করোনায় দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে দ্বিগুণ

65

সমীকরণ প্রতিবেদন:
মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশে দারিদ্যের হার দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বর্তমানে দেশে দারিদ্যের হার ৪২ শতাংশ। ২০১৮ সালে যা ছিল ২১ দশমিক ৬ শতাংশ। দেশের বর্তমান দারিদ্র্যের হার আবার শহরের থেকে গ্রামীণ অঞ্চলে বেশি প্রকট। শহর অঞ্চলে এই হার ৩৫ শতাংশ হলেও গ্রাম অঞ্চলে এই হার ৪৫ শতাংশ। করোনার সময়ে এই দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। কারণ মানুষ এই সময় আয় করতে পারেনি। ৫৬ ভাগ পরিবারের আয় কমে গেছে। এই সময়ে দরিদ্রতার পাশাপাশি ‘লার্নিং পভার্টি’ (শিক্ষা দারিদ্র্য) বৃদ্ধির কারণ কোভিডে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বলা হচ্ছে, দেশে রেমিট্যান্সের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু করোনার সময়ে ৮২ ভাগ পরিবার বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স কম পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
গতকাল শনিবার ‘দারিদ্র্য ও জীবিকার ওপর কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব : সানেমের দেশব্যাপী জরিপের ফলাফল’ শিরোনামের একটি ওয়েবিনারে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। দেশব্যাপী এই জরিপটি ২০২০ সালের ২ নভেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয়। ওয়েবিনারে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। ওয়েবিনারে আলোচক হিসেবে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান এবং অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
ড. সেলিম রায়হান বলেন, এই জরিপের মূল উদ্দেশ্য ছিল কোভিড পূর্ববর্তী সময়ের সাথে কোভিড পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া। ২০১৮ সালে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সাথে সানেমের করা জরিপের মধ্যে থেকে ৫৫৭৭টি খানার ওপর এই জরিপটি ফোনকলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
জরিপে পাওয়া গিয়েছে যে করোনাকালীন সার্বিক দারিদ্র্যের হার (আপার পোভার্টি রেট) বেড়ে হয়েছে ৪২ শতাংশ, ২০১৮ সালে জিইডি-সানেমের জরিপে যা ছিল ২১.৬ শতাংশ এবং ২০১৬ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা জরিপ অনুসারে ২৪.৩ শতাংশ। বিবিএসের খানা জরিপ অনুসারে ২০১৬ সালে গ্রামাঞ্চলের সার্বিক দারিদ্র্য ছিল ২৬.৪ শতাংশ, ২০১৮ সালের জিইডি সানেম জরিপ অনুসারে যা ছিল ২৪.৫ শতাংশ, করোনাকালীন ২০২০ সালে এই হার বেড়ে হয়েছে ৪৫.৩ শতাংশ। শহরাঞ্চলে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৮.৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ছিল ১৬.৩ শতাংশ আর করোনাকালীন ২০২০ সালে এই হার বেড়ে হয়েছে ৩৫.৪ শতাংশ। বেসরকারি এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে উল্লেখ করা হয়, চরম দারিদ্র্যের হারের (লোয়ার পোভার্টি রেট) ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে বিবিএসের খানা জরিপ অনুসারে এই হার ছিল জাতীয়ভাবে ১২.৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে জিইডি-সানেম জরিপ অনুসারে ৯.৪ শতাংশ, তবে ২০২০ সালে মহামারীর প্রভাবে এই হার বেড়ে হয়েছে ২৮.৫ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৪.৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ১১.২ শতাংশ এবং মহামারীর সময়ে ২০২০ সালে গ্রামাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ৩৩.২ শতাংশ। শহরাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ৭.৬ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৬.১ শতাংশ কিন্তু ২০২০ সালে বেড়ে হয়েছে ১৯ শতাংশ।
২০২০ সালে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বরিশালে ছিল ২৯.৩ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৩৫.১ শতাংশ, ঢাকায় ৩৮.৪ শতাংশ, খুলনায় ৪১.৮ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৪৬.২ শতাংশ, রাজশাহীতে ৫৫.৫ শতাংশ, রংপুরে ৫৭.৩ শতাংশ এবং সিলেটে ৩৫ শতাংশ। সেলিম রায়হান বলেন, প্রাক-কোভিড এবং কোভিড পরবর্তী পরিস্থিতিতে জাতীয় পর্যায়ে অসমতার তুলনা করার জন্য গিনি সহগ ব্যবহার করা হয়েছে। গিনি সহগ ২০১৬ সালের ০.৩২ থেকে কমে ২০১৮ সালে ০.৩১ এবং ২০২০-এ আবার বেড়ে ০.৩২ এ পরিণত হয়েছে। ধনীতম ৫% এবং দরিদ্রতম ২০% পরিবারের মধ্যে আয়ের ভাগের অনুপাত ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২.০৫%, এ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে নভেম্বর ২০২০-এ ২.৪৫-এ দাঁড়িয়েছে। একইভাবে ব্যয়ের ভাগের অনুপাত ২০১৮ সালের ১.৪৪ থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ২.১৫ হয়েছে। কারণ দুই বছরে ধনীতম ৫% পরিবারের ব্যয়ের ভাগ বেড়েছে ১.