চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ২৩ এপ্রিল ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করছে বিএনপি

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
এপ্রিল ২৩, ২০২২ ৯:০৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

Girl in a jacket

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করছে বিএনপি। এ জন্য বিভিন্ন কর্মকৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। দলের ক’জন সিনিয়র নেতা নিয়মিত কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এ ছাড়া দলীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও কূটনীতিকদের ডাকা হচ্ছে। আর বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলোতেও দলের নেতারা নিয়মিত যাতায়াত করে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছেন। ১৬ বছর আগে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে দিনদিনই বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হচ্ছে। না পারছে সরকার বিরোধী আন্দোলন করে দলের শক্তি প্রদর্শন করতে, না পারছে সর্বস্তরে দল গুছিয়ে এগিয়ে যেতে। এ পরিস্থিতিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিকভাবে চরম বেকায়দায় থাকা বিএনপি নতুন উদ্যমে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার চেষ্টা করছে। এ জন্য ঢাকায় কর্মরত বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছে। সম্প্রতি সকল দূতাবাসে দেশী মৌসুমি ফল উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে বিএনপি। এ ছাড়া এবার কূটনীতিকদের সম্মানে দেয়া বিএনপির ইফতার পার্টিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতসহ বেশ ক’টি দেশের রাষ্ট্রদূতদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

মূলত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর থেকেই বিএনপি বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। ওই নির্বাচন বর্জনের পাশাপাশি পরবর্তীতে লাগাতার জ্বালাও পোড়াওসহ নাশকতামূলক রাজনৈতিক কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে বিদেশে বন্ধুহীন হয়ে পড়ে দলটি। মাত্র ক’টি দেশ ছাড়া অন্য দেশগুলো বিএনপিকে আগের মতো আর সহযোগিতা করছে না। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আবার নতুন করে বিএনপি কূটনীতিক তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এ যাত্রায় চেষ্টা সফল না হলে দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মধ্যে চরম হতাশা নেমে আসবে। আর এ কারণেই বিএনপির সিনিয়র নেতারা কূটনৈতিকপাড়ায় দৌড়ঝাঁপ বৃদ্ধি করছেন। কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করতে যেয়ে মাঝে মাঝে বিএনপির জন্য হিতে বিপরীতও হচ্ছে। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে- কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের বিষয়টিকে মাথায় রেখে সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত আখিম ট্র্যোস্টারের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা। কিন্তু বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরুর বক্তব্যের একাংশ নিয়ে পরে আপত্তি জানান জার্মান রাষ্ট্রদূত। অতি সম্প্রতি ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট এ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপির সঙ্গে বৈঠক সম্পর্কে জার্মান রাষ্ট্রদূত আখিম ট্র্যোস্টার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আমি নাকি বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। এমন শব্দ চয়ন সত্য নয়। এই উদ্ধৃতি নিয়ে আমি অসন্তুষ্ট। এ পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়ে বিএনপি।

Girl in a jacket

তবে এ বিষয়ে অতি সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জার্মান রাষ্ট্রদূতের দেয়া বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ, বিএনপির সঙ্গে জার্মান রাষ্ট্রদূতের বৈঠকের পর আমাদের দলের নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জার্মান রাষ্ট্রদূতকে কোট করে কোন কথা বলেননি। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সামগ্রিকভাবে যে কথাটা বলেছেন সেটাই রাষ্ট্রদূত মিস কোট করেছেন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই বিএনপি বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। কিন্তু তাতে তেমন সফল হতে পারেনি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর বহির্বিশ্বের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের চরম অবনতি হয়। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১০ মাস আগে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর আবারও নতুন উদ্যমে জোরেশোরে কূটনীতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করে বিএনপি। কূটনীতিকদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও করেন বিএনপি নেতারা। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে করতে ঢাকায় কর্মরত বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক ও প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে লিখিত চিঠি দেয়া হয় বিএনপির পক্ষ থেকে। কিন্তু ওই যাত্রায় কূটনীতিক তৎপরতায় সফলতা অর্জন করতে পারেনি বিএনপি। যে কারণে দায়সারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে দলটি। সরকার বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে অতীতে রাজপথে নেতিবাচক কর্মসূচী পালন করে বিদেশী কূটনীতিকদের সমর্থন না পাওয়ায় খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পরও তাঁকে মুক্ত করতে রাজপথের কঠোর কর্মসূচীতে যায়নি বিএনপি। দফায় দফায় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পালনের পাশাপাশি খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে আইনী লড়াই চালিয়ে যায় দলটি। পাশাপাশি ঘরোয়া পরিবেশে সভা-সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন করে খালেদা জিয়াকে মুক্তির দাবি জানাতে থাকে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। সেই সঙ্গে এ বিষয়ে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদেরও সহযোগিতা চায় তারা। তাতেও যখন সফলতার মুখ দেখেনি, তখন পরিবারের সদস্যরা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে খালেদা জিয়াকে সাময়িকভাবে মুক্ত করার চেষ্টা করে। এ কাজে বিদেশী কূটনীতিকদেরও সহযোগিতা নেয়।

