চুয়াডাঙ্গা বৃহস্পতিবার , ১৪ অক্টোবর ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কুমিল্লায় পূজা মণ্ডপে কুরআন অবমাননার অভিযোগ, দিনভর উত্তেজনা

সমীকরণ প্রতিবেদন
অক্টোবর ১৪, ২০২১ ৮:০৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, বিজিবি মোতায়েন, বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদ
সমীকরণ প্রতিবেদন:
কুমিল্লা নগরীতে পূজামণ্ডপে কুরআন অবমাননার অভিযোগে গতকাল বুধবার দিনভর উত্তেজনা দেখা দেয়। নগরীর নানুয়ার দীঘিরপাড়ের একটি দুর্গাপূজার মণ্ডপ ঘিরে এ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় লোকজন এ নিয়ে নানুয়ার দীঘিরপাড়ে বিক্ষোভ করে। একপর্যায়ে পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এ ঘটনা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান। কুমিল্লা সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কু, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান, জেলা পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, নগরীর নানুয়া দীঘিরপাড় এলাকায় গতকাল সকালে লোকজন প্রাতঃভ্রমণ করছিলেন। এ সময় দীঘির উত্তর পাড়ে রাস্তার পাশের একটি পূজামণ্ডপে হনুমানের মূর্তির পায়ের ওপর পবিত্র কুরআন দেখতে পান। বিষয়টি দেখে ৯৯৯-এ পুলিশকে মোবাইল ফোনে কল করা হয়। এমন খবর পেয়ে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে গিয়ে পবিত্র কুরআন শরিফখানা সরিয়ে আনে। পরে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ দিকে বিষয়টি মুহূর্তের মধ্যে লোকজনের মুখে মুখে জানাজানি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়লে স্থানীয়রা সেখানে জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা এ ঘটনার প্রতিবাদ এবং জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে স্লোগান শুরু করে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেখানে যান এবং জনতাকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। কিন্তু প্রতিবাদকারীরা পুলিশের সাথে বাগি¦তণ্ডা শুরু করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ টিয়ার শেল ও গুলি চালায়। এক পর্যায়ে পুলিশ ও ক্ষুব্ধ জনতার মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আনওয়ারুল আজিম জানান, খবর পেয়ে পূজামণ্ডপে হনুমানের মূর্তির পায়ের ওপর থেকে পবিত্র কুরআন উদ্ধার করা হয়েছে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা অব্যাহত আছে।
সেখানকার পূজা উদযাপন কমিটির সম্পাদক নির্মল পাল বলেন, ‘কুমিল্লা শহরের একটি পূজামণ্ডপ থেকে কুরআন পাওয়ার পর বেশ কয়েকটি পূজামণ্ডপে হামলা হয়েছে। শহরের নানুয়ারদীঘি এলাকার একটি পূজামণ্ডপের প্রতিমায় কুরআন রাখার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ গিয়ে তা সরিয়ে নেয়। কিন্তু এর পরপরই একদল ব্যক্তি বেশ কিছু পূজামণ্ডপে হামলার চেষ্টা চালায়।’ নির্মল পাল আরও বলেন, ‘পূজা বানচালের জন্য পরিকল্পিতভাবে কুরআন রেখে এ ঘটনা ঘটিয়ে তারাই এখন শহরজুড়ে পূজাবিরোধী বিক্ষোভ করছে। কয়েকটি মণ্ডপে হামলার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু পুলিশের বাধায় ভেতরে ঢুকতে না পারলেও গেট বা সামনের স্থাপনা ভাঙচুর করেছে।’
বিডিনিউজ জানায়, নানুয়ারদীঘি স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়ার একপর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করতে গেলে তারা তোপের মুখে পড়ে এবং পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বাধে। এরপর দুপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের-বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতির বিষয়ে বিজিবির কুমিল্লা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফজলে রাব্বি বলেন, কুমিল্লায় যাতে কোনো ধরনের ‘আনরেস্ট’ পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেজন্য দুপুরে চার প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। কী হয়েছিল- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘটনা কী হয়েছে, তা আমি জানি না। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন কথা শুনেছি এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ যাতে না ঘটতে পারে, সে জন্য বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, আমরা পবিত্র কুরআনের মর্যাদা বুঝি। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতারা আমাদের বলেছেন, পূজা বন্ধ রাখতে। আমরা তাদের পূজা চালিয়ে যেতে বলেছি। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ইসলামেও কারো ধর্ম পালনে বাধা দেয়ার বিধান নেই।
পুলিশ সুপার মো: ফারুক আহমেদ বলেন, আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। ঘটনার সাথে হিন্দু-মুসলমান যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কুমিল্লার সব স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদ
হেফাজতে ইসলাম :
