চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ৬ আগস্ট ২০১৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ক্রসফায়ারে হত্যার দায় ব্যক্তির অজুহাত গ্রহণযোগ্য হবে না : আইনশৃংখলা বাহিনীর জন্য সতর্কবার্তা

সমীকরণ প্রতিবেদন
আগস্ট ৬, ২০১৬ ২:০৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ ডেস্ক: বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, গুম, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর দায় জড়িত কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হবে। নিরাপত্তা বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ বা অন্য কোনো অজুহাত দেখিয়ে কেউ পার পাবেন না। বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যতেও নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন-২০১৩ দিয়ে এ ধরনের ঘটনার বিচার হবে। বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন আদালত। নির্যাতিত ব্যক্তির পাশপাশি তৃতীয় কোনো পক্ষও  বিচার চাইতে আদালতের দারস্থ হতে পারবেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, ‘ঘুমন্ত বাঘ’ হয়ে আছে আইনটি। প্রচারণা না হওয়ায় এর প্রয়োগও হচ্ছে না। এই আইনের প্রয়োগ শুরু হলে বিচারবহির্ভূত ঘটনায় জড়িতরা আগামীতে ফেঁসে যেতে পারেন। এটি আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা বলে মনে করেন তারা। আইনটির অধীনে সব অপরাধ বিচারার্থে গ্রহণীয়, অ-আপসযোগ্য ও জামিন-অযোগ্য হবে। নির্যাতনের সময় মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অন্যূন যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এর অতিরিক্ত ওই কর্মকর্তা আরও দুই লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেবেন। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দণ্ড ঘোষণার ১৪ দিনের মধ্যে দণ্ডিত অর্থ বিচারিক আদালতে জমা দিতে হবে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসকের) ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন এ প্রসঙ্গে বলেন, আইনটি সম্পর্কে জনগণ সচেতন নয়। আমারও এখন পর্যন্ত এ আইনে কোনো মামলা করিনি। আইনটির ব্যাপারে ইতিমধ্যে পুলিশ প্রশাসন থেকে সরকারের কাছে আপত্তি জানানো হয়েছে। এটি সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনটি বহাল থাকলে এখন হেফাজতে নির্যাতন বা মৃত্যুর যে ঘটনাগুলো ঘটছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ২০ বছর পরও এর বিচার  চাইতে পারবেন। তিনি  বলেন,  আইনটি কার্যকর করতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা প্রয়োজন। এর সঠিক ব্যবহারে মানবাধিকার রক্ষায় সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
জানা গেছে, সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা থেকে ২০১৩ সালে এই আইনটি প্রণয়ন করে সরকার। এতে ‘হেফাজতে মৃত্যু’ বলতে সরকারি কোনো কর্মকর্তার হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকে  বোঝানো হয়েছে। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গ্রেফতারের সময় কোনো ব্যক্তির মৃত্যু, মামলায় সাক্ষী হোক বা না হোক জিজ্ঞাসাবাদকালে মৃত্যুও হেফাজতে মৃত্যুর অন্তর্ভুক্ত হবে।
আর ‘নির্যাতন’ অর্থ কষ্ট হয় এমন ধরনের ‘শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন’। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা কারও কাছ থেকে তথ্য বা স্বীকারোক্তি আদায়ে ভয়ভীতি দেখান বা শাস্তি দেন তবে তা নির্যাতন হিসেবে গণ্য হবে। আইনের সংজ্ঞায় ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’ অর্থ পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, অপরাধ তদন্ত বিভাগ, বিশেষ শাখা, গোয়েন্দা শাখা, আনসার ভিডিপি ও কোস্টগার্ডসহ দেশে আইন প্রয়োগ ও বলবৎকারী সংস্থাকে  বোঝানো হয়েছে।
আইন থাকলেও সচেতনতার অভাবে এর প্রয়োগ নেই। যে কারণে দেশে বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, গুমসহ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলেছে। মানবাধিকার কর্মী, রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজসহ সব মহল বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা করে এলেও তা কমছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেসব সদস্য এ ধরনের ঘটনায় জড়িত তাদের বিরুদ্ধে এ আইনে মামলা হলে এর দায়ভার ওই কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে নিতে হবে। ফৌজদারি মামলা দায়েরে কোনো সময়সীমা না থাকায় সুযোগ বুঝে যে কোনো সময় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার মামলা করতে পারেন। এতে জড়িতরা ভবিষ্যতে ফেঁসে যেতে পারেন। এমন আশংকা থেকেই পুলিশ প্রশাসন ইতিমধ্যে আইনটি সংশোধনের প্রস্তাব করেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এ ব্যাপারে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, কোনো অবস্থাতেই পুলিশ কাস্টডিতে নির্যাতন, মৃত্যু কাম্য নয়। কারণ যাকে হেফাজতে নেয়া হয়, সে তো বিচারাধীন মামলার আসামি। তার তদন্ত হবে, বিচার হবে, বিচারের পর দণ্ড হলে সে তা ভোগ করবে। যাতে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন বা মৃত্যু না হয় এজন্য নাগরিককে সুরক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে আইনটি করা হয়। তিনি বলেন, রিমান্ডে নেয়ার অর্থ হল, তাকে সতর্কতার সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করা। যে জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তার তথ্য আদায় করা। কিন্তু এখন রিমান্ডে নিয়ে ক্রসফায়ারের যে গল্প সাজানো হয়, এটা আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ব্যারিস্টার শফিক আরও বলেন, এটি আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটা সতর্কবার্তাও।
