চুয়াডাঙ্গা রবিবার , ১৫ মে ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

গম রফতানি নিষিদ্ধ করল ভারত প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়ে

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
মে ১৫, ২০২২ ২:৫৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

দেশীয় বাজারে দাম কমানোর লক্ষ্যে গম রফতানি নিষিদ্ধ করেছে ভারত। গত শুক্রবার ভারত সরকার জানিয়েছে, ইতোমধ্যে যেসব এলসি ইস্যু করা হয়েছে, সেগুলোই শুধু রফতানি করতে দেয়া হবে। শুক্রবার ঘোষণার সাথে সাথে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে এ নিষেধাজ্ঞা। এতে বিশ্বজুড়ে গম সরবরাহে প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের জন্য আশার কথা, নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী ও খাদ্য সঙ্কটের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে গম রফতানি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। এনডিটিভি ও হিন্দুস্তান টাইমস।
ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেডের (ডিজিএফটি) জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভারত সরকার দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত এবং প্রতিবেশী ও অন্যান্য অরক্ষিত দেশগুলোর চাহিদাকে সমর্থনের জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, যেসব রফতানি চালানের লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) বিজ্ঞপ্তির আগে ইস্যু করা হয়েছে, সেগুলো যেতে দেয়া হবে। এ ছাড়া সরকারি অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে অন্য দেশেও গম রফতানির অনুমতি দেয়া হবে। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গম উৎপাদক হলেও বৈশ্বিক রফতানিতে তাদের অংশ মাত্র এক শতাংশের মতো। পরিমাণ ও মূল্য উভয় দিক থেকে ভারতীয় গমের সবচেয়ে বড় ক্রেতা বাংলাদেশ।
২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতের মোট গম রফতানির ৫৪ শতাংশই এসেছে বাংলাদেশে। ওই বছর ভারতীয় গমের শীর্ষ ১০ ক্রেতা ছিল বাংলাদেশ, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, শ্রীলঙ্কা, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, কাতার, ইন্দোনেশিয়া, ওমান ও মালয়েশিয়া। বিশ্বের মোট গম রফতানির ২৯ শতাংশই সরবরাহ করে রাশিয়া ও ইউক্রেন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক ভোগ্যপণ্যের বাজারে রীতিমতো আগুন লেগেছে। হু হু করে দাম বেড়েছে গমেরও। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের রফতানি বন্ধ আর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার কারণে সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী ভারতীয় গমের চাহিদা বেড়েছে। ভারতের গম রফতানিকারকরা জানিয়েছেন, রাশিয়া-ইউক্রেনের বিকল্প হিসেবে অনেক ক্রেতাই তাদের সাথে যোগাযোগ করছেন। এ অবস্থায় বৈশ্বিক চাহিদা ও মূল্যের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনায় এ বছর রেকর্ড পরিমাণ গম রফতানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল ভারত। ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশটি রেকর্ড ৬৫ লাখ টন গম রফতানি করেছিল। তবে চলতি অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই সেই সীমা পার হয়ে গেছে তারা। কিন্তু স্থানীয় বাজারে গমের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় শেষপর্যন্ত রফতানি নিষিদ্ধ করল ভারত সরকার। আরেক পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে পেঁয়াজ বীজ রফতানির শর্ত শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে ডিজিএফটি। এত দিন ভারতে পেঁয়াজ বীজ রফতানি নিষিদ্ধ ছিল। ভারতে গত মার্চের তীব্র তাপপ্রবাহ ফসল উৎপাদনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এরই মাঝে দেশে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে গম উৎপাদন। এ ছাড়া এপ্রিলে দেশটির মুদ্রাস্ফীতি ৭.৭৯ শতাংশে উঠে যায়। এসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলে ভারতের।