কুমিল্লায় হিন্দুদের পূজামণ্ডপে পবিত্র কুরআন অবমাননার প্রতিবাদ জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা নুরুল ইসলাম। এক বিবৃতিতে হেফাজত নেতারা বলেন, কুমিল্লার নানুয়া দীঘিরপাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কুরআনকে যেভাবে অবমাননা করা হয়েছে, তা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। যারা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে অতিসত্বর কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা বলেন, দেশের ইসলামপ্রিয় জনতাকে দুর্বল মনে করবেন না। এ দেশের তৌহিদি জনতা নিজেদের ঈমান-আকিদা রক্ষা করতে জানে। এভাবে কুরআনকে অবমাননা করা হবে, আর দেশের ইসলাম প্রিয় জনতা বসে থাকবে, এ হতে পারে না।
আমরা প্রশাসনকে সতর্ক করে বলে দিতে চাই, আপনারা এসব ষড়যন্ত্রকে থামান, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। না হয় পরিস্থিতি অশান্ত হলে এর দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে। এ ঘটনার প্রতিবাদ শুধু কুমিল্লায় নয়, সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। তখন থামাতে চেষ্টা করলেও থামানো যাবে না। তারা আরো বলেন, যে পূজামণ্ডপে এ ঘটনা ঘটেছে, সে মণ্ডপ অবিলম্বে বন্ধ করুন। যারা এ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত, তাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুঁজে বের করে গ্রেফতার করুন। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করুন।
জামায়াত :
কুমিল্লা মহানগরীর নানুয়া দীঘিরপাড় এলাকায় পবিত্র কুরআনুল কারিম অবমাননার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মা’ছুম। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘পবিত্র কুরআন মাজিদ আল্লাহ প্রদত্ত ঐশী বাণী। এটি মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। সারা বিশ্বের মুসলমানগণ পবিত্র কুরআন মাজিদকে নিজেদের জীবনের চাইতেও বেশি ভালোবাসে। কুমিল্লা মহানগরীর নানুয়া দীঘিরপাড় এলাকায় এক পূজামণ্ডপের বেদিতে পবিত্র কুরআনুল কারিম রেখে দুর্বৃত্তরা চরম দৃষ্টতার পরিচয় দিয়েছে। তারা মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতিতে মারাত্মক আঘাত দিয়েছে। কুরআনুল কারিমের অবমাননার ফলে মুসলমানদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আমরা পবিত্র কুরআনের অবমাননার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতির দেশ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের সব ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্ম নির্বিঘ্নে পালন করে আসছে। মুসলমানরা সব ধর্মের প্রতি সহনশীল ও শ্রদ্ধাশীল। পৃথিবীর সব দেশের সংবিধানে ধর্মীয় অধিকার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছি, একটি বিশেষ মহল বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানছে। তিনি বলেন, আমরা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের শান্ত থাকার এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। সেই সাথে পবিত্র কুরআন মাজিদ অবমাননার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।
এ ছাড়া খেলাফত মজলিসের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাইখ জিয়া উদ্দীন, সহসভাপতি মাওলানা জহীরুল ইসলাম ভূঁইয়া, মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী, মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী ও যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া, খাদেমুল ইসলাম বাংলাদেশের আমির ও গওহরডাঙ্গা মাদরাসার মোহতামিম আল্লামা মুফতি রুহুল আমীন, কওমি শিক্ষা বোর্ড গওহরডাঙ্গার মহাসচিব মাওলানা শামছুল হক, ছদর ছাহেবের পৌত্র মুফতি উসামা আমীন, খাদেমুল ইসলাম বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আজিজুর রহমান, কওমি মঞ্চের চেয়ারম্যান মুফতি মোহাম্মদ তাসনীম, তানজিমুল মুদাররিসিন বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা ঝিনাত আলী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা ইসমাঈল নূরপুরী ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা আব্দুল আজিজ, আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী, বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যের চেয়ারম্যান আল্লামা এম এ মান্নান ও মহাসচিব এম এ মতিন, ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মুহাম্মাদ শওকাত হোসেন, মাওলানা মুহাম্মাদ রুহুল আমীন, অধ্যাপক মাওলানা মুহাম্মাদ এনামুল হক আজাদ ও সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মোস্তফা তারেকুল হাসান, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনী ও মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ ও যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নেতৃবৃন্দ তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সূত্র-নয়া দিগন্ত

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।