দেশে করোনা পরিস্থিতি শুরুর পর স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ প্রথম দফায় শর্তসাপেক্ষে ৬ মাসের জন্য মুক্তি পান খালেদা জিয়া। দুই শর্তের মধ্যে ছিল বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে হবে এবং বিদেশে যাওয়া যাবে না। এর পর আরও ৪ দফায় ৬ মাস করে তাঁর মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। আর সর্বশেষ ৫ম দফায় মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয় এ বছর ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। খালেদা জিয়ার সাময়িক মুক্তি ও বার বার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য তাঁর ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবেদন করে। প্রতিবারই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মতামতের জন্য আবেদনটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। আইন মন্ত্রণালয় থেকে মতামত দেয়ার পর খালেদা জিয়ার সাময়িক মুক্তি ও পরে আরও ৪ দফায় মুক্তির মেয়াদ ৬ মাস করে বাড়ানো হয়। তবে বিএনপি ও খালেদা জিয়ার স্বজনরা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে চাইলেও আইনে সে সুযোগ না থাকায় সরকার তাঁকে বিদেশে যেতে দিতে পারেনি। এ বিষয়ে বিএনপি বিদেশী কূটনীতিকদের সহযোগিতা চাইলেও আইনী বিষয় হওয়ায় কূটনীতিকরা বিএনপিকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেনি। সরকারের নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত রেখে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ শর্তসাপেক্ষে ৬ মাসের জন্য মুক্তি পাওয়ার পর খালেদা জিয়া সরাসরি গুলশানের বাসা ফিরোজায় চলে যান। প্রথম দফায় মুক্তির মেয়াদ ৬ মাস শেষ হওয়ার আগেই ওই বছর ২৫ আগস্ট তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে স্থায়ী মুক্তি চেয়ে আবেদন করা হয়। এর পর সরকার দ্বিতীয় দফায় ওই বছর ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে আরও ৬ মাসের জন্য তাঁর মুক্তির মেয়াদ বাড়ায়। তৃতীয় দফায় গতবছর ২৫ মার্চ থেকে তাঁর মুক্তির মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়। এর পর গতবছর আরও এক দফা তাঁর মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়, যা এ বছর ২৪ মার্চ শেষ হয়। তবে এই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই খালেদা জিয়ার ভাই শামীম এস্কান্দারের আবেদনের প্রেক্ষিতে আরও ৬ মাস সময় বাড়ায় সরকার। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর এ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি অভিযোগ করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তসহ চিঠি দিয়ে দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পেতে জোরালো চেষ্টা চালায় বিএনপি। কিন্তু বিএনপির অতীত কর্মকা- ও ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলেও আশানুরূপ পরিবর্তন আসবে এমন ভরসা না পেয়ে বিএনপির তৎপরতায় সাড়া দেয়নি আন্তর্জাতিক অঙ্গন। জাতিসংঘসহ প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বড় বড় দেশ খালেদা জিয়ার কারাগারে থাকা ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইস্যুতে নীরবতা পালন করে।

কূটনৈতিক তৎপরতায় অতীতের চেষ্টা ব্যর্থ হলেও এখন আবার নতুন করে কূটনীতিক তৎপরতা জোরদারের চেষ্টা করছে বিএনপি। দলের পক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লবিং করা হচ্ছে বলে জানা যায়। তবে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া সাময়িক মুক্তিতে থাকলেও রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান টুকু, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেনদসহ ক’জন সিনিয়র নেতা এবং ক’জন জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী কূটনীতিক তৎপরতায় সক্রিয় রয়েছেন। তারা ঢাকায় কর্মরত বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপার্সনের লন্ডন প্রবাসী ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বিভিন্ন মাধ্যমে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে সচেষ্ট রয়েছেন। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করছেন বিভিন্ন দেশে বিএনপির কমিটিতে থাকা প্রবাসী নেতারা।

এদিকে স্বাধীনতাবিরোধী দল হিসেবে চিহ্নিত জামায়াতের কারণে অতীতে কূটনৈতিক তৎপরতায় সফল হতে না পেরে বিএনপি এখন কৌশল গ্রহণ করেছে। আগে বিএনপির সকল কর্মসূচীতে জামায়াত সরাসরি উপস্থিত থাকলেও এখন কৌশলে তাদের দূরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাই সম্প্রতি বিএনপির এক কর্মসূচীতে প্রকাশ্যে এক জামায়াত নেতা অংশগ্রহণ করায় বিএনপির কিছু নেতা ওই জামায়াত নেতা ও তার সঙ্গে আসা কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। অবশ্য পরে গোপনে যোগাযোগ করে আবার জামায়াত নেতার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে। তবে বিএনপি এখনও ২০ দলীয় জোট থেকে জামায়াতকে বাদ না দেয়ায় কৌশলে দূরত্ব বজায় রেখে চললেও বিদেশী কূটনীতিকরা বিষয়টিকে ভালভাবে দেখছেন না বলে জানা যায়। তাই শেষ পর্যন্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির কূটনৈতিক তৎপরতা কতটা সফল হবে তা অনিশ্চিত। এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, বিদেশী বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে বিএনপি আগেও নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছে, এখনও রাখছে। আমরা বিভিন্ন সময় কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করি। দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্র নিয়ে আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলি। পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে অবাধ ও সুষ্ঠু হয় সে বিষয়ে আমরা তাদের সহযোগিতা চাই।

Girl in a jacket

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।