এ আইনে মানবাধিকার রক্ষায় আইনশৃংখলা বাহিনীকে সতর্ক হতে বলছে। রিমান্ডে নেয়ার পর একজন আসামির নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব আইনশৃংখলা বাহিনীর উল্লেখ করে সাবেক এ আইনমন্ত্রী বলেন, কাউকে রিমান্ডে নিয়ে ক্রসফায়ারে মৃত্যু রিমান্ডে নেয়ার শর্তের সঙ্গে যায় না। এ ধরনের ক্ষমতা আইনশৃংখলা বাহিনীকে দেয়া হয়নি।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সেক্রেটারি ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী আদিলুর রহমান খান বলেন, আইন হওয়ার পর থেকে যাদের হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে ভবিষ্যতেও তাদের বিচার করা সম্ভব। কারণ ফৌজদারি মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। ফলে যে কোনো সময় এ ধরনের অপরাধে মামলা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, এ আইন নিয়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মীরা ক্যাম্পেইন (প্রচার) করেছে। আমরা চাই এই আইনটি কার্যকর হোক। যাতে কেউ অন্যায়ভাবে নির্যাতনের শিকার না হয়। দেশে যাতে মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়।
আদালতে অভিযোগ : আইনে বলা হয়েছে, আদালতে কোনো ব্যক্তি নির্যাতনের অভিযোগ করলে তার বক্তব্য লিপিবদ্ধসহ তাকে রেজিস্টার্ড চিকিৎসককে দিয়ে পরীক্ষা করানোর আদেশ দেবেন। চিকিৎসককে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট আদালতে দাখিলের নির্দেশ দেবেন। একই সঙ্গে অভিযোগকারীর চিকিৎসার প্রয়োজন হলে হাসপাতালে ভর্তির নির্দেশ দিতে পারবেন।
মামলা দায়েরের নির্দেশ : আইনের ৫নং ধারায়, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির বিবৃতি লিপিবদ্ধের পর আদালত তা পুলিশ সুপারের কাছে পাঠাবেন এবং মামলা দায়েরের আদেশ দেবেন। আদেশ পাওয়ার পর পুলিশ তদন্ত করে প্রতিবেদন (চার্জ বা চার্জবিহীন) দেবে। তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যদি মনে করেন যে পুলিশের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে তদন্ত সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে আবেদন করলে আদালত সন্তুষ্ট হলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন।
তৃতীয় পক্ষ দ্বারা অভিযোগ : আইনের ৬(১) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে অন্য কেউ নির্যাতন করেছে বা করছে তৃতীয় ব্যক্তি এ ধরনের তথ্য আদালতকে অবহিত করলে কোর্ট ধারা ৫ অনুযায়ী ওই ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধান করবেন। এছাড়া অভিযোগকারীর বক্তব্যে আদালত সন্তুষ্ট হলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে পারবেন।
অভিযোগের অপরাপর ধরন ও বিচার : ৭ ধারায় বলা আছে, সরাসরি নিজে ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও তৃতীয় কোনো ব্যক্তি দায়রা জজ আদালত অথবা পুলিশ সুপারের নিচে নয় এমন কোনো কর্মকর্তার কাছে নির্যাতনের অভিযোগ দিতে পারবেন। এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ সুপার অথবা তার চেয়ে ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার কর্মকর্তা তাৎক্ষণিক মামলা দায়ের ও অভিযোগকারীর বক্তব্য রেকর্ড করবেন। মামলার নম্বরসহ এই অভিযোগের ব্যাপারে কী কী ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব তা অভিযোগকারীকে অবহিত করবেন। এছাড়া ব্যবস্থা গ্রহণকারী পুলিশ সুপার অথবা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অভিযোগ দায়েরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দায়রা জজ আদালতে একটি রিপোর্ট পেশ করবেন। ধারা ১০-এ আছে, এ আইনের অধীনে সব অপরাধ বিচারার্থে গ্রহণীয়, অ-আপসযোগ্য ও জামিন-অযোগ্য হবে।
তদন্ত :  অভিযোগ লিপিবদ্ধের ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে অপরাধের তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে। এ সময়ের মধ্যে তদন্তকার্য সম্পন্ন করা সম্ভব না হলে, তদন্তকারী কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে আদালতে উপস্থিত হয়ে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করবেন। আদালত ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ পক্ষের শুনানি গ্রহণ করে ৩০ দিনের মধ্যে সময় বৃদ্ধির বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন।
অজুহাত চলবে না : এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ যুদ্ধাবস্থা, যুদ্ধের হুমকি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অথবা জরুরি অবস্থায়; অথবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা সরকারি কর্তৃপক্ষের আদেশে করা হয়েছে- এরূপ অজুহাত গ্রহণযোগ্য হবে না।
বিচার : এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধের বিচার শুধু দায়রা জজ আদালতে অনুষ্ঠিত হবে। মামলা দায়েরের ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য নিষ্পন্ন করতে হবে। কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণে এ সময়ে বিচারকার্য সমাপ্ত করা সম্ভব না হলে আদালত পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সমাপ্ত করবেন।
শাস্তি : কোনো ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হলে অন্যূন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। নির্যাতনের সময় যদি কেউ মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে নির্যাতনকারী অন্যূন যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়া এর অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেবেন। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দণ্ড ঘোষণার দিন থেকে ১৪ দিনের মধ্যে দণ্ডিত অর্থ বিচারিক আদালতে জমা দিতে হবে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।