গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সংলাপ : সকল দলের অংশগ্রহণ, না ভোট, প্রবাসীদের ভোটাধিকার এবং সেনা মোতায়েনের পরামর্শ

386

সমীকরণ ডেস্ক: অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। পাশাপাশি সকলের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনী আইন সংস্কারসহ নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। বলেছেন, নির্বাচনে শৃঙ্খলা রক্ষায় নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ নিতে হবে। কমিশনকে পূর্ণশক্তি প্রয়োগ  করতে হবে। প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। গতকাল বুধবার গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপের প্রথম দিনে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকসহ বিশিষ্ট সাংবাদিকরা অংশ নেন। তারা নির্বাচনী আইন সংস্কার, নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন, প্রবাসীসহ সকল ভোটারের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ, কালো টাকা ও পেশি শক্তির ব্যবহার রোধ, সেনাবাহিনী মোতায়েনসহ নানা বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে পরামর্শ দেন। নির্বাচন ভবনের সম্মেলন কক্ষে বুধবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে সংলাপ শুরু হয়ে চলে বেলা দেড়টা পর্যন্ত। আজ ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম ও অনলাইন মিডিয়ার প্রতিনিধিরা ইসির সংলাপে অংশ নেবেন।
গতকাল সংলাপ শেষে সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদকেরা বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব অনেক বেশি। নির্বাচন কমিশনকে দৃঢ়তা দেখাতে হবে। নৈতিক অবস্থানে থাকতে হবে। এবং জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। এই সকল ক্ষেত্রে যারা মূল অংশীদার রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বড় দুটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, জানতে হবে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কি না। আমরা বোঝাতে চেয়েছি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে সরকার যদি সচেতন হয়, কমিটমেন্ট থাকে, নির্বাচন কমিশন যদি সক্রিয় হয় এবং বড় দুটি রাজনৈতিক দল যদি কমিটেড হয় তবেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।
গণমাধ্যমের প্রসঙ্গে তারা বলেন, যে সমস্ত কালো আইন মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে ৫৭ ধারাসহ এবং সম্প্রচার নীতিমালা সেটা বাতিল করতে হবে। যেসব মিডিয়া বন্ধ আছে সেসব মিডিয়া খুলে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, সরকারি দল বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ভোগ করে জনমনে একটা প্রভাব সৃষ্টি করতে পারছে। নির্বাচন যেন প্রভাবিত করা যায় সে বিষয়ে চেষ্টা করছে। সেটার ব্যাপারেও নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। যদি সম্ভব হয় নির্বাচনের আগে থেকে শেষ পর্যন্ত হয়রানিমূলক মামলা বন্ধ রাখতে হবে।
সিনিয়র সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর বলেন, এখন থেকেই সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ইভিএম নিয়ে সব দলের সঙ্গে আলোচনার পর সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বিএনপির নাম উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে ওই দলটির অনেক নেতার নামে মামলা রয়েছে। ওই মামলার সূত্র ধরে নির্বাচনের সময় তাদের যেন হয়রানির শিকার হতে না হয়, তার জন্য নির্বাচনকালে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের মামলার হয়রানি থেকে রেহাই দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি সেনা মোতায়েনের পক্ষে মত দেন।
সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ নজর দেওয়ার দাবি জানিয়ে ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, এ নির্বাচনের দিকে সবাই তাকিয়ে রয়েছে। সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নিরপেক্ষতা বজায় রেখে ইসির স্বাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। এমন আচরণ করতে হবে যাতে জনগণের আস্থা তৈরি হয়। আস্থা অর্জনে প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে।
প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী কোনো দল যাতে নিবন্ধন না পায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জামায়াত যাতে অন্য কোনো নামে বা অন্য কোনো ফরম্যাটে ভোট করতে না পারে সে বিষয়ে আইনি উদ্যোগ নিতে হবে।
বিএফইউজে’র একাংশের মহাসচিব এম আবদুল্লাহ তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের পন্থা বের করতে হবে। দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে কেবল গ্রহণযোগ্য একটি জাতীয় নির্বাচন সম্ভব।
পরে নির্বাচন কমিশনের ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে সংলাপের সারাংশ সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন। সচিব বলেন, দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিকরা সকলের অংশগ্রহণমূলক আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন প্রত্যাশা করেন। নির্বাচন কমিশনের আইনের সঠিক প্রয়োগের বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করেছেন। সেনাবাহিনী নিয়োগের পক্ষে এবং বিপক্ষে সবাই মতামত ব্যক্ত করেছেন কেউ বলেছেন সেনাবাহিনী মোতায়েন করলে ভালো হয়। কেউ বলেছেন প্রয়োজন নেই। ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা রাখা না রাখার সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করেছেন। ‘না’ ভোট রাখলে কী সুবিধা হয় না রাখলে কি সুবিধা হয় দু’পক্ষই মতামত দিয়েছেন। সচিব আরও বলেন, এ নির্বাচনে অতিরিক্ত টাকার ব্যবহার ও পেশিশক্তির ব্যবহার যেন না হতে পারে এ বিষয়ে তারা পরামর্শ প্রদান করেছেন। আরেকটি প্রস্তাব এসেছে অনলাইনে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা। নির্বাচনের পূর্বে সকল দল যাতে সুন্দরভাবে অংশগ্রহণ করতে যারে সেজন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য প্রস্তাব এসেছে।
সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অধিকাংশের মতেই ছিল সেনাবাহিনী যদি প্রয়োজন হয় তারা (ইসি) মোতায়েন করবে, যদি প্রয়োজন না হয় তারা দেশের পরিবেশ পরিস্থিতির ওপরে নির্ভর করে তখন ঠিক করা হবে।
রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ ও নির্বাচনী প্রচারণার বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের কাছে যদি কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করে বিষয়টা আমরা তলিয়ে দেখব। এখন পর্যন্ত সংলাপ ফলপ্রসূ হবে কি না, নির্বাচন কমিশন মনে করে সংলাপ করা দরকার। সংলাপ করলে বিষয়গুলো পরিষ্কার হবে। মতামত শোনার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। আশা করি সকলের অংশগ্রহণের নির্বাচন সুষ্ঠু হবে।
সংলাপে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, কবিতা খানম, রফিকুল ইসলাম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন, নির্বাচন কমিশনের ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ এবং ইসি সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবির, যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত, কালের কণ্ঠ নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল, মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, আমাদের অর্থনীতি সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ শফিকুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন, বিএফইউজের একাংশের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, মহাসচিব ওমর ফারুক, বিএফইউজের অপর অংশের মহাসচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ, আনিসুল হক, আমানুল্লাহ কবীর, সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা, কলাম লেখক বিভুরঞ্জন সরকার, মাহবুব কামাল, সোহরাব হাসান, যায়যায়দিনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কাজী রুকুনউদ্দীন আহমেদ, সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান, সাংবাদিক কাজী সিরাজ, আনিস আলমগীর।
এদিকে আজ ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা ইসির সঙ্গে সংলাপ করবেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গৃহীত কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ করছে নির্বাচন কমিশন। গত ৩১শে জুলাই সুশীল সমাজের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে এ কর্মপরিকল্পনার যাত্রা শুরু হয়। ২০১৯ সালের ২৮শে জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০১৮ সালের ৩০শে অক্টোবরের পর থেকে শুরু হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় গণনা।