করোনা ও উপসর্গে চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহে আরও ১৪ জনের মৃত্যু

16

ভয়াবহ রুপে করোনা : মেহেরপুরে নতুন আক্রান্ত ৪৭ জন, চুয়াডাঙ্গায় শনাক্তের হার ১০০ শতাংশ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
করোনার প্রকোপ কমা দূরস্থান, বরং বেড়েই চলেছে। চুয়াডাঙ্গাসহ এর পাশ্ববর্তী জেলাগুলোতেও করোনা পরিস্থিতি দিনদিন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গতকাল চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহে করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গে মোট ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিস করোনা আক্রান্ত নতুন দুজনের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত করে। এনিয়ে জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯১ জনে। গতকাল সদর হাসপাতলের ইয়োলো জোনে মৃত্যু হয়েছে অন্য চারজনের। গতকাল জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ চুয়াডাঙ্গার ৪১টি নমুনা পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে। যার সবগুলো নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ১০০ শতাংশ। যা এ যাবতকালের সর্বোচ্চ শনাক্তের হারকেও হার মানিয়েছে। অন্যদিকে গতকাল শুধুমাত্র ঝিনাইদহে করোনা আক্রান্ত আটজনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে আরও ১১৭ জন। মেহেরপুরের করোনা পরিস্থিতিও দিনদিন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে জেলার ৯১টি নমুনা পরীক্ষা করে ৪৭ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়।
জানা যায়, গতকাল গতকাল চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ইয়োলো জোনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন- চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার লোকনাথপুর গ্রামের আরচুল ওয়াবের ছেলে রুহুল আমিন (৭৯), জীবননগর উপজেলার বাকা গ্রামের হাউস আলীর ছেলে আব্দুস সোবহান (৬০), দামুড়হুদা উপজেলার নতুন বাস্তুপুর গ্রামের মৃত তোয়াজ আলীর ছেলে আবু বক্কর (৭৫) ও দামুড়হুদা উপজেলার জগননাথপুর গ্রামের আব্দুর রহমানের স্ত্রী শাহিদা বেগম (৭০)।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম ফাতেহ আকরাম জানান, ‘গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় রুহুল আমিনকে করোনা উপসর্গ ঠাণ্ডা, জ্বরসহ হাসপাতালের ইয়োলো জোনে ভর্তি করে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ১১টা ৪০মিনিটের সময় তাঁর মৃত্যু হয় এবং গত ১৯ জুন আব্দুস সোবহানকে পরিবারের সদস্যরা করোনা উপসর্গ ঠাণ্ডা, জ্বর ও শ্বাসকষ্টসহ সদর হাসপাতলের ইয়োলো জোনে ভর্তি করে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর ১২টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। এছাড়াও রাত সাড়ে নয়টায় ইয়োলো জোনে দামুড়হুদা উপজেলার নতুন বাস্তুপুর গ্রামের মৃত তোয়াজ আলীর ছেলে আবু বক্কর (৭৫) ও রাত সোয়া ১০টায় দামুড়হুদা উপজেলার জগননাথপুর গ্রামের আব্দুর রহমানের স্ত্রী শাহিদা বেগমের (৭০) মৃত্যু হয়েছে। গতকাল ইয়োলো জোনে নিহত চারজনের লাশ করোনা প্রটোকলে পরিবারের সদস্যদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই তাঁদের দাফনকার্য সম্পন্ন করা হবে। মৃত্যুর আগেই করোনা পরীক্ষার জন্য তাঁদের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।’
গতকাল বুধবার চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য বিভাগ ৪১টি নমুনা পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে। এরমধে ৪১টি নমুনার ফলাফলই পজিটিভ এসেছে। নতুন আক্রান্ত ৪১ জনের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ১৯ জন, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ৭ জন, দামুড়হুদা উপজেলার ১ জন ও জীবননগর উপজেলার ১৪ জন। এনিয়ে জেলায় মোট করোনা আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৮৩৭ জন। আক্রান্তদের মধ্যে সদর উপজেলার ১ হাজার ৩১৭ জন, আলমডাঙ্গার ৪৬৩ জন, দামুড়হুদায় ৬৮৬ জন ও জীবননগরে ৩৭১ জন। গত বুধবার জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ করোনা পরীক্ষার জন্য ২৪২টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে প্রেরণ করে। গতকাল উক্ত নমুনা ও পূর্বের পেন্ডিং নমুনার মধ্যে কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে পরীক্ষাকৃত মোট ৪১টি নমুনার ফলাফল প্রকাশ করে জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ। এরমধ্যে ৪১ জনের করোনা ফলাফল পজিটিভ আসে।
