কারাগারে লেখক মুশতাকের মৃত্যু, নানা প্রশ্ন

33

দিনভর বিক্ষোভ, পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জ, আটক ৩
সমীকরণ প্রতিবেদন:
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কারাবন্দী অবস্থায় মৃত্যু হওয়া লেখক মুশতাক আহমেদের মরদেহ ময়নাতদন্তের পর গতকাল শুক্রবার সন্ধায় আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। কারাগারে এই মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল দিনভর প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ হয়েছে। সন্ধ্যায় শাহবাগে মশাল মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তিন জনকে আটক করেছে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ জন। বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদের নতুন কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছে। তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। মৃত্যুর কারণ তদন্তের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মুশতাক আহমেদ কাশিমপুর কারাগারে মারা যান। বৃহস্পতিবার রাতে লেখক মুশতাক আহমেদের লাশ শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গাজীপুরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরীর উপস্থিতিতে লাশের সুরতহাল সম্পন্ন হয়। পরে ওই হাসপাতালের মর্গে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন চিকিৎসকরা। কারাগারের পক্ষ থেকে মুশতাকের মৃত্যুর ব্যাপারে জিএমপির সদর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা (নং ১৩) রুজু করা হয়েছে। দুপুর ১২টার দিকে মুশতাক আহমেদের মৃতদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করে কারা কর্তৃপক্ষ। বাদ এশা রাজধানীর লালমাটিয়া সি-ব্লক জামে মসজিদ কমপ্লেক্সে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে আজিমপুর কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. শাফি মোহাইমেন জানান, ময়নাতদন্তে তেমন কিছু সিমটম আমরা পাইনি, তার বাহ্যিক কোনো ধরনের আঘাত ছিল না। তবে বডির ভিতরের ইন্টারনাল অরগান আমরা সংরক্ষণ করেছি। নমুনার কেমিকেল অ্যানালাইসিসের জন্য মহাখালীতে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে ও হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগে ইতিমধ্যে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে পরীক্ষার রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করতে গাইড করবে।
এদিকে সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুশতাক হত্যার বিচারের দাবিতে মিছিল নিয়ে রাজধানীর শাহবাগে যান প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা। সমাবেশ থেকে আগামী ১ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি দেওয়া হয়। লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে গত বৃহস্পতিবার রাতেও রাজধানী ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। বামপন্থি কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের উদ্যোগে বের হওয়া এ মিছিল থেকে তার মৃত্যুর জন্য সরকারকে দায়ী করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) থেকে বের হওয়া মিছিলটি শাহবাগ ও পরীবাগ মোড় ঘুরে আবার সেখানে ফিরে আসে। মিছিলে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক দীপক শীল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (মার্ক্সবাদী) কেন্দ্রীয় সভাপতি মাসুদ রানা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (বাসদ) কেন্দ্রীয় সভাপতি আল কাদেরী। বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে তারা সমাবেশ করেন। গতকাল সকালের বিক্ষোভ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি আল কাদেরী, ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন প্রিন্স, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক অমল ত্রিপুরা প্রমুখ, ছাত্র ইউনিয়নের রাগীব নাইম প্রমুখ। এ সময় লেখক মুশতাক আহমেদকে ‘হত্যা’ করা হয়েছে বলে দাবি করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি আল কাদেরী বলেন, লেখক মুশতাক আহমেদ সাধারণভাবে মৃত্যুবরণ করেননি। এই সরকারের কারণে তিনি তিলে তিলে মারা গেছেন। অবিলম্বে মুশতাক আহমেদের খুনের বিচার চাই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে বাংলাদেশের মানুষের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। প্রতিবাদের ভাষাকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, পুরো দেশটাকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে। এ পুলিশি রাষ্ট্রের বলি লেখক মুশতাক আহমেদ। আমরা প্রতিবাদ না করলে এই ঘটনা বন্ধ হবে না। আরও ঘটতে থাকবে। এ সময় তিনি সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন প্রিন্স বলেন, ছাত্ররা যখন পরীক্ষার জন্য রাস্তায় দাঁড়াচ্ছে তখন তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। আমরা সরকারি এই নিপীড়নের প্রতিবাদ জানাই। ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক মাহির শাহরিয়ার রেজা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর থেকে ক্রসফায়ার, গুম, খুনের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। বেড়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যা। মানুষের কথা বলার অধিকার নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই। আওয়ামী লীগ তাদের রাজত্ব কায়েম করে রাখার জন্য ভিন্নমতের দমনের জন্য যা যা করার দরকার সব করছে।
মশাল মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ :
সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি মশাল মিছিলের আয়োজন করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশনসহ অন্যান্য বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো। মশাল মিছিলটি পাবলিক লাইব্রেরির সামনে গেলে সেখানে বাধা দেয় পুলিশ। বিক্ষোভকারীরা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। মশাল মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জে অন্তত ১৫ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাশেদ শাহরিয়ার এ দাবি করেন। তিনি বলেন, লাঠিচার্জের পর মশাল মিছিলে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীরা শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ-সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান নেন। পরে পুলিশ সেখানে গেলে তাদের সঙ্গে বাগ্বিতন্ডা হয় এবং একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়ে। পুলিশ সেখানে আবার লাঠিচার্জ করে বলে জানান রাশেদ শাহরিয়ার। তখন প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। পরে পুলিশ শাহবাগের দিকে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে বলে জানান রাশেদ। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন উর রশীদ এ বিষয়ে বলেন, প্রথমে বিক্ষোভকারীরা আমাদের লক্ষ্য করে মশাল ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে আমাদের ছয়-সাতজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ তাদের প্রতিহত করে।
শাহবাগে গায়েবানা জানাজা :
লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুতে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গায়েবানা জানাজা হয়। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূর প্রমুখ। জানাজার পূর্বে এক সমাবেশে মুশতাক আহমেদের ‘হত্যার বিচার’ ও ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিলের দাবি জানানো হয়।