চুয়াডাঙ্গা সোমবার , ২৩ মে ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কোরবানির পশুর দামে বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা

মৎস্য ও প্রাণিজ খাদ্য উপাদানের মূল্যবৃদ্ধি : ধুঁকছেন খামারি, ভুগছেন ক্রেতা
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
মে ২৩, ২০২২ ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন:
দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য চালসহ নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল বহুদিন ধরে। এবার সঙ্কট দেখা দিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিজ খাদ্য নিয়ে। গত দুই বছরে মৎস্য ও প্রাণিজ খাদ্য তৈরির উপাদানের দাম ৮০ থেকে ১০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ফলে ফিড উৎপাদন খরচ বাড়ছে হু হু করে। অন্য দিকে বেশি দাম দিয়ে ফিড কিনে পোষাতে পারছেন না পোলট্রি, মৎস্য ও গো খামারিরা। বিশেষ করে ছোট ও মধ্যম সারির খামারিরা পড়েছেন মহাবিপাকে। লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে এই সময়ে অনেক উদ্যোক্তাই খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। ফিড তৈরি উপাদানের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধির ফলে এক দিকে যেমন খামারিরা লোকসানে পড়ে ধুঁকছেন, অন্য দিকে মাছ, গোশতের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভুগছেন ভোক্তারা। ফিড মালিকরা বলছেন, উচ্চমূল্যের কাঁচামাল কিনে ফিড উৎপাদন করে তা যথাযথ দাম পাচ্ছেন না তারা। অনেক ফিড মিলই এখন বন্ধ হয়ে পড়ছে কাঁচামাল সঙ্কটে।
ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক মহাসচিব মো: আহসানুজ্জামান বলেন, দেশে বর্তমানে ফিড উৎপাদনের উপাদান ভুট্টা, গম, সয়াবিনসহ সব ধরনের কাঁচামালের সঙ্কট রয়েছে, যার বেশির ভাগই আমদানি করতে হয়। ডলারের দাম বাড়াতে আরেক সমস্যা যোগ হয়েছে। তিনি বলেন, ডিমের দাম মোটামুটি ঠিক থাকলেও মাছ, মুরগির দাম কিন্তু তুলনামূলক কম। খামারিরা মুরগির সেভাবে দাম পাচ্ছেন না। মুরগির বাচ্চার দাম একেবারেই কমে গেছে। ফলে এক দিকে যেমন মিলাররা (ফিড মালিক) লোকসান দিচ্ছেন, খামারিরাও লোকসানে পড়েছেন। সব মিলিয়ে খুবই নাজুক অবস্থা চলছে এই সেক্টরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সয়ামিল রফতানি চালু রাখা ও গম আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাবে কাঁচামালের দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এ অবস্থায় শুধু যে মৎস্য ও প্রাণিজ খাদ্যের দাম বেড়েছে তা নয়, ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়েছে। মৎস্য ও প্রাণিজ খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ খাতের উদ্যোক্তারা পড়েছেন মহাবিপাকে। কাঁচামালের সঙ্কটে ছোট ও মাঝারি বেশকিছু ফিড মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থা বিদ্যমান থাকলে আরো অনেক ফিড মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে হুমকিতে পড়বে পুরো মৎস্য ও প্রাণী খাত। ডিম, দুধ, মাছ ও গোশতের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে হুমকির মুখে পড়বে জনগণের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফিড তৈরিতে ৫০-৫৫ শতাংশ ভুট্টা এবং ৩০-৩৫ শতাংশ সয়ামিলের দরকার হয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে সয়ামিলের দাম ৩০ শতাংশ এবং ভুট্টার দাম ১৮ শতাংশ বেড়েছে। গত আগস্টে সয়ামিলের দাম ছিল প্রতি কেজি ছিল ৫৪ টাকা, গত মার্চে ৭০ টাকা হয়েছিল। সেটি বর্তমানে ৬৬ টাকার উপরে বিক্রি হচ্ছে। গত ১১ মার্চ ব্রয়লার মুরগির ফিডের দাম ছিল প্রতি কেজি ৫৭ টাকা, গত ১৭ মে থেকে তা হয়েছে ৬৩ টাকা।