০২% এবং দরিদ্রতম ২০%-এর মধ্যে কমেছে ৩.১৩%। ২০১৮ এবং ২০২০ সালের মধ্যে মাথাপিছু গড় শিক্ষাব্যয় হ্রাস পেয়েছে, অতি দরিদ্র পরিবারের জন্য এই হার হ্রাস সবচেয়ে বেশি (৫৮%)। অন্য দিকে গড় মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়েছে, মধ্যম দরিদ্র (৯৭%) এবং অ-দরিদ্র (১০৪%) পরিবারের জন্য এটি সবচেয়ে বেশি। এই গবেষণায় অনলাইন (টিভি, ইন্টারনেট ইত্যাদি) শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও পর্যালোচনা করা হয়। গ্রামাঞ্চলের ১৯% শিক্ষার্থী এবং শহরাঞ্চলের ২৭% শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষায় অংশ নিতে পেরেছে। অনলাইন শিক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৫% দরিদ্র পরিবারের এবং ২৬% অ-দরিদ্র পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। উত্তরদাতারা অনলাইন শিক্ষায় অংশ নিতে না পারার কারণ হিসাবে অনলাইন ক্লাসের অপ্রাপ্যতা (৪৯.১%), প্রয়োজনীয় ডিভাইসের অপ্রাপ্যতা (৬.১%), ডিভাইসের অপ্রতুলতা (৫.৩%), ইন্টারনেট সংযোগের অপর্যাপ্ততা (৫.৪%), ইন্টারনেট সংযোগের ব্যয় বহন করতে অক্ষমতার (৬.৫%) কথা উল্লেখ করেছেন ।
মহামারীর ফলে কাজ হারানো, পারিশ্রমিক না পাওয়া, কর্মক্ষেত্র বন্ধ হওয়াসহ বিভিন্ন কর্মসংস্থান-সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কেবল ১৭.৩% পরিবারের দাবি ছিল যে তাদের সদস্যরা আগের মতো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে পেরেছে। ৫৫.৯% পরিবার দাবি করেছেন যে কাজ থাকা সত্ত্বেও তাদের আয় হ্রাস পেয়েছে, ৮.৬% দাবি করেছে যে তারা কাজ হারিয়েছে, ৭% এর কাজের সময় হ্রাস পেয়েছে এবং ৩৩.২% বলেছে যে তাদের কাজ শুরু হওয়ার পরে কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থেকে আবার শুরু হয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যে, সব ধরনের কর্মসংস্থানে গড় আয় হ্রাস পেয়েছে, যা স্ব-নিযুক্তদের জন্য ৩২%, বেতনভিত্তিক কর্মীদের জন্য ২৩%, দিনমজুরের জন্য ২৯% এবং অন্যদের জন্য ৩৫%। সঙ্কটের মোকাবেলার জন্য তারা বিভিন্ন ধরনের কৌশল অবলম্বল করেছে। ৪৮.৭২% ঋণ নিয়েছে, ৩২.৪% সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরশীল, ২৭.৩৩% খাদ্য-ব্যয় কমিয়েছে, ২৭.০২% তাদের খাদ্যতালিকায় অনিচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে এবং ১৬.৬৭% বন্ধু / আত্মীয়ের কাছ থেকে অনুদান নিয়েছেন। ২০২০ সালের মার্চ থেকে প্রথম কোয়ান্টাইলের পরিবারগুলোর মধ্যে ৩২.৯% বেসরকারি সংস্থা থেকে সহায়তা পেয়েছে, ২২.৯১% সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি থেকে সুবিধা পেয়েছে। ৪র্থ কোয়ান্টাইলের পরিবারের মধ্যে এই সংখ্যাটি যথাক্রমে ২৪% ও ১৫.৫৪%। সামগ্রিকভাবে ২২.১% পরিবার জনসাধারণের জন্য গৃহীত পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট হিসাবে মনে করেছে এবং ২৭.২% তাদের সঙ্কট পরবর্তী পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। গবেষণায় রেমিট্যান্স আয়ের একটি বৈপরীত্যও তুলে ধরা হয়েছে। ম্যাক্রো-স্তরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেলেও, পারিবারিক পর্যায়ে অভিবাসী সদস্যদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। ৮২.০৫% পরিবার দাবি করেছেন যে তারা বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স কম পেয়েছেন এবং দেশের অভ্যন্তরের মাইগ্রেশনের ক্ষেত্রে ৬৪% দাবি করেছেন যে তারা মহামারীর আগে যা পাচ্ছিলেন তার তুলনায় কম পেয়েছেন। এই প্যারাডক্সের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো মহামারীর আগে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে রেমিট্যান্স আসছিল। যেহেতু এই চ্যানেলগুলো অবরুদ্ধ করা হয়েছে, তাই পরিবারগুলো আগের তুলনায় কম অর্থ পেয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. এম এম আকাশ বলেন, কোভিডের কারণে যে ক্ষতি হলো এটি কি স্বল্পমেয়াদি, নাকি এত বছরের অগ্রগতির ওপরে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ল, সেটি ব্যাখ্যার বিষয়। এটি নির্ভর করবে ক্ষতির ধরন কেমন, কোন খাত কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সরকার যে জরুরি পদক্ষেপ নিলো তা কতটুকু পর্যাপ্ত তার ওপর। আয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে (আল্টা রিচ) যারা আছেন তাদের বিষয়েও গবেষণা হওয়া দরকার যা দেশব্যাপী জরিপে সাধারণত উঠে আসে না। খাদ্য-বহির্ভূত ব্যয় কমে গেছে, কোন খাতে কতটুকু সেই অনুপাত জানা প্রয়োজন। মোকাবেলার ধরন যেমন ধার নেয়া, সঞ্চয় ব্যয় করা ইত্যাদির সঠিক পরিমাণ জানা গেলে আরো ভালো হতো। দেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে পুনোরুদ্ধারের জন্য শিক্ষা খাতকে যত দ্রুত সম্ভব চালু করতে হবে, স্বাস্থ্য খাতে ভর্তুকি দিতে হবে, কর্মসংস্থানের পরিবর্তনগুলো স্বীকার করে ব্যবস্থা নিতে হবে।