কাঁদছে কিউবা

282

4bkb345d76e25ci8dg_800C450

সমীকরণ ডেস্ক: ‘ভিভা ফিদেল’। দীর্ঘজীবী হোন, ফিদেল। এমন চিৎকারেই ফিদেলকে বিদায় জানাচ্ছে কিউবাবাসী। পতাকা হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এসেছে। একই সুরে স্লোগান: ‘আই অ্যাম ফিদেল’। প্রাণপ্রিয় বিপ্লবী, সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রোর মৃত্যুতে চারদিকে আহাজারি। বুক চাপড়ে কাঁদছে মানুষ। রাষ্ট্রীয়ভাবে চলছে ৯ দিনের শোক। সারা দেশে জাতীয় পতাকা রয়েছে অর্ধনমিত। শনিবার প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ত্রো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ফিদেল ক্যাস্ত্রোর মৃত্যুর সংবাদ জানানোর সঙ্গে সঙ্গে শোকের আবেশ ছুঁয়ে যায় কিউবায়। সারা বিশ্বে সৃষ্টি হয় এক আলোড়ন। মানুষের শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যেতে থাকে হিম অনুভূতি। সত্যি, ফিদেল ক্যাস্ত্রো আর নেই! বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূয়সী প্রশংসাকারী এই বিপ্লবীর মৃত্যু সংবাদে বাংলাদেশের মানুষের মাঝেও নেমে আসে শোক। প্র্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেন। সর্বস্তরের মানুষকে গ্রাস করে এক ধরনের নিকট আত্মীয় হারানো বেদনা। বিশ্বের বাঘা বাঘা নেতারা মহান এই নেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। শনিবার থেকেই কিউবায় রাষ্ট্রীয় শোক পালন শুরু হয়েছে। এদিন সংক্ষিপ্ত ও ব্যক্তিগত আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়েছে ফিদেল ক্যাস্ত্রোর। আগামী ৪ঠা ডিসেম্বর তার দেহাবশেষ নিয়ে সমাহিত করা হবে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সান্তিয়াগো ডি কিউবায়। এর আগে রাজধানী হাভানায় ধারাবাহিকভাবে তার স্মরণে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ সময়ে তার দেহাবশেষ বহন করা হবে ক্যারাভান অব ফ্রিডম রুট দিয়ে। ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি এ রুটেই যাত্রা করেছিলেন। বিবিসি’র সাংবাদিক উইল গ্রান্ট তার রিপোর্টে বলেছেন, হাভানা কাঁদছে। ওয়াশিংটনের গ্রাস থেকে দেশকে মুক্ত করেছিলেন যে নেতা তাকে হারিয়ে মানুষ যেন দিশাহারা। রাজতন্ত্রের কোনো উত্তরাধিকারী ছিলেন না ফিদেল ক্যাস্ত্রো। তবু তিনি নিজের নেতৃত্বের জোরে বিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার নেতা। স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে তিনি ২০০৮ সালে রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটান। ক্ষমতা তুলে দেন তারই ছোটভাই রাউল ক্যাস্ত্রোর হাতে। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও তাকে হত্যার চেষ্টা উপেক্ষা করে ফিদেল ক্যাস্ত্রো তার কমিউনিস্ট বিপ্লব অব্যাহত রেখেছেন। নিজের দেশকে মুক্ত রেখেছেন বাইরের বিশ্বের রক্তচক্ষু থেকে। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয় তখন কিউবার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। এ সময় মারাত্মক আর্থিক সংকটে দেশ ছেড়ে অনেক মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। কিন্তু ঠিকই সেই পরিস্থিতিতেও দেশবাসীর ভালোবাসা অর্জন করে ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন এই নেতা, বিংশ শতাব্দীর আইকন।
পাঁচ সন্তানের জনক রাফায়েল উরবে (৬০) বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমার জন্য, প্রথমে আমার মা, এরপর আমার সন্তানরা, এরপর আমার পিতা, এরপরই থাকবে ফিদেলের স্থান।’ তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু দরিদ্রই ছিলাম না, ছিলাম হতভাগা। তখনই এলেন ফিদেল আর তার বিপ্লব। তিনি আমাকে মানবিকতা দিয়েছেন। আমার আজ যা কিছু আছে, তার সব কিছুর জন্যই আমি ফিদেলের নিকট ঋণী।’ এদিকে হাভানায় বাড়তি পুলিশ ও সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়নি। তবে হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ক্যাস্ত্রো নিজেও পড়েছেন, সেখানে জড়ো হয়েছে হাজারো শিক্ষার্থী। তাদের কণ্ঠে শোক নেই, আছে দীপ্ত শপথ। ‘ভিভা ফিদেল!’ তাকে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ‘নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক’ আখ্যায়িত করেছেন। তবে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা খুব সতর্ক ভাষায় বিবৃতি দিয়েছেন। তার আমলেই কিউবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সমপর্ক পুনঃস্থাপিত হয়। নিজের বিবৃতিতে তিনি এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, ক্যাস্ত্রোর শাসনামলে অনেক মানুষের জীবনই পরিবর্তিত হয়েছে বিভিন্ন দিকে। তবে ক্যাস্ত্রোর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি তিনি সমবেদনা জানিয়েছেন। সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতে ক্যাস্ত্রোর অবদানের কথা স্মরণ করেছেন বৃটেনের লেবার পার্টির বামপন্থি নেতা জেরেমি করবিন। শোক প্রকাশ করেছেন কানাডার উদারমনা প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। তবে ট্রুডো ও ওবামার বক্তব্যে ক্যাস্ত্রোর হাতে নির্যাতনের শিকার মানুষদের কথা উল্লেখ না থাকায় কড়া সমালোচনা করেছেন মার্কিন সিনেটর মার্কো রুবিও। রুবিও নিজে কিউবা থেকে আমেরিকায় পাড়ি জমানো এক অভিবাসী পরিবারের সন্তান। যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে বসবাসরত অনেক কিউবান অভিবাসী উল্লাস প্রকাশ করেছেন। অনেকে বলছেন ফিদেল একজন একনায়ক, স্বৈরশাসক, যার শাসনামলে মানুষের মত প্রকাশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু সমর্থকদের মতে, তার ‘লিগ্যাসি’ শাসক হিসেবে নয়। ইতিহাসে তিনি ঠাঁই পাবেন একজন বিপ্লবী হিসেবে। তিনি রয়ে যাবেন বিপ্লব, আর সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতীক হিসেবে। ঠিক যেমনটা বলেছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ভেনিজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চ্যাভেজ। ‘ফিদেলের মতো প্রাজ্ঞ মানুষদের মারা যাওয়া উচিত নয়। ফিদেলের মতো মানুষ মরতে পারে না। কারণ, তিনি জনগণের অংশই রয়ে যাবেন।’