খাল কেটে কুমির!

322

রানা প্লাজা ধসের পর গার্মেন্ট শিল্প ও শ্রমিকদের কল্যাণ বিবেচনায় বিদেশি ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সকে দেশে আনা হয়েছিল; কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কল্যাণ তো দূরের কথা, উল্টো খাল কেটে কুমির নিয়ে এসেছি আমরা। এটা সত্য, কিছু অসাধু শিল্প মালিকের অতি মুনাফালোভের কারণে রানা প্লাজার মতো দুর্ঘটনা ঘটে। তবে শিল্পটির বেশিরভাগ মালিকের সৎ বিবেচনা ও শ্রমিক কল্যাণে মনোযোগের কারণে কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সকে দেশে আনা হয়। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে, নানা সমস্যায় জর্জরিত গার্মেন্ট শিল্পের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে গেছে সংগঠন দুটি।
জানা যায়, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও সংস্কারের নামে গার্মেন্ট মালিকদের ওপর অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দিচ্ছে অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স। শুধু তা-ই নয়, নির্দিষ্ট দেশ-কোম্পানি থেকে সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি উচ্চ বেতনে নিজেদের প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে কাজ করানোর শর্ত দেয়া হচ্ছে তাদের পক্ষ থেকে। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে গার্মেন্ট মালিকরা নিঃস্ব হলেও তাতে কোনো মনোযোগ দেয়া হচ্ছে না। কেবল নারায়ণগঞ্জের একটি ঘটনা থেকেই অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের ‘শুভংকরের ফাঁকি’ বোঝা যায়। এক মালিকের চারটি কারখানা টেকসই ও আধুনিক স্থাপত্যরীতিতে তৈরি হলেও সেখানে অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ত্রুটি দূর করার জন্য সংস্কারের পরামর্শ দেয় অ্যাকর্ড। ক্রেতা হারানোর ভয়ে মালিক রাজি হলে চারটি ভবনের জন্য জনপ্রতি এক লাখ আটষট্টি হাজার টাকা বেতনে তাদের চারজন প্রকৌশলী নেয়ার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। অথচ এজন্য যে একজন প্রকৌশলীই যথেষ্ট, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
উদ্বেগের বিষয়, এভাবে খবরদারি করে মালিকদের লাখ লাখ টাকা খরচ করানোর পরও খোঁড়া অজুহাতে চুক্তি বাতিল করে ক্রেতা সরিয়ে নিচ্ছে, নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স। ফলে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও আশপাশের এলাকার ১ হাজার ২৩১টি গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো টিকে আছে, নেতিবাচক প্রচারণার কারণে তাদেরও প্রত্যাশিত দামের কমে পোশাক সরবরাহ করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স জোটের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। তাদের হস্তক্ষেপ উদ্দেশ্যমূলক, হয়রানিমূলক, ব্যয়বহুল ও মূল লক্ষ্যচ্যুত হয়ে পড়েছে। আমাদের গার্মেন্ট মালিকরা যেন আয় পকেটে তুলে আরও সক্ষমতা অর্জনের পরিবর্তে কারখানাতে বিনিয়োগেই নিঃস্ব হয়ে পড়েন, এমন একটা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের কর্মকা-ে।
গার্মেন্ট শিল্পে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র নতুন নয়। তৈরি পোশাক শিল্প রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ৫০ বিলিয়ন ডলার করার পর এ ষড়যন্ত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে বাণিজ্যমন্ত্রী যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তা যথার্থ। অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে এরই মধ্যে অনেক বিদেশি ক্রেতা বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য বাজারে চলে গেছে। মনে রাখতে হবে, আমাদের পোশাক শিল্প মালিক-শ্রমিকদের শ্রমে-ঘামে গড়ে উঠেছে, কারও দয়ায় নয়। তাই ক্রেতা জোটের অযাচিত হস্তক্ষেপের কাছে আত্মসমর্পণের অবকাশ নেই। সংস্কারের নামে তাদের কোনো অন্যায় আবদার মেনে নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সকে বিদায় নিতেই হবে। অন্যথায় সম্ভাবনাময় এ শিল্প রুগ্ন হতে বেশিদিন লাগবে না।