চুয়াডাঙ্গা সোমবার , ২৫ জুলাই ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

খরচ কমানোর নির্দেশেও কমছে না ‘বিলাসিতা’

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জুলাই ২৫, ২০২২ ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন: দেশের অর্থনীতিকে চাপ থেকে উদ্ধারের জন্য সরকার খরচ কমানোর নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সর্বশেষ আরো আট ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্ত এই নির্দেশনা কতটা কাজে আসছে? বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন যা করা হচ্ছে তা আর্থিক ভিত্তিতে। তাই কিছুটা ফল আসলেও খুব বেশি কাজে আসবে না। কারণ যথাযথ মনিটরিং পদ্ধতি নেই। অন্যদিকে রিজার্ভ কমে যাওয়ার কারণে সরকার আমদানি ব্যয়ও কমাতে চাচ্ছে। এর ফলে চাপ পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানি কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন সারাদেশে শিডিউল করে বিদ্যুতের লোডশেডিং করা হচ্ছে। একইভাবে গ্যাসেরও রেশনিংয়ের চিন্তাভাবনা হচ্ছে। এর আগে সরকার গত ১২ মে সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের বিদেশ সফরের লাগাম টেনে ধরতে খুব প্রয়োজন না হলে বিদেশ সফরের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ২০ জুলাই সরকার আরো যে আটটি সিদ্ধান্ত নেয় তার মধ্যে রয়েছে সরকারি সব দপ্তরে বিদ্যুতের ব্যবহার ২৫ শতাংশ কমানো, জ্বালানি খাতে সরকারের বাজেটের ২০ শতাংশ কম ব্যবহার, অনিবার্য না হলে শারীরিক উপস্থিতিতে সভা পরিহার করা, অত্যাবশ্যক না হলে বিদেশ সফর পরিহার করা, নিত্যপণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে বাজার মনিটরিং, ভ্রাম্যমাণ আদলেতের মাধ্যমে মজুতদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ইত্যাদি।

বিদেশসফর:

সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের লাগাম টানা যাচ্ছে না। চর দেখতে, মশলার চাষ শিখতে, মেডিকেল যান্ত্রপাতির প্রশিক্ষণ নিতে, পড়াশুনা করানো শিখতে বিদেশ সফর অব্যাহত রেখেছেন তারা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ১৮ জন কর্মকর্তা মশলার চাষ শিখতে বিদেশে যাচ্ছেন। তারা ভারত, শ্রীলঙ্কা অথবা থাইল্যান্ডে যাবেন। এতে মোট খরচ ধরা হয়েছে ৯০ লাখ। তবে যাওয়ার কথা ছিল ৬৫ জনের। পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তির মুখে সংখ্যা কমানো হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশের চরের মানুষের উন্নয়ন কীভাবে করা যায় তা দেখতে যুক্তরাষ্ট্র ও অষ্ট্রেলিয়া সফরে যাচ্ছেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০ জন সরকারি কর্মকর্তা। নয়জন এরইমধ্যে অস্ট্রেলিয়া ঘুরে এসেছেন। বাকিরা যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তাদের বিদেশ ভ্রমণের সরকারি আদেশ জারি হয়েছে। ২০ হাজার শিক্ষক-কর্মকর্তার বিদেশ সফরের একটি প্রকল্প এখন চলমান আছে। তারা শিশুদের পড়ানো শিখতে বিদেশ যাচ্ছেন। এই বিদেশ সফরে মোট খরচ হচ্ছে ৫৯০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে এই প্রকল্প শুরু হয়। করোনার আগে ৮২০ শিক্ষক-কর্মকর্তা বিদেশ ঘুরে এসেছেন। বাকিরা এখন পর্যায়ক্রমে যাবেন। আর সরকারি কর্মচারী হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করতে প্রশিক্ষণ নিতে ৪২ জন, চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তাকে বিদেশ পাঠানো হচ্ছে। এতে খরচ ধরা হয়েছে দুই কোটি ২৫ লাখ টাকা।

সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি:

সরকারি কর্মকর্তাদের গড়ি বিলাস কমেনি। সরকারি একেকটি গাড়ির পিছনে সরকারের মাসে জ্বালানি তেলসহ ব্যয় হচ্ছে ৫০ হাজার টাকা। উপ-সচিব থেকে সচিব পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তারা ৩০ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণে নিয়ে গাড়ি কেনার পর তেল খরচ ও চালকের বেতন বাবদ মাসে ৫০ হাজার টাকা নেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পের গাড়িও ব্যবহার করছেন। এতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে।

