করোনার মধ্যেই চুয়াডাঙ্গায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি, নেই পদক্ষেপ!

145

মেহেরাব্বিন সানভী:
চার দিকে সবার মধ্যে করোনাভাইরাস থেকে কীভাবে বাঁচা যাবে, সেই প্রস্তুতি। কিন্তু করোনার এই প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই উঁকি দিচ্ছে ডেঙ্গুর আশঙ্কা। এদিকে যেন কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা নামমাত্র কয়েক স্থানে দু-একবার স্প্রে করা ছাড়া মশা নিধনে এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। সাধারণ মানুষও তেমন সচেতন নন। লম্বা ছুটি আর লকডাউনের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ এখন গৃহবন্দি। সবাই এখন বাড়িতে থাকায় করোনা আতঙ্কের পাশাপাশি আরেক আতঙ্ক মশা দ্বারা তৈরি হয়েছে। এপ্রিল থেকে জুলাই মাস মশার বিস্তারের সময় হওয়ায় অধিক পরিমাণে মশা বেড়েছে। দু-এক দিন পর পর বৃষ্টি হওয়ায় আগে থেকে পেড়ে রাখা মশার ডিম থেকে লার্ভা তৈরি হয়ে মশা বেড়েছে আরও কয়েকগুণে।
২০১৯ সালে দেশে রেকর্ড সংখ্যক এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রায় ৩ শ জন রোগী মারা যান। এবারও বছরের শুরু থেকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছিল। তবে করোনা আতঙ্কে অনেকেই এখন তেমন আর হাসপাতালে আসছেন না। এদিকে, এখন যেহেতু মাঝে মাঝেই বৃষ্টি হচ্ছে, আবহাওয়া বদলাচ্ছে, তাই শুষ্ক স্থানে আগে থেকে পেড়ে রাখা এডিস মশার ডিম থেকে লার্ভা হওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হচ্ছে প্রকৃতিতে। এ জন্য করোনার ডামাডোলের ভেতরেই এখন থেকেই এডিসসহ সব ধরনের মশা নিধন কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। না হলে গতবারের চেয়েও পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
অপর দিকে, লকডাউন ও ছুটির কারণে মানুষ বাড়িতেই বেশিরভাগ সময় অবস্থান করছেন। বাড়িতে বেশিরভাগ সময় অবস্থান করায় মশার কামড় আর গুনগুন আওয়াজের শব্দ বেশি পরিমাণে শুনছেন তাঁরা। তা ছাড়া গত দুই মাসে মশার উপদ্রব বেড়েছে আগের থেকে অনেক বেশি। অনেকেরই অভিযোগ প্রথমত কাজ নেয়, তারওপর আবার মশার জন্য সারা দিন লাগছে কয়েল বা অ্যারোসল। তবে করোনার মধ্যে অর্থকষ্টে বেশিরভাগ মানুষই কয়েল বা অ্যারোসল ব্যবহার করতে পারছেন না। তাঁদের দাবি, অতিদ্রতই এ বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করার। করোনার মধ্যে যেন কোনোভাবেই মশা নতুন একটি আতঙ্ক না হয়ে ওঠে, সে জন্য মশা নিধনের কাজ আগে থেকেই করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালগুলোতে কোনো ডেঙ্গু রোগীর খোঁজ তেমন নেই। এর মানে এই না যে, ডেঙ্গু রোগে কেউ আক্রান্ত হচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে, করোনার ভয়ে কেউ ডেঙ্গু রোগের পরীক্ষা করাতেই হাসপাতালে যাচ্ছেন না। গত বছরের তুলনায় এই সময়টাতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। এর জন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। করোনা নিয়ে পড়ে থেকে মশার ব্যাপারে অনিহা করা যাবে না। এতে করোনা আর ডেঙ্গু নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার কোর্টপাড়ার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, মশার জন্য রাতের বেলা তো ঘুমানোই যাচ্ছে না, দিনের বেলাতেও বাসায় থাকা মুশকিল। এই করোনার সময় বাইরে বের হওয়ায় যাচ্ছে না। আবার ঘরেও থাকা যাচ্ছে না মশার জন্য। শেষ কবে মশার স্প্রে করা হয়েছে মনে নেই। পৌরসভার এই দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অবস্থা খারাপ হওয়ার আগে এটি দরকার।