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের ফেলে আসা শূন্যস্থান পূরণের লক্ষ্যে ভারত ‘গম কূটনীতি’ শুরু করেছিল। চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ গম উৎপাদক দেশ ভারত। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে কৃষ্ণ সাগর এলাকা দিয়ে গম রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে বিশ্বের ক্রেতারা ভারতের গমের প্রতি আরো বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে গোটা বিশ্বে গমের চাহিদা বেড়েছে। মূলত রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুই গম রফতানিকারক দেশ। তবে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বহু দেশ। আবার ইউক্রেনে যুদ্ধ চলায় গম রফতানি করতে পারছে না সেই দেশ। এই অবস্থাকে সামনে রেখে ভারত শূন্যস্থান পূরণের লক্ষ্যে নেমেছিল। ২০২২-২৩ সালে রেকর্ড ১০ মিলিয়ন টন গম রফতানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল দেশটি। গম রফতানি বাড়ানোর চেষ্টায় কেন্দ্রীয় সরকার মরক্কো, তিউনিসিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, আলজেরিয়া এবং লেবাননে একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদল পাঠাবে বলে জানিয়েছিল গত বৃহস্পতিবারই। তবে আপাতত ‘গম কূটনীতি’ জারি থাকলেও রফতানি বন্ধ থাকছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, প্রায় ৮০ কোটি ভারতীয়র ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য বিতরণের জন্য সরকারের ন্যূনতম ৩০.৫ মিলিয়ন টন গম প্রয়োজন। তার পাশাপাশি অন্যান্য কল্যাণ প্রকল্পের জন্য গম লাগবে কেন্দ্রের। এই পরিস্থিতিতে গম রফতানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। আপাতত দেশের চাহিদা মেটানোই মূল লক্ষ্য বলে জানাচ্ছে ভারত। এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘হতাশাজনক’ বলছেন একটি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের মুম্বাইভিত্তিক ডিলার। তিনি রয়টার্সকে বলেন, “আমরা আরো দুই থেকে তিন মাস পরে রফতানি বন্ধে সিদ্ধান্তটি আশা করেছিলাম; কিন্তু মূল্যস্ফীতির অঙ্ক সরকারের মনোভাব পরিবর্তন করেছে বলে মনে হচ্ছে।” খাদ্যের ক্রমবর্ধমান দাম এপ্রিলে ভারতের মূল্যস্ফীতি গত আট বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলেছে। বাজারে লাগাম টানতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার বাড়ানোর চাপও তৈরি করেছে। বড় রফতানিকারক দেশ ভারত ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭০ লাখ টন গম রফতানি করে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাস এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশটি রেকর্ড ১৪ লাখ টন গম রফতানি করেছে এবং মে মাসে প্রায় ১৫ লাখ টন রফতানির চুক্তিও করে ফেলে। তবে এখন ভারতেই গমের দাম চড়া। সরকার নির্ধারিত ২০ হাজার ১৫০ রুপির বিপরীতে স্পট মার্কেটে প্রতি টন গমের দর সর্বোচ্চ ২৫ হাজার রুপিতে উঠেছে। অথচ এপ্রিল থেকে শুরু অর্থবছরের জন্য ভারত রেকর্ড রফতানি লক্ষ্যমাত্রার রূপরেখা নিয়েছিল এবং তা বাড়ানোর উপায় খুঁজতে মরক্কো, তিউনিসিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপিন্সের মতো কিছু দেশে বাণিজ্য প্রতিনিধি পাঠনোরও সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু মার্চের মাঝামাঝি থেকে তাপদাহ শুরুর পর পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। গমের উৎপাদন এবার ১০ কোটি টনের আশপাশে নেমে আসতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মুম্বাইয়ের ওই ডিলার বলেন, “সরকারি ক্রয় ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে। স্পট মার্কেটে গত বছরের চেয়ে সরবরাহও কমেছে। এসব কিছু কম ফসল পাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।” আরেক ডিলার বলেন, “ভারতের গম রফতানির এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়ে। কারণ এই মুহূর্তে বাজারে আর বড় সরবরাহকারী নেই”।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।