এসিবিলাস:

সচিবালয়ে কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকার পরও আরো দুই হাজার ৭০০ এসি আছে বিভিন্ন রুমে রুমে। এসি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন নাই এরকম ৮০০ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর রুমেও এসি আছে। মোট সাড়ে ছয় হজার টন এসি আছে সচিবালয়ে। ঢাকায় একক সরকারি ভবন হিসেবে কমপক্ষে ১৩টি ভবন এসি বিলাসের জন্য এরইমধ্যে আলোচনায় এসেছে। তারমধ্যে রাজস্ব ভবনে দুই হাজার ৫০০ টন, পানি ভবনে দুই হাজার ৪০০ টন, অর্থ ভবনে এক হাজার ৫০০ টন, পুলিশ ভবনে এক হাজার ২০০ টন। প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মকর্তাদের এসির ব্যবহার কমিয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য এই গরমে স্যুট- কোট না পরার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু মন্ত্রীদের বৈঠকগুলোতে মন্ত্রী এবং কর্মকর্তাদের স্যুট-টাই পরা অবস্থায়ই দেখা যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি বিদ্যুতখেকো এসির ব্যবহার একটুও কমেনি। আর এই পরিস্থিতির মধ্যেও সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের দৈনিক ভ্রমণ ভাতা ও বদলি ভাতা বাড়ানো হয়েছে। আর সরকারি কর্মকর্তারা নানা বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্যও যে ভাতা পান তা অব্যহত আছে। এদিকে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি অফিসেও বিদ্যুৎ ব্যয়সহ অন্যান্য ব্যয় কমাতে বলা হয়েছে। কিন্তু তার কোনো নীতিমালা জারি করা হয়নি। ফলে ব্যয় কমানো কোনো উদ্যোগ এখনো স্পষ্ট নয়।

উন্নয়ন প্রকল্পে লাগাম:

তবে সরকার বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের লাগাম টেনে ধরেছে। এরমধ্যে রয়েছে সব উপজেলায় এলইডি স্ক্রিন বসানো, নদী খনন, নতুন সরকারি ভবন নির্মাণ, গ্রামীণ সড়ক প্রশস্তকরণ প্রভৃতি। এছাড়া কমপক্ষে ৬৩৬টি প্রকল্পে বরাদ্দ কাটছাঁট করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা যা বলেন:

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার ব্যয় কমানোর জন্য নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। যখন যেটা মনে হচ্ছে তখন সেই নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। সবকিছু করা হচ্ছে অ্যাডহক ভিত্তিতে। এটার ফল পেতে হলে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেয়া দরকার। তাহলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।’ তিনি বলেন, ‘সিদ্ধান্তগুলো যখন নেয়া হচ্ছে তখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাজ হলো তা মনিটরিং করা কিন্তু আসলে কে মনিটর করছে আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। একেকটি বিষয় একেক রকম। তাই একটার সাথে আরেকটা মেলানো যায় না। সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর বন্ধ করা যায়নি। খুব জরুরি হলে ঠিক আছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বিদেশ সফর হচ্ছে তা আসলে ভ্রমণ ছাড়া আর কিছুই না। তারা সরকারের আদেশ অমান্য করছেন। বিদ্যুতের কথাই বলেন। সেটা এখন ব্যবহারের নীতিমালা কী?’

অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম মনে করেন, ‘সরকার যে উদ্যোগগুলো নিচ্ছে তাতে কিছুটা উপকার পাওয়া যাবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিলে ব্যবহার তো কমবেই। মানুষ চাইলেই তো উৎপাদনের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ পাবে না। আর সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর সরকার চাইলেই বন্ধ করতে পারবে না। কারণ এর সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িত। এখানে ভ্রমণ ছাড়াও আরো অনেক সুবিধার বিষয় আছে।’ তার মতে, সরকার উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় কমাচ্ছে কিন্তু রাজস্ব বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেই। প্রত্যক্ষ কর বাড়ছে না। ‘সরকার দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে দেশের সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু সেটা বন্ধে সরকারের কোনো উদ্যোগ দেখছি না। সরকার চায়ও না,’ বলেন মইনুল ইসলাম।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।