চুয়াডাঙ্গা বাজার পাড়ার বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, এই করোনার মধ্যে বাইরে না গেলেও বাসায় মশা দেখলেই এখন ভয় লাগে। এডিস মশার বাহক নিয়ে ভয়ে আছি। পৌরসভা থেকে এক দিন স্প্রে করা হয়েছে। তবে তাতে মশা মরেছে কি না, সন্দেহ। বরঞ্চ বাইরের মশা ঘরের ভেতর এসেছে। তাই বেশি বেশি সব জায়গায় ভালো ওষুধ দিয়ে স্প্রে করতে হবে। যাতে মশা উড়ে না গিয়ে মারা যায়। সঙ্গে ড্রেনগুলোর ভেতরেও স্প্রে করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার আফসানা আলমগীর খান ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, যেহেতু ডেঙ্গু এবং করোনার লক্ষণ-উপসর্গ প্রায় এক, অর্থাৎ জ্বর নিয়েই রোগীরা আসছেন, কিন্তু করোনার ডায়াগনসিসে ডেঙ্গুর পরীক্ষা করা হচ্ছে না। তাই একে মাথায় রেখে দেশের সব সিভিল সার্জন অফিসে চিঠি দেওয়া হয়েছে, জ্বরের রোগী এলে যদি কোভিড-১৯ নেগেটিভ হয়, তাহলে ডেঙ্গু অথবা যেকোনও জ্বরের যেসব পরীক্ষা আছে তা যেন করা হয়।
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান জানান, ‘করোনা মোকাবিলায় ব্যস্ততার মধ্যেও আমি ডেঙ্গু প্রতিরোধের বিষয়ে পৌরসভার মেয়র সাহেবকে জানিয়েছি। এই সময় সাধারণত রোগী থাকার কথা, তবে করোনার কারণে রোগীর সংখ্যা কিছুটা কম। মূলত সব ধরনের রোগীই কম।’ তিনি আরও বলেন, ‘এমনিতেই করোনা নিয়ে অস্থির অবস্থা চলছে, এর মধ্যে যদি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বা মশার উৎস ধ্বংসে সঠিকভাবে কাজ করা না যায়, তবে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কাটবে না। পরিস্থিতি খুবই জটিল হয়ে উঠবে। তাই আমাদের সবাইকে এবার সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। পৌরসভার পাশাপশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজেকেও সচেতন হতে হবে।’
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শামীম কবির বলেন, করোনাভাইরাসের পাশাপাশি ডেঙ্গুকেও গুরুত্ব দিতে হবে। নয়তো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে। গত বছরের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। এ বছর যেন গত বছরের মতো না হয়, সে বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। ইতিমধ্যে ফেসবুকে দেখলাম, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা বেশ কয়েক স্থানে স্প্রে করেছে। তা ছাড়া মানুষকেও সচেতন হতে হবে। নিজের ঘরের আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। সন্ধ্যায় ঘরের দরজা-জানালা ভালোভাবে বন্ধ করতে হবে। এছাড়া মশার স্প্রে, কয়েল ব্যবহার করতে পারেন। ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। এখন দু-এক দিন পর বৃষ্টি হচ্ছে, তাই ফুলদানি, ফুলের টব, বালতি পরিষ্কার রাখতে হবে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গাতে ইতিমধ্যেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিধনের কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। মশার বিষয়টিকেও আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। করোনাভাইরাসের কারণে এখন সারা দেশেই একটা সংকটকালীন পরিস্থিতি। এই মুহূর্তে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। সবাইকেই সচেতন হতে হবে। আর মশা নিধনের জন্য আরও বেশি পরিমাণে কাজ করার বিষয়ে আমি মেয়র সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছি। অতিদ্রুতই মশা নিধনের কাজটি আরও বেশি জনবল এবং ওষুধ দিয়ে করা হবে।’
চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র ওবাইদুর রহমান চৌধুরী জিপু বলেন, ‘আমরা করোনাভাইরাস প্রতিরোধে জীবাণুনাশক স্প্রে ছেটানোর পাশাপাশি মশা নিধনেও ওষুধ ছিটাচ্ছি। ইতিমধ্যে পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে শহরের প্রধান প্রধান সড়কেও স্প্রে করা হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার কর্মচারীসহ আমি নিজে ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মচারীদের নিয়ে মশা নিধনে ওষুধ ছিটানোর কাজ করছি। প্রতিদিনই এ কাজ চলমান। পর্যায়ক্রমে পৌর এলাকার সমস্ত জায়গায় এ ওষুধ ছিটানো হবে।’