কার্পাসডাঙ্গার নজরুল সম্মেলন ও সমসাময়িক ভাবনা

497

মুন্সি আবু সাইফ
সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ, চুয়াডাঙ্গা।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য কার্পাসডাঙ্গায় এ বছরের ১১,১২,১৩ মার্চ তিন দিন ব্যাপী ‘জাতীয় নজরুল সম্মেলন’১৬ অনুষ্ঠিত হলো। নজরুল ইনস্টিটিউট ঢাকা ও চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসনের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠানটি নানা বিবেচনায় ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিসম্প্রতি আমাদের দেশে ধর্মের নামে জঙ্গিবাদের উত্থান জাতীয় নজরুল সম্মেলনকে এই সময়ের প্রেক্ষিতে বড় বেশি প্রাসাঙ্গিক করে তুলেছে। তাই একটু দেরিতে হলেও এই প্রসঙ্গের অবতারনা। ১৯২৬-১৯২৮ সালের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম স্বদেশী আন্দোলনের গ্রেফতারী পরোয়ানা মাথায় নিয়ে কিছুদিন তদানিন্তন নদীয়া জেলার জেলা শহর কৃষ্ণনগরে আত্মগোপন করে ছিলেন। পরে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখ এড়িয়ে তিনি নদীপথে চুয়াডাঙ্গা জেলার বর্তমান দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গায় এসে আত্মগোপন করে ছিলেন। তিনি কার্পাসডাঙ্গার খ্রিষ্টান পল্লীর যে বাড়িতে উঠেছিলেন সে বাড়িটা এখন অত্র এলাকায় ‘আটচালা ঘর’ নামে বিখ্যাত হয়ে আছে। এখানেই নজরল ইসলাম এক থেকে দুই মাস আত্মগোপন করেছিলেন। বিষয়টি গুরত্বপূর্ণ এই জন্য যে, নজরল ইসলাম পৃথিবীর একমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী কবি। পরাধীন দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য তিনি বিদ্রোহ করেছেন। কবি নিজে বিপ্লবী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন এবং ভারতবর্ষের তাবৎ স্বাধীনতা সংগ্রামীদেরকে আন্দোলনে উদ্ধুদ্ধ করেছেন। এ কারণে তিনি বারবার ব্রিটিশ রাজরোষে পতিত হয়েছেন। গ্রেফতার ও নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন অনেকবার। সশ্রম কারাদন্ডও ভোগ করেছেন। তারপরও তিনি বিপ্লব বিদ্রোহ থেকে একপাও সরে আসেননি। অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের মতো ব্রিটিশ সরকারের সাথে গোপন আতাত ও সমঝোতা করেননি। এজন্য এই  মহান ও আপোষহীন স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ববোধ থেকেই জাতীয় নজরুল ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের কবির স্মৃতিধন্য পাঁচটি স্থানে জাতীয় নজরুল সম্মেলনের আয়োজন করেছিলো। এ মহান কর্মের ধারাবাহিকতার কার্পাসডাঙ্গায় নজরুল জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। অনুষ্ঠানটি সর্বত্র প্রশংসা লাভে ধন্য হয়েছে। কারণ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল শিডিউল রক্ষার মধ্য দিয়ে সমগ্র কর্মকান্ড পরিচালিত হয়েছে। প্রতিদিনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অথিতিবৃন্দের সুন্দর উপস্থিতি একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিলো। বিশেষ করে মহান জাতীয় সংসদের মাননীয় হুইপ জনাব সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন এমপি মহোদয় এবং চুয়াডাঙ্গা দুই আসনের মাননীয় সাংসদ হাজী আলী আজগর টগর মহোদয়ের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিলো। সম্মানিত বিভাগীয় কমিশনার জনাব আব্দুস সামাদ মহোদয়ের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা উপস্থিত দর্শক শ্রোতামন্ডলিকে নানাভাবে সমৃদ্ধ ও বিমুগ্ধ করেছে। নজরুল ইসলামের কার্পাসডাঙ্গায় অবস্থানের নানা দালিলিক ও প্রামাণ্য বক্তব্য আলোচনার মাধ্যমে উঠে আসে। নজরুল ইসলাম যেহেতু ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য কলমযুদ্ধ চালিয়েছিলেন তাই তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং মুক্তিযোদ্ধা। সেজন্য কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সেই মহান দায়িত্ববোধ থেকেই গণমানুষের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে গেছেন। বর্তমান সরকার নজরুলের নামে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে। তাছাড়া নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন জায়গায় নজরুল স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মিত হয়েছে। তাছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে নজরুল সাহিত্যের উপর পঠনপাঠন অনেক বেশি কলেবরে শুরু হয়েছে।