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি)-এর তথ্য বলছে, গত দুই বছরে ফিড মিলের অন্যতম প্রধান উপাদান সয়াবিন মিলের দাম বেড়েছে ৮৮ শতাংশ। অন্য কাঁচামালের দাম বেড়েছে ১২৩ শতাংশ পর্যন্ত। বর্তমানে কাঁচামালসহ মোট উৎপাদন খরচ বাড়ন্ত অবস্থায় রয়েছে। প্রতি কেজি ব্রয়লার ফিডে তিন-চার টাকা, লেয়ার ফিডে আড়াউ থেকে সাড়ে তিন টাকা, ক্যাটেল ফিডে সাড়ে তিন থেকে চার টাকা, ডুবন্ত ফিশ ফিডে আড়াই থেকে সাড়ে তিন টাকা এবং ভাসমান ফিশ ফিডে চার-পাঁচ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। কাঁচামালের দাম বাড়ায় বড় ফিড মিলগুলো তাদের উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। বিপিআইসিসি বলছে, ২০২০ সালের মার্চে ভুট্টার কেজি ছিল ২৪ দশমিক ১৭ টাকা, চলতি মে মাসে তা হয়েছে ৩৫ টাকা। ৩৭ দশমিক ২৫ টাকার সয়াবিন মিলের দাম এখন ৭০ টাকা। ৩৮ দশমিক ৫০ টাকার ফুল ফ্যাট সয়াবিনের দাম হয়েছে ৭৬ টাকা। ২১ দশমিক ২৫ টাকার রাইস পলিস কিনতে হচ্ছে ৩৬ দশমিক ৩৩ টাকায়। ১৩৩ দশমিক ৩৩ টাকার এল-লাইসিন ২৫০ টাকা, ২০০ টাকার ডিএলএম ৩৩০ টাকা, ৫৪ টাকার পোলট্রি মিল ১১০ টাকা এবং ১০০ টাকার ফিশ মিল কিনতে হচ্ছে ১৫০ টাকায়।
তবুও বন্ধ হচ্ছে না সয়ামিল রফতানি :
দেশেই যখন ফিড মিলের কাঁচামালের চরম সঙ্কট চলছে তখনও ভারতে অন্যতম উপাদান সয়ামিল রফতানি বন্ধ হয়নি। যদিও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে সয়ামিল রফতানি বন্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল। ফিডমিল মালিকদেরও জোরালো দাবি রয়েছে নিজস্ব চাহিদা পূরণে সয়ামিল রফতানি যেন বন্ধ করা হয়।
এ বিষয়ে সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এই প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সয়ামিল রফতানি বন্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিলাম। বাণিজ্যমন্ত্রী আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন এটা যাতে বাইরে না যায়, সেটির ব্যবস্থা করবেন। আমরা মনে করি, সেটি এখনো বিবেচনাধীন আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সয়ামিল ও ভুট্টাসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল জোগান কম থাকায় দেশের ছোট ও মাঝারি অনেক ফিড মিলই বন্ধ হয়ে গেছে। ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ অঞ্জন বলেছেন, এ খাতের ৮০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। প্রধান কাঁচামাল সয়ামিল ও ভুট্টার দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। ডলারের দাম বাড়ায় পশুখাদ্যের দাম দ্বিগুণ বেড়েছে। এক বছর আগেও প্রতি কেজি সয়ামিল পাওয়া যেত ২০-২২ টাকায়, এখন তা বেড়ে ৬৬ থেকে ৭০ টাকা হয়েছে। বিশ্ববাজারে ভুট্টার দাম ৪০ ডলার থেকে বেড়ে ১২০ ডলার হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে নিবন্ধিত খামারির সংখ্যা ৯০ হাজার। তবে সারা দেশে এক লাখেরও বেশি হাঁস-মুরগির খামার রয়েছে। পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রি সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) বলছে, লোকসানে ব্যবসা টানতে না পেরে ৪০ শতাংশেরও বেশি খামারি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। বিপিআইসিসির সভাপতি মশিউর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, এই খাতে কতটা খারাপ প্রভাব পড়বে তা কল্পনাও করা যাচ্ছে না। অনেক দেশ গম, ভুট্টা দিচ্ছে না। দাম আজকে একটা বলে তো কালকে আরেকটা বলে। অনেকে শিপমেন্ট বাতিল করে দিচ্ছে। খামারিরা তো অস্বাভাবিক বিপদে পড়ে আছে। ডিমের দাম বেড়ে গেছে কিন্তু, তারপর খরচ যা হয় তার চেয়ে সেটা কম। সাড়ে ৯ টাকা একটা ডিমে খরচ। খামারিরা বিক্রি করছে ৯ টাকার নিচে। প্রতি কেজি গোশত (ব্রয়লার মুরগি) খামারিরা বিক্রি করছেন ১২০ টাকায়। যে খরচ হচ্ছে তাতে কমপক্ষে ১৪০ টাকার উপরে বিক্রি করা উচিত। কাজেই খামারিরাও টিকবে না, আর যারা ফিড মালিক আছেন তারাও তো কাঁচামাল পাচ্ছেন না। বাচ্চা (ব্রয়লার মুরগি) বিক্রি হচ্ছে এখন ১০ টাকা পিস, অথচ খরচ পড়ে ৩৫-৩৮ টাকা। সবকিছু মিলে একটা সাংঘাতিক দুশ্চিন্তায় আছেন খামারিরা। এরই মধ্যে আবার ট্রান্সপোর্ট খরচ বেড়ে গেছে, তেলের খরচ বেড়ে গেছে। আমরা অনেক জিনিস আমদানি করি, এরই মধ্যে আবার ডলারের দামও বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল সরকারের কাছে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কর অবকাশ সুবিধা; ব্যাংকের সুদের হার ৪.৫ শতাংশ নির্ধারণ; পূর্বের ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ এবং আগামী এক বছরের জন্য ইনস্টলমেন্ট বন্ধ রাখা; আসন্ন বাজেটে পোলট্র্রি, মৎস্য ও পশুখাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত সব ধরনের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে সব প্রকার আগাম কর (এটি), অগ্রিম আয়কর (এআইটি), উৎসে কর (সোর্স ট্যাক্স), মূসক ও শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব শাহ এমরান বলেন, কোরবানির গরু পর্যাপ্ত আছে। সমস্যা হলো খাদ্যের দাম বেশি। গত এক বছরে পশুখাদ্যের দাম ৫০ শতাংশের উপরে বেড়ে গেছে। খাদ্যের উচ্চমূল্যের প্রভাব তো কোরবানির পশুর বাজারে অবশ্যই আসবে। দাম তো কিছুটা বাড়তি হবেই। কোরবানির পশুর চাহিদা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেহেতুু পশু খাদ্যের উচ্চমূল্য, যে হারে পণ্যের দাম বেড়েছে মানুষের আয় সেভাবে বাড়েনি। তাই আমার মনে হয়, এ বছর গত বছরের চাইতে অন্তত ১৫-২০ শতাংশ কম হবে। সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, দেশের সয়ামিল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শুল্কমুক্তভাবে সয়াবিন বীজ আমদানি করে। সেখান থেকে সয়াবিন তেল উৎপাদনের পাশাপাশি উপজাত হিসেবে পাওয়া সয়ামিল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে। দেশের মানুষের স্বার্থে শূন্য শুল্ক সুবিধায় আনা সয়াবিন বীজ থেকে উৎপাদিত সয়ামিল তিন থেকে চারটি সয়াবিন তেল উৎপাদনকারী কোম্পানি বেশি মুনাফায় রফতানি করে দিচ্ছে। উৎপাদনকারীরা বর্তমানে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।