করোনা : টিকাই একমাত্র সমাধান

27

উন্নত বিশ্বে গণটিকার মাধ্যমে ফিরেছে অর্থনীতি ও জীবনের গতি, পিছিয়ে বাংলাদেশ
সমীকরণ প্রতিবেদন:
মহামারির মধ্যেই লন্ডনে হয়ে গেল ইউরোপের দেশগুলোর ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ ইউরো কাপের ফাইনাল। স্টেডিয়ামের কোনো আসন খালি ছিল না। দর্শকদের মাস্ক বাধ্যতামূলক ছিল না। সামাজিক দূরত্বের স্বাস্থ্যবিধির প্রয়োজনও ছিল না। এর সবই সম্ভব হয়েছে করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার কারণে। শুধু লন্ডন নয়, ইউরোপের ১১টি দেশে হয়েছে এই ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। সব স্টেডিয়ামেই ছিল দর্শক। শুধু খেলাই নয়, টিকা দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড স্বাভাবিক করে ফেলেছে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাষ্ট্র। এসব দেশে গণটিকার মাধ্যমে ইতিমধ্যে ফিরেছে জীবনের গতি, ঘুরেছে অর্থনীতির চাকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই বলছেন, মহামারী থেকে বাঁচতে টিকাই একমাত্র সমাধান। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক টিকা দেওয়া শেষে তারা উঠিয়ে নিচ্ছেন মাস্ক পরার বাধ্যবাধকতা। তবে এখনো টিকাদানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বিশ্বের গড় টিকার চেয়েও পিছিয়ে আছে। বিশ্বে গড়ে ১২.১% মানুষকে সম্পূর্ণ ডোজের টিকা দেওয়া শেষ হয়েছে, বাংলাদেশে এখনো মাত্র ২.৬% টিকা দেওয়া হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ইন ডাটার তথ্যানুসারে, বিশ্বে ১১ জুলাই পর্যন্ত মোট ৩৪২ কোটি ডোজ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ ডোজ দেওয়া হয়েছে ৯৪ কোটি মানুষকে। সবচেয়ে বেশি টিকা দেওয়া হয়েছে চীনে ১৩৮ কোটি ডোজ। চীনে সম্পূর্ণ ডোজ দেওয়া হয়েছে ২২ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভারতে ৩৭ কোটি ৭০ লাখ ডোজ দেওয়া হয়েছে। ভারতে সম্পূর্ণ ডোজ দেওয়া হয়েছে ৭ কোটি ৩৩ লাখ মানুষকে। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে তৃতীয় সর্বোচ্চ স্থানে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টিকা দেওয়া হয়েছে ৩৩ কোটি ৪০ লাখ। সম্পূর্ণ ডোজ দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষকে। এরপর চতুর্থ অবস্থানে থাকা ব্রাজিলে টিকা দেওয়া হয়েছে ১১ কোটি ৪০ লাখ, সম্পূর্ণ ডোজ ৩ কোটি ৬ লাখ। পঞ্চম অবস্থানে থাকা জার্মানিতে ডোজ দেওয়া হয়েছে ৮ কোটি ১৯ লাখ, সম্পূর্ণ ডোজ দেওয়া হয়েছে ৩ কোটি ৫৪ লাখ মানুষকে। ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্যে মোট ডোজ দেওয়া হয়েছে ৮ কোটি ৬ লাখ, সম্পূর্ণ ডোজ পেয়েছে ৩ কোটি ৪৮ লাখ মানুষ। এরপর সপ্তম স্থানে থাকা জাপানে মোট ৬ কোটি ৩ লাখ ডোজ দেওয়া হয়েছে, এরমধ্যে সম্পূর্ণ ডোজ পেয়েছে ২ কোটি ২৭ লাখ মানুষ। অষ্টম স্থানে থাকা ফ্রান্সে মোট ডোজ দেওয়া হয়েছে ৫ কোটি ৯১ লাখ, সম্পূর্ণ ডোজ পেয়েছে ২ কোটি ৪৪ লাখ মানুষ। নবম স্থানে থাকা তুরস্ক মোট ডোজ দিয়েছে ৫ কোটি ৮২ লাখ, সম্পূর্ণ ডোজ দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৭৪ লাখ মানুষকে। দশম স্থানে থাকা ইতালিতে মোট ডোজ দেওয়া হয়েছে ৫ কোটি ৭৬ লাখ, সম্পূর্ণ ডোজ দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে। এ ছাড়া ৫ কোটির বেশি ডোজ টিকা দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও মেক্সিকো। ইন্দোনেশিয়ায় সম্পূর্ণ ডোজ পেয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ এবং মেক্সিকোতে সম্পূর্ণ ডোজ দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ৭ লাখ মানুষকে। ৪ কোটির বেশি ডোজ টিকা দিয়েছে রাশিয়া, স্পেন ও কানাডা। রাশিয়ায় মোট ডোজ ৪ কোটি ৭৬ লাখ, সম্পূর্ণ ডোজ ১ কোটি ৮৯ লাখ। স্পেনে মোট ডোজ ৪ কোটি ৬৬ লাখ, সম্পূর্ণ ডোজ ২ কোটি ১০ লাখ। কানাডা মোট ডোজ দিয়েছে ৪ কোটি ২৫ লাখ, সম্পূর্ণ ডোজ পেয়েছে ১ কোটি ৬৩ লাখ মানুষ। ৩ কোটি ১৫ লাখ ডোজ টিকা দেওয়া পোল্যান্ড সম্পূর্ণ ডোজ দিয়েছে ১ কোটি ৫২ লাখ। এর বাইরে ২ কোটির বেশি ডোজ টিকা দিয়েছে আর্জেন্টিনা, চিলি, কলম্বিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া। প্রায় ২ কোটি ডোজ টিকা দিয়েছে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও মরক্কো। দেড় কোটি ডোজ টিকা দেওয়া দেশের তালিকায় আছে নেদারল্যান্ডস ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, করোনা প্রতিরোধের অন্যতম উপায় গণটিকাদান। এতে মানুষের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে এবং করোনার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। তবে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তুলতে মোট জনগোষ্ঠীর কমপক্ষে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে। অবশ্য পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশ ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ওপর টিকা প্রয়োগ শেষে তাদের জনগণকে মাস্ক পরতে আর বাধ্য করছে না। সেসব স্থানে স্বাভাবিক জীবনে কোনো বাধা তৈরি করা হচ্ছে না। তাই মোট টিকাদানের সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে মোট কত শতাংশকে টিকা দেওয়া হলো।
ওয়ার্ল্ড ইন ডাটার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দেশগুলোর চেয়ে কম জনসংখ্যার দেশগুলো সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। ক্ষুদ্র দীপ রাষ্ট্রগুলোর বাইরে সবচেয়ে বেশি ৬৬ দশমিক ৬ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এরপর ক্রমান্বয়ে তালিকায় আছে বাহরাইন ৬২.৩%, চিলি ৫৯.৭%, ইসরায়েল ৫৭.৪%, উরুগুয়ে ৫৫.৪%, কাতার ৫৪.৬%, হাঙ্গেরি ৫৩%, যুক্তরাজ্য ৫২.২%, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৪৮.৫%, স্পেন ৪৪.৭%, কানাডা ৪৩.৪%, জার্মানি ৪২.৭%, অস্ট্রিয়া ৪২.১%, আয়ারল্যান্ড ৪১.৫%, বেলজিয়াম ৪০.১%, সুইজারল্যান্ড ৪০.১%, ডেনমার্ক ৪০.১%, পোল্যান্ড ৪০%। ইতিমধ্যেই ৩০ শতাংশের বেশি টিকা দেওয়ার তালিকায় আছে- সিঙ্গাপুর ৩৯.৮%, গ্রিস ৩৯.৭%, পর্তুগাল ৩৮.৯%, নেদারল্যান্ডস ৩৮.৮%, ইতালি ৩৮.২%, সার্বিয়া ৩৭.৩%, ফ্রান্স ৩৬.৪%, চেক প্রজাতন্ত্র ৩৬%, সুইডেন ৩৪.৮%, ক্রোয়েশিয়া ৩১.০%। অনেক বেশি টিকা দিয়েও শতাংশের হিসেবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক ২১.২%, জাপান ১৭.৯%, মেক্সিকো ১৬.৩%, ব্রাজিল ১৪.৫%, রাশিয়া ১৩.১%, দক্ষিণ কোরিয়া ১১.৪%, ইন্দোনেশিয়া ৫.৫% ও ভারত ৫.৪%।
বাংলাদেশের অবস্থান: বিশ্বের গড় সম্পূর্ণ ডোজের টিকাপ্রাপ্ত মানুষের হার ১২.১ %। সেখানে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ টিকা পাওয়ার হার ২.৬%। ১১ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ১ কোটি ১ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এরমধ্যে সম্পূর্ণ ডোজ পেয়েছে ৪২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে টিকা দেওয়ার শতাংশের হারে এগিয়ে আছে শ্রীলঙ্কা ও নেপাল। টিকার ডোজের সংখ্যায় এগিয়ে আছে ভারত ও পাকিস্তান। টিকার শতাংশের হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে আছে মিয়ানমার, পূর্ব তিমুর, গিনি, রুয়ান্ডার মতো দেশগুলো। অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরের মতে, করোনার প্রভাব সারা বিশ্বের অর্থনীতিতেই পড়েছে। অনেকেই কাটিয়ে উঠেছে, অনেকে পারেনি। আসলে মানুষকে টিকা না দিয়ে প্রবৃদ্ধির কথা বলে লাভ নেই। মানুষকে টিকা দিতে পারলে করোনা আতঙ্ক কমে যাবে। সব স্বাভাবিক হবে।