খুনের পরিকল্পনায় মিন্নিও!

327

সমীকরণ প্রতিবেদন:
নতুন মোড় নিয়েছে বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলা তদন্ত। হত্যাকা-ে নিহতের স্ত্রী ও মামলার প্রধান সাক্ষী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সরাসরি জড়িত থাকার তথ্য প্রমাণ হাতে পেয়েছে পুলিশ। এমনকি মামলার ১২ নম্বর আসামি টিকটক হৃদয় ১০ দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে মিন্নির নাম জানিয়েছে। হত্যাকা-ের মূল নায়ক নয়ন বন্ডের সঙ্গে বিয়ের কথা গোপন রেখে রিফাত শরীফকে বিয়ের পরও নয়নের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ ছিল মিন্নির। এমনকি শারীরিক সম্পর্কও ছিল। রিফাত বিষয়টি জানতে পেরে মিন্নিকে নয়নের সঙ্গ ছাড়তে চাপ দিলে হত্যার ক্ষেত্র তৈরি হয়। এ জন্য মিন্নি তার পুরানো প্রেমিক নয়ন ও তার বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করেন। নয়নের সঙ্গে মিন্নির অবৈধ সম্পর্কের পথের কাঁটা সরাতেই খুন নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরীফকে। পুলিশের হাতে আসা মিন্নির মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও কল রেকর্ডে রয়েছে পরিকল্পনার প্রমাণ, যা গতকাল বুধবার আদালত উপস্থাপন করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকতা। শুনানি শেষে আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
বরগুনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মিন্নিকে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। পরে শুনানি শেষে মিন্নির পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক। রিমান্ড আবেদনে মিন্নির সঙ্গে রিফাতের ঘাতকদের ফোন কললিস্ট দাখিল করে পুলিশ। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মিন্নি নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও আসামিদের সঙ্গে তার কেন যোগাযোগ ছিল আদালতের এমন প্রশ্নে নীরব থাকেন তিনি। এ বিষয়ে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন জানান, মঙ্গলবার দিনভর জিজ্ঞাসাবাদে রিফাত হত্যায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মিন্নিকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নেয়া হয়। বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. শাহজাজান হোসেন বলেন, মিন্নি এ মামলার ১ নম্ব^র সাক্ষী হলেও জিজ্ঞাসাবাদে রিফাত হত্যাকা-ের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। তাই অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে হাজির করে মিন্নির সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে মিন্নির পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিফাত হত্যাকা-ের বিষয়ে মিন্নির কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে, এ জন্য তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বরগুনা সদর থানার ওসি (তদন্ত) হুমায়ুন কবীর জানান, সাক্ষী মিন্নি এখন আসামি। হত্যা পরিকল্পনায় তার জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। মামলার তদন্তে এবং একাধিক তথ্যের সূত্রে তাকে আটকের পর ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। এদিকে আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, মিন্নি মানসিকভাবে অসুস্থ। এটা জানিয়েই আদালতে মিন্নির জামিন আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু জামিন নামঞ্জুর করে তার রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। পুলিশ জানায়, মামলার ১২ নম্বর আসামি টিকটক হৃদয়কে ৩ জুলাই প্রথমবারের মতো ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। ১০ জুলাই পুনরায় তাকে আদালতে হাজির করে আরো ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। বিচারক পুনরায় তার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। দুই দফায় ১৭ দিন রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ড শেষে ১৪ জুলাই বরগুনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। যাতে হত্যার পরিকল্পনার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে মিন্নির নাম উল্লেখ রয়েছে। পরিকল্পনার কারণ হিসেবে নয়ন বন্ডের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে রিফাত বারবার চাপ সৃষ্টি করেন বলে দাবি করা হয়েছে। হত্যার দিন নয়ন ও তার সঙ্গীদের সেখানে উপস্থিত থাকা এবং রিফাতকে ডেকে ওই স্থানে নিয়ে যাওয়া- সবই ছিল মিন্নির পরিকল্পনার অংশ। এ ছাড়া ঘাতকদের ঠেকাতে গিয়েও মিন্নি আক্রান্ত হবেন না এবং ঘটনার পর নয়নসহ অন্যদের রক্ষায় তার ভূমিকা থাকবে, এর সবই ছিল মিন্নির পরিকল্পনার অংশ, যা রিমান্ড আবেদনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া নয়নের সঙ্গে বিয়ের কথা গোপন রেখে রিফাতকে বিয়ে এবং বিয়ের পর পূর্বের সম্পর্কে বাধা পাওয়া খুনের কারণে বলে পুলিশ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। মিন্নির মোবাইল ফোনের কললিস্ট, কল রেকর্ড ও ম্যাসেঞ্জারে এর প্রমাণ রয়েছে বলে পুলিশ দাবি করছে। নয়ন ও মিন্নির দুই মিনিট ২৪ সেকেন্ডের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটি ভিডিওতে রয়েছে রিফাতের অগোচরে তাদের অবৈধ সম্পর্কের প্রমাণ, যা তদন্ত সংশ্লিষ্টদের হাতে রয়েছে।
প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বরগুনার মাইঠা এলাকার বাবার বাসা থেকে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরসহ মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তার বক্তব্য রেকর্ড করতে বরগুনার পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ ও পুলিশের কৌশলী এবং বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আটকে যান মিন্নি। বেরিয়ে আসে হত্যাকা-ে তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ। এরপর রাতে মিন্নিকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। এ নিয়ে ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। ১০ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৬ জুন সকালে স্ত্রী আয়েশাকে বরগুনা সরকারি কলেজ থেকে আনতে যান রিফাত শরীফ। এ সময় কলেজের মূল ফটকের সামনে থেকে ধরে নিয়ে কোপানো হয় তাকে। স্থানীয় লোকজন রিফাতকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে ওই দিন দুপুরে রিফাত শরীফের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম বাদী হয়ে ২৭ জুন বরগুনা থানায় ১২ জনের নামে একটি হত্যা মামলা করেন। এই মামলার প্রধান আসামি ছিল সাব্বির আহমেদ ওরফে নয়ন বন্ড। পরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় নয়ন। ১৪ জুলাই টিকটক হৃদয় ও রাতুল সিকদার, ১ জুলাই মামলার এজাহারভুক্ত ১১ নম্ব^র আসামি অলি ও তানভীর, ৪ জুলাই রাতে মামলার ৪ নম্বর আসামি চন্দন ও ৯ নম্ব^র আসামি মো. হাসান, ৫ জুলাই রাতে মো. সাগর ও নাজমুল হাসান, ১০ জুলাই রাতে রাফিউল ইসলাম রাব্বী- রিফাত শরীফ হত্যাকা-ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। মামলার ৬ নম্ব^র আসামি আকন সাত দিনের, সন্দেহভাজন অভিযুক্ত আরিয়ান শ্রাবণকে দ্বিতীয় দফায় পাঁচ দিনের ও সাইমুনকে চতুর্থ দফায় তিন দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। মামলার দ্বিতীয় আসামি রিফাত ফরাজির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হত্যাকা-ে ব্যবহৃত রামদা উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে প্রধান আসামি নয়ন বন্ড। রিফাত ফরাজীর ছোট ভাই ও হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ৩ নম্বর আসামি রিশান ফরাজী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।