চুয়াডাঙ্গা বৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল ২০২০
আজকের সর্বশেষ সবখবর

করোনায় কুসংস্কার নয়, মানবিকতা জরুরি

সমীকরণ প্রতিবেদন
এপ্রিল ১৬, ২০২০ ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

মেহেরাব্বিন সানভী:
সারা বিশ্ব আজ করোনাভাইরাসের জন্য আতঙ্কিত। হবেই বা না কেন, কথায় আছে ‘রোগ থাকলে রোগের ওষুধও আছে’ কিন্তু অজানা এ করোনাভাইরাসের সঠিক ওষুধ আবিষ্কার হয়নি এখনো। এ নিয়ে তাই মানুষ উদ্বিগ্নও কম নয়। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও সেই বহু বছর আগের কুসংস্কার যদি আমাদের মধ্যে থাকে, তাহলে কীভাবে হবে? আবার কবে আবার কুসংস্কার মুক্ত হব। করোনাভাইরাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংক্রমণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে যতটা না সংক্রমণ, তার থেকে হাজার গুণে বেশি কুসংস্কার। উচ্চশিক্ষিত থেকে শুরু করে বহু মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়তই জাগছে নানা প্রকার কুসংস্কার। হাজার রকম কুসংস্কারের মধ্যে সব থেকে ভয়ঙ্কর হচ্ছে করোনা উপসর্গ, যেমন সর্দি, কাঁশি বা কেউ অসুস্থ হলে কিংবা মৃত্যুবরণ করলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করে সেই পরিবারকে কার্যত একঘরে করে দেওয়ার প্রবণতা।
চুয়াডাঙ্গায় গত ১২ মার্চ ইতালি থেকে দেশে ফেরেন আলমডাঙ্গার আসাদুলের ছেলে সাব্বির। পরদিন তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। এরপর ১৬ মার্চ সাব্বির সন্দেহভাজন করোনা রোগী হিসেবে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসে তাঁর। ১৪ দিন আইসোলেশনে থাকার পর তাঁর রিপোর্ট নেগেটিভ এলে পুরোপুরি সুস্থ ঘোষণা দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেয়। যথারীতি সাব্বিরের সংস্পর্শে আশা তাঁর পিতা ছিলেন হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা ছিলেন হোম কোয়ারেন্টাইনে। পরীক্ষায় তাঁর পরিবারের কারো করোনার পজিটিভ রিপোর্ট আসেনি। সাব্বিরসহ সবাই এখন সুস্থ হলেও মানসিকভাবে প্রচণ্ড অসুস্থ। এক কুসংস্কার তাঁর প্রতিবেশী, আত্মীয়সহ সবাইকে গ্রাস করেছে। ছোঁয়া যাবে না, তাঁদের সঙ্গে কথা বলা যাবে না, এক কথায় একঘরে অবস্থা।
সাব্বিরের পিতা আসাদুল ইসলাম বলেন, পরিবেশটা এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি। প্রতিবেশীদের আচরণ খুব একটা ভালো না। আগের মতো কেউ ভালো করে কথা বলে না। আবার নিকট আত্মীয়রাও সাব্বিরের সুস্থ হওয়ার পরেও বাড়িতে আসেনি। তিনি বলেন, ‘যখন সাব্বির আইসোলেশনে এবং আমি প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে ছিলাম, তখন আমার পরিবারের মুখ পর্যন্ত কেউ দেখতে চাইনি। একপ্রকার একঘরে অবস্থা। মানসিকভাবে পরিবারের সদস্যরা ভেঙে পড়েছিল।’
শুধুমাত্র সাব্বিরের পরিবারের ওপর নয়, এরকম কুসংস্কারে আচ্ছাদিত অনেক মানুষের কারণে সমাজে হেয় হতে হচ্ছে সাধারণভাবে মারা যাওয়া মানুষকেও। পার্শ্ববর্তী জেলা ঝিনাইদহে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি মারা গেলে এলাকার মানুষেরা তাঁর জানাজা পড়াতে চায়নি। শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানাজা পড়ান আর পুলিশ দাফনকার্য সম্পন্ন করে। এরকম ঘটনা এখন ঘটছে অহরহ।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আবদুল মোমিন রনি আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘বিদেশ এসে কোয়ারেন্টাইন পূর্ণ করা বা রিপোর্ট নেগেটিভ আসা সত্ত্বেও অনেককেই এখন অন্য চোখে দেখা হচ্ছে। চীনের উহান থেকে ৩১২ জন বাংলাদেশিকে দেশে এনে কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছে। তাঁরা সবাই নিরাপদ অবস্থায় সেখান থেকে ফিরেছেন। অথচ নিজ দেশে তাঁদের অনেককেই সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে।’ চিকিৎসকসহ ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছে, ‘আমরা এগোচ্ছি না, পেছাচ্ছি। এই সমাজ এখনও সচেতন নয়, কবে সচেতন হবে?’
