করোনা মোকাবেলার উপায়

47

– জাহিদ হোসেন
করোনা মহামারি থেকে পরিত্রাণ লাভের উপায় হিসেবে আমরা নানা ধরণের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এই মহামারি থেকে রক্ষার জন্য বাহ্যিক উপায় হিসেবে আমরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, সার্বক্ষণিক মাস্ক পরিধান করা, জনসংযোগ এড়িয়ে চলা, পোশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার রাখা এবং অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে না যাওয়া ইত্যাদি সব স্বাস্থ্যবিধি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনার আলোকে পরিপালন করছি। করোনা প্রতিরোধে কখন কী করতে হবে, তা এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি আমাদের বলে দিচ্ছে। লকডাউন নামের এই স্বাস্থ্যবিধিও আমরা তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে পালন করছি। তারপর সর্বশেষ ও স্থায়ী প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আমরা ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছি। ভ্যাকসিন হলো এই মরণব্যাধী থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র বৈজ্ঞানিক উপায়।
করোনা মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ার আরও কোনো সহজ উপায় আছে কি না তা এখনো আমাদের অজানা। তবে সামাজিক প্রতিকারের অংশ হিসেবে অনেকে কীটনাশকমুক্ত শাক-সবজি, ফলমূল এবং ভেজালমুক্ত খাবার গ্রহণের কথা বলছেন। এইগুলো মহামারি থেকে মুক্তির জন্য প্রতিবিধান বা দাওয়ায় হিসেবে কাজ করতে পারে। করোনা থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে অনেকে আবার ধর্মীয় বিধি-বিধান মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের কথা হলো- নিয়মিত নামাজ আদায় করা, ওজু করা, দাঁড়ি রাখা, রোজা পালন করা এবং মেয়েরা পর্দা মেনে চললে করোনা থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন। আমরা এতোদিন জেনে এসেছি, ধর্মের এই বিধি-বিধানগুলো পরিপালন করা হয় স্রষ্টাকে খুশি করার জন্য। এবং এই বিধি-বিধানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো পরকালের পূণ্যলাভ। করোনা হলো একটি বৈশ্বিক মহামারি। এই মহামারি থেকে পরিত্রাণ লাভ করতে হলে তা বৈজ্ঞানিকভাবেই করতে হবে। এখানে অন্য কোনো কিছু ভাবার সুযোগ কোথায়? দাঁড়ি রাখলে মাস্ক পরতে হবে না, ওজু করলে হাত ধোঁয়ার দরকার নেই, বোরকা পরিধান করলে মেয়েদের মাস্ক ব্যবহার না করলেও চলবে-এসব অর্বাচীন প্রচারণায় সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে আর উৎসাহ বোধ করবে না। সুতরাং ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাস থেকে এসব দাওয়ায় এখন বাতলানো উচিৎ নয়।
তাছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে করোনা মুক্তির উপায় হিসেবে ধর্মীয় কোনো বিধি-বিধান মেনে চলার কথা বলেননি। ধর্মের প্রতি ব্যক্তিগত বিশ্বাস ভালোবাসা ও আসক্তি থেকে অনেকেই এ জাতীয় দাওয়ায় বাতলাতে পারেন। কিন্তু এগুলো কোনো বিজ্ঞানসম্মত পন্থা হতে পারে না। এখন এসব প্রাচীনতার খোলস ত্যাগ করে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এবং আধুনিক কালের জীবন ও কর্মধারায় নিজেকে যুক্ত করতে হবে। তবেই না ঘটবে করোনা মুক্তি। আবার একই সাথে মদ এবং ধূমপান পরিহারের কথা বলা হচ্ছে। আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে মদ নিষিদ্ধ। কিন্তু পশ্চিমা দেশে মদ তাদের জীবনের নিত্য সঙ্গী। আবহাওয়াগত কারণে এবং কর্মস্পৃহার তাগিদে তারা মদ পান করেন। আমাদের ধারণা সেখানে কখনোই মদপান নিষিদ্ধ হবে না। তবে এগুলির উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যেতে পারে। তবে ইউরোপে যখন কোন মহামারি দেখা দেয়,তখন তারা এর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেন।
বৈশ্বিক মহামারির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে বসন্ত, নিউমোনিয়া, প্লেগ, ইবোলা বা অন্য যে-কোন রোগ কখনোই কোন অলৌকিক ঝাড়ফূক তাবিজ মন্ত্র দিয়ে দূর করা সম্ভব হয়নি। এর জন্য প্রয়োজন হয়েছে বৈজ্ঞানিক আবিস্কার।এক সময় এই সব রোগের টিকা আবিস্কার করতে প্রায় সত্তর বছর লেগে যেত। এখন এক বছরের মধ্যে বিজ্ঞানীরা এই দুরূহ ভ্যাকসিন আবিস্কার করে বিশ্ব মানবতাকে রক্ষার জন্য নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দুঃসাহসিক নারী সারা গিলবার্ট আজ বিশ্বমানবতার রক্ষাকারী হিসাবে সকলের কাছে নমস্য। আসলে ধর্মের কথা বলে এই সংকটকালে সমাজের মানুষের মধ্যে কুসংস্কার ছড়ানো ঠিক হবে না। এতে করে সরকারি কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই মহামারি নির্মূলের জন্য বিজ্ঞান আমাদেরকে পথ দেখাবে। এখন আমাদের কর্তব্য হলো,সাধারণ মানুষকে বৈজ্ঞানিক ভাবে স্বাস্থ্য বিধি সম্পর্কে সচেতন করা।