এছাড়া গতকাল জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ করোনা পরীক্ষার জন্য আরও ২২৩টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে প্রেরণ করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে গতকালের ২২৩টি নমুনাসহ চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রেরণকৃত ৮৪৪টি নমুনার ফলাফল পেন্ডিং রয়েছে। গতকাল জেলা থেকে দামুড়হুদা উপজেলা থেকে ১৪ জন ও জীবননগর থেকে ১৫ জনসহ মোট ২৯ জন সুস্থ হয়েছে। এনিয়ে জেলায় মোট সুস্থ হয়েছেন ২ হাজার ৪৯ জন। এরমধ্যে সদর উপজেলার ১ হাজার ১১ জন, আলমডাঙ্গার ৩৫০ জন, দামুড়হুদার ৪৫৩ ও জীবননগরে ২৩৫ জন।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী জেলা থেকে এ পর্যন্ত মোট নমুনা সংগ্রহ ১২ হাজার ৫১২টি, প্রাপ্ত ফলাফল ১১ হাজার ৬৬৮টি, পজিটিভ ২ হাজার ৮৩৭ জন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গায় ৬৯৭ জন করোনাক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন। এরমধ্যে সদর উপজেলায় অবস্থানকালে আক্রান্ত হয়েছেন ২৭২ জন, আলমডাঙ্গায় ৯৪ জন, দামুড়হুদায় ২০৫ জন ও জীবননগরে ১২৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে বর্তমানে ৬৩৩ জন হোম আইসোলেশনে আছেন। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ২৪৯ জন, আলমডাঙ্গায় ৮৩ জন, দামুড়হুদায় ১৮৪ জন ও জীবননগরে ১১৭ জন। প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে আছেন সদর উপজেলার ২৩ জন, আলমডাঙ্গার ১০ জন, দামুড়হুদার ১৯ জন ও জীবননগরের ৯ জন জনসহ মোট ৬১ জন। চুয়াডাঙ্গায় করোনা আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ৯১ জনের। এরমধ্যে সদর উপজেলার ২৯ জন, আলমডাঙ্গায় ১৮ জন, দামুড়হুদায় ২৫ জন ও জীবননগরে ৯ জনসহ ৮১ জন। চুয়াডাঙ্গায় আক্রান্ত অন্য ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে জেলার বাইরে। উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলার বাইরে চিকিৎসাধীন রয়েছে অন্য ৩ জন।
মেহেরপুর:
মেহেরপুরে নতুন করে আরও ৪৭ জন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে সদর উপজেলায় ২৯ জন, গাংনীতে ১১ জন এবং মুজিবনগরে ৭ জন। গতকাল বুধবার রাতে মেহেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. নাসির উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। সূত্রে আরও জানা গেছে, নতুন প্রাপ্ত রিপোর্ট ৯১টি। তারমধ্যে ৪৭ জন করোনা পজিটিভ। এনিয়ে বর্তমানে মেহেরপুর জেলায় করোনা পজিটিভের সংখ্যা ৩৫৫ জন। তার মধ্যে সদরে ১৪২ জন, গাংনীতে ১৩৫ জন এবং মুজিবনগরে ৭৮ জন। এ পর্যন্ত মেহেরপুরে মারা গেছেন ৩৭ জন। সদর ১৩, গাংনী ১৫ এবং মুজিবনগরে ৯ জন। এসময় তিনি সবাইকে সামাজিক দূরত্ব, নিয়মিত সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোবার অভ্যাস, মাস্ক ব্যবহার, জনসমাগম এড়িয়ে এবং হাঁচি-কাঁশির শিষ্টাচার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান।
ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহে করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ১১৭ জন। সিভিল সার্জন ডা. সেলিনা বেগম জানান, বুধবার সকালে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহে ল্যাব পরীক্ষা করা ২২৭টি নমুন পরীক্ষার ফলাফলে ১১৭ জনের ফলাফল পজিটিভ এসেছে। আক্রান্তের হার ৫১ দশমিক ৫৪ ভাগ। এনিয়ে জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৩ হাজার ৬৩৮ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের করোনা ইউনিট ও বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৮ জন। এদের মধ্যে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ৪ জন, হরিণাকুণ্ডু উপজেলার রহিমপুর গ্রামে একজন, শৈলকুপার বাগুটিয়া গ্রামে একজন, মহেশপুর উপজেলার আজমপুর গ্রামে একজন ও কোটচাঁদপুর উপজেলার মায়াধরপুর গ্রামে একজন রয়েছে। এনিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৭৯ জনে।
এদিকে, করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে জেলায় শুরু হয়েছে লকডাউন। প্রথম দিনে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে ব্যাপক তৎপর দেখা যায়। শহরের দোকানপাট বন্ধ থাকলেও আড়ালে-আবডালে ইজিবাইক, রিকশা ও নছিমন করিমন চলতে দেখা গেছে। লকডাউন কার্যকরে শহরের বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট ও অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত। করোনার ভয়াবহতার মাঝেও অনেক ব্যবসায়ী তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ ঘুরঘুর করতে দেখা গেছে।