চীনফেরত ৩১২ জনের মধ্যে এক দম্পতি সেখানে গিয়েছিলেন পিএইডি করার জন্য। ছুটিতে ঢাকায় এসেছেন। তাঁদের একজন রোকাইয়া সুলতানা (ছদ্মনাম) একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘তিন-চার মাস পরপর ঢাকায় এলে আমরা বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকি। যে রাতে আমাদের হজক্যাম্প থেকে ছেড়ে দিল, সে রাতে বাড়িওয়ালা আমাদের ফোন করে বলল, ‘আপনারা বাসায় উঠতে পারবেন না।’ ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার পর এমন ফোন পেয়ে ভীষণ শকড হই। ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনের পর বাসায় যাওয়ার জন্য উদগ্রীব ছিলাম। অথচ বাড়িওয়ালা শুধু আমাদেরই ফোন করেননি, এলাকার কমিশনারকে ফোন করে বলেছেন, আমরা যেন বাসায় না উঠি। আমাদের থেকে ছড়াতে পারে। ওই রাতে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না, কোথায় যাব। পরদিন সকাল ছয়টায় এক বিভাগীয় শহরে যাওয়ার ফ্লাইট ছিল। ঢাকার আত্মীয়দের ফোন করলাম, তাঁদের বাসায় যাওয়ার জন্য। ‘আসতে পারেন, সমস্যা নেই।’ বললেও, পরে তাঁদের ফোনও বন্ধ পাই। অন্যদিকে বাড়িওয়ালা বলছিলেন, আমাদের আসার কথা শুনে অন্য ভাড়াটিয়ারা রিঅ্যাক্ট করেছেন, অভিযোগ করেছেন। পরে বাড়িওয়ালাকে অনেক বোঝালাম যে, আমরা বাসাতেই থাকব, বাসা থেকে বের হব না। অনেক অনেক করে বোঝানোর পর তিনি রাজি হলেন।’
আরেক বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথাও জানান রোকাইয়া। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাসায় যে গৃহকর্মী আছেন, তিনি অন্য যে বাসাগুলোতে কাজ করেন, তাঁরা নিষেধ করেছেন এ বাসায় আসতে। তাকে বলেছেন, তিনি এ বাসায় এলে করোনা হবে, আর তাঁর থেকে তাঁরাও আক্রান্ত হবেন। অথচ তাঁদের পরিবারটি শিক্ষিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সেই পরিবারের মানুষরাও গৃহকর্মীকে বলেছেন, এ বাসায় এলে তিনি ওই বাসায় যেতে পারবেন না। কিন্তু গৃহকর্মীর সঙ্গে আমার অনেক দিনের সম্পর্ক। তিনি লুকিয়ে এসেছিলেন আমাকে দেখতে। এই খবর জানার পর তাঁকে কাজে যেতে নিষেধ করে দিয়েছেন ওই শিক্ষকের গৃহে। যে শিক্ষক এই কাজ করেন, তিনি সমাজে কবে শিক্ষিত হবেন? আর যারা কাছের মানুষ, তারা কেউ একবারের জন্যও আমাকে দেখতে আসেনি। ফোনেও যোগাযোগ করেনি। এর আগে যখনই এসেছি, বাসায় একটু রেস্টও নিতে পারতাম না। তারা বাসায় আসার জন্য অস্থির হয়ে যেতেন! আমি কোথাও যাইনি, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করিনি, অথচ কতদিন পর নিজের এলাকাতে এসেছি।’
