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। সার কাজে আসলেও বীজ কোনো কাজেই আসবে না। শুধু এ মৌসুম নয়, প্রতিবছরই এভাবে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। ফলে সরকারের সদিচ্ছা এখানে উপেক্ষিত। অন্যদিকে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে।
একটি সূত্র জানায়, প্রণোদনা দেওয়ার সময় সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা ঘটা করেই বিতরণ শুরু করেন। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে বীজ না দিয়ে কেন মাঝামাঝি সময়ে বীজ প্রদান করা হচ্ছে, তা কেউ জানতে চান না। অপর একটি সূত্র জানায়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা প্রণোদনার বিষয়ে যাদের নামের তালিকা দেন, তাদের অনেকেই প্রকৃত চাষী নন এবং বিত্তশালী। দলীয় ছাড়াও অনুগতদের মন রক্ষার্থে এই প্রণোদনা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তবে জনপ্রতিনিধিরা বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদে চাষীদের নামের তালিকা রয়েছে। কে কোন ফসল চাষ করতে চান, সে অনুযায়ী নামের তালিকা প্রদান করা হয়। অপর একটি সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণের অনেকেই ভুয়া চাষীদের নাম দিয়ে সার ও বীজ আত্মসাৎ করেন। এমন অভিযোগের সত্যতা মিলেছে সাহারবাটি ইউপির জোড়পুকুরিয়া গ্রামের সাহাব মেম্বারের বিরুদ্ধে। তিনি চাষীদের নামের সার উত্তোলন করে নিজেই আত্মসাৎ করেন। তবে বিষয়টি স্বীকার করেছে কৃষি অফিস। তবে সাহাব মেম্বার অস্বীকার করে বলেছেন, কোনো অনিয়ম করা হয়নি।
ধানখোলা ইউপির কয়েকজন চাষী জানান, চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক তাঁর নিজ গ্রাম চিৎলার চাষীদের প্রণোদনায় নাম দিয়েছেন। অন্য গ্রামের চাষীরা এখানে উপেক্ষিত। বিশেষ করে মসুরি চাষীদের নাম দিয়েছেন নিজ অনুগত ও স্বজনদের নামে। এতে অন্যান্য চাষীরা ফুঁসে উঠেছেন। অনেকেই অভিযোগ নিয়ে এসেছেন কৃষি অফিসে। তবে এ বিষয়ে চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক জানান, মাত্র ২০ জন চাষীকে মসুরি প্রণোদনা দেয়ার কথা। তাই মেম্বারদের মাধ্যমে তালিকা অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে। স্বজনপ্রীতি বা নিজ গ্রামের কৃষকদের নামের তালিকার বিষয়টি সঠিক নয়।
গাংনী উপজেলা কৃষি অফিসার লাভলী খাতুন জানান, প্রণোদনা দেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে অফিস পর্যন্ত চিঠি আসতে কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। এতে একটু দেরি হয়। সেই সাথে বীজ আসতেও দেরি হয়েছে। তাছাড়া এ অঞ্চলের চাষীরা সবসময় আগাম আবাদে অভ্যস্ত, তাই তারা আগেভাগেই বীজ কিনে চাষ শুরু করেন। তিনি আরও জানান, চলতি মৌসুমে কলাই, মুগ, মসুরি ও সরিষা বীজ বিতরণে একটু দেরি হয়েছে। অন্যান্য ফসলে কোনো সমস্যা হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।

Girl in a jacket

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।