এমন একটি প্রেক্ষাপটে কার্পাসডাঙ্গায় নজরুল ইসলামের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এখন সময়ে দাবী। কাজী নজরুল ইসলাম কার্পাসডাঙ্গাবাসীর স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছেন। চুয়াডাঙ্গা দুই আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব হাজী আলী আজগর টগর মহোদয় ‘আটচালা ঘর’ সংশ্লিষ্ট পরিবারকে নজরুল স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি উইল করে দিবার জন্য বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন। পরিবারের অন্যতম সদস্য মুকুল বিশ্বাস বিষয়টি বিবেচনার প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন। তাছাড়া নজরুল যে পুকুরঘাটে বসে কবিতা ও গান রচনা করতেন সে স্মৃতি সংরক্ষণের প্রতিশ্র“তি দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া কৃষিবিদ রফিকুল ইসলামের ৭ দফা দাবীরযৌক্তিকতা স্বীকার করেন জাতীয় সংসদের মাননীয় হুইপ সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন মহোদয় এবং বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রতিশ্র“তি ব্যক্ত করেন। এমন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য নজরুল ইনসষ্টিটিউটকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। একইসাথে অনুষ্ঠানের সফল বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসক জনাব সায়মা ইউনুস মহোদয়কে বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে হয়। অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুচারুরূপে পালনের জন্য তাঁর সঠিক দিক নির্দেশনা ছিলো আমাদের পাথেয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জনাব আনজুমান আরা, বিজ্ঞ অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট জনাব মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, এন.ডি.সি মাহনুল ইসলাম, সহকারী কমিশনার নাফিজা সুলতানা ও টুকটুক তালুকদার যে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে জেলাবাসী চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে তা স্মরণ করবে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেনের প্রাণবন্ত বক্তব্য এলাকাবাসী বহুদিন মনে রাখবে । দামুড়হুদা উপজেলার সুযোগ্য নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব ফরিদ উদ্দিন এবং চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রসাশনের এক ঝাক তরুণ সহকারী কমিশনার অত্যন্ত আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে অনুষ্ঠানটির একটি সফল রূপদান করেছেন। কৃতজ্ঞতা জানাতেই হয় জনাব সিরাজুল আলম ঝন্টুর প্রতি। কার্পাসডাঙ্গার প্রতিটি মানুষ অনুষ্ঠানটির সফল রূপদানের জন্য যে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন তা ইতিহাস হয়ে থাকবে। জেলা পরিষদ প্রশাসক জনাব মাহফুজুর রহমান মনজু, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব শেখ হামিম হাসান, জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক জনাব আজাদুল ইসলাম আজাদ যে দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য দান করেন তা এক কথায় অনবদ্য। রেজাউদ্দিন স্টালিনকে ধন্যবাদ জানিয়ে খাঁটো করতে চাই না। তাঁর কর্মতৎপরতা ও দায়িত্ববোধ আমাকে অনেক কিছু নীরব শিক্ষা দিয়েছে। অনুষ্ঠানের সকল আলোচক ও মূখ্য আলোচক সবার প্রতি রইল আমার অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। এই অনুষ্ঠানের সফল সমাপ্তির জন্য প্রিন্ট এবং ইলেট্রনিক্স মিডিয়ার সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে তা অবিস্মরনীয়। তাদের অসাধারণ নিউজ কাভারেজের ফলে অনুষ্ঠানটি দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভে ধন্য হয়েছে।
প্রসঙ্গতঃ এই দাবী পূর্ণব্যক্ত করতে চাই যে, কার্পাসডাঙ্গায় নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এখন সময়ের দাবী। আমরা বিশ্বাস করি বর্তমান সরকার চুয়াডাঙ্গাবাসীর এই দাবীর প্রতি আন্তরিক সম্মান প্রদর্শন করবেন। আলোচনার শুরুতেই আমি বলেছি যে, নজরুল সাহিত্য সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে বড় বেশি প্রাসঙ্গিক। ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি এবং ধর্মের অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে নজরুল সাহিত্য বড় সোচ্চার। নজরুল ধর্মের চির সহনশীল রুপটির প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। তিনি আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। তাই অন্ধ সময় পার করতে হলে নজরুল সাহিত্যই আমাদের বিশস্ত পাথেয়। কার্পাসডাঙ্গার নজরুল সম্মেলন সে কথায় যেন বার বার স্মরণ করিয়ে দিলো।
প্রাবন্ধিক:পিএইচডি গবেষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।