এই পরিস্থিতি সম্পর্কে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা প্রেস বিফ্রিং এ কুসংস্কারে আছন্ন না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, ‘যেকোনও রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় গুজব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি মোকাবিলায় প্রতিদিন আইইডিসিআর এই সংবাদ সম্মেলন করছে, যাতে সঠিক তথ্য মানুষের কাছে যায়, মানুষ যেন বিভ্রান্ত না হয়। আইইডিসিআরের হটলাইনে প্রতিদিন ফোন আসে, তার মধ্যে বেশির ভাগই আসছে কোভিড-১৯ নিয়ে। এখন এই কলের অনেকটা অংশজুড়েই এসব বিভ্রান্তিমূলক প্রশ্নের জবাব দেওয়া হচ্ছে।’ অধ্যাপক সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জায়গায় অতি উৎসাহী লোকজনের বাড়াবাড়ি বিভিন্ন কার্যক্রমে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।’ সবাই সামাজিকভাবে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে জানিয়ে অধ্যাপক সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘এসব হয়রানির ভয়ে অনেকে আমাদের কাছে আসছেও না। এটিই এখন সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয়। কারণ, কারও মধ্যে যদি লক্ষণ-উপসর্গ থাকে, আর তিনি যদি সময়মতো আমাদের কাছে না আসেন, তাহলে তিনি এর উৎস হবেন। তাঁর মাধ্যমে ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি একটি স্থলবন্দরে একজন সরকারি কর্মকর্তা একজন মানুষের অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য কোনও রকম যাচাই না করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিলেন এবং তাঁকে আক্রান্ত বলে দিলেন, অথচ ওই ব্যক্তি আক্রান্ত ছিলেন না। ওই কর্মকর্তা যেটা করেছেন, তা শুধু আমাদের বিব্রত করেনি, সেই মানুষটিকেও সামাজিকভাবে হেয় করার বা হেনস্থা করার মতো একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।’
এদিকে, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘চীন থেকে যেই বাংলাদেশিরা এসেছেন, তাঁদের যদি ঠিকমতো গ্রহণ না করি, তাহলে আমাদের ১০০-১৫০ বছর আগের দিনে ফিরে যেতে হবে। তখন গুটিবসন্ত, কলেরাতে আক্রান্তদের নদীর পাড়ে, নির্জন স্থানে ফেলে রেখে আসত। আমরা তো সেই যুগে ফিরে যেতে পারি না। কিন্তু কোভিড-১৯ এসে দেখাল, আমরা আসলে এগোচ্ছি না। সংশ্লিষ্ট ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের চাইতে আমরা বেশি বুঝে ফেলছি।’
যে মানুষগুলোর সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, তারা সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে যাচ্ছে, যেন তাঁরা অচ্ছুত। এই বিষয়গুলো তাদের মনে দাগ ফেলবে, যেটা পুরো জীবনে প্রভাব ফেলবে। অথচ কেউ যদি প্রকৃতপক্ষেই কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হন, তাহলে তখনও তার সঙ্গে আমরা এটা করতে পারি না। এ রিজেকশন থেকে মানুষ আগ্রাসী হয়। এর কুফল কিন্তু ছোট না, অনেক লম্বা। এই কঠিন সময়ে আমাদের প্রয়োজন কুসংস্কারমুক্ত থাকা। একে অপরের সহযোগিতা করা।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।