চুয়াডাঙ্গা সোমবার , ১০ জানুয়ারি ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

করোনার নতুন ঢেউয়ে রাজধানী হটস্পট

সমীকরণ প্রতিবেদন:
জানুয়ারি ১০, ২০২২ ৩:৩২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

রাজধানী ঢাকা হতে যাচ্ছে করোনার নতুন ঢেউয়ের অন্যতম বৃহৎ হটস্পট। এমনিতেই ঢাকা শহরে করোনা বেশি, শনাক্তও বেশি হচ্ছে। তবে গত এক সপ্তাহ থেকে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পর ৮০ শতাংশই রাজধানীতে শনাক্ত হচ্ছে। গতকাল শনিবার সকাল ৮টার পূর্ব পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে করোনা শনাক্ত হয়েছে এক হাজার ১১৬ জন। এর মধ্যে রাজধানীতেই ৯২১ জন। অর্থাৎ সারা দেশের ৮২.৫৩ শতাংশ করোনা শনাক্ত হয়েছে রাজধানীতে। সারা দেশে শনাক্তের হার ছিল ৫.৭৯ শতাংশ। একই সময়ে সারা দেশে ১৯ হাজার ২৭৫টি নুমনা পরীক্ষা করা হয়েছে। রাজধানীর বাইরে একই সময়ে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৯৫ জন। একই সময়ে করোনায় মৃত্যু হয়েছে একজনের এবং তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের এক নারী।

বর্তমানে আক্রান্তরা ডেল্টা না ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের শিকার তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদফতর। কারণ বেশির ভাগ করোনা পরীক্ষা হচ্ছে র্যাডি অ্যান্টিজেন টেস্টের মাধ্যমে। একটি টেস্ট কীটে নমুনা (সোয়াব) নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এই কিটে শুধু নমুনাটিতে করোনাভাইরাস আছে কিনা তা বোঝায়। আবার অ্যান্টিজেন টেস্টে ফলস পজেটিভও হয়ে থাকে। অধিকতর নিশ্চিতের জন্য আরটিপিসিআর পরীক্ষা করাতে হয়। কিন্তু আরটিপিসিআর পরীক্ষায়ও শুধু করোনাভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়। সে কারণে নতুন যারা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে তারা করোনার কোন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত তা বলা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব রোগ নির্ণয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর জানিয়েছেন, কেবল জিনোম টেস্টের মাধ্যমেই বলা সম্ভব এখন কেন কোন ভ্যারিয়েন্টে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। তবে এ পর্যন্ত যে জিনোম টেস্টগুলো হয়েছে তাতে এটা বলা যাচ্ছে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টেই আক্রান্ত বেশি।’ কিন্তু ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে করোনা যেভাবে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ হয়ে গেছে তাতে অনেক চিকিৎসকই বলছেন, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ বেড়ে গিয়ে হঠাৎ করে এভাবে ওপরের দিকে উঠতে পারে না। আমাদের পাশের দেশেও ওমিক্রনের সংক্রমণ বেড়েছে। অতএব বাংলাদেশে ডেল্টা নয়, ওমিক্রনের সংক্রমণ হওয়াটাই স্বাভাবিক। দেশে এ পর্যন্ত ওমিক্রনের ২০টি কেস শনাক্ত হয়েছে অর্থাৎ ২০টি জিনোম সিকোয়েন্স করে এদের ওমিক্রন শনাক্ত করা হয়েছে।

এ দিকে রাজধানীতে করোনা শনাক্ত বেড়ে গেলেও জনসংখ্যার তুলনায় পজেটিভ অনেক কম। রাজধানীতে গতকাল ৮টা পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১৪ হাজার ৮৪টি। পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৬.৫৪ শতাংশ, যেখানে সারা দেশে শনাক্তের হার ৫৫.৭৯ শতাংশ। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে অনেক বেশি মানুষ বাস করে বলে এখানে সংক্রমণ বেশি। আরো বেশি নমুনা পরীক্ষা করা হলে এখানে আরো বেশি শনাক্ত হতে পারত।
এ দিকে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় পরামর্শক কমিটি গত শুক্রবার কিছু পরামর্শ দিয়েছে। প্রয়োজনে স্বাস্থ্যবিধি কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে আইনি ব্যবস্থা যেমন মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কমিটি বলেছে, শতভাগ সঠিকভাবে মাস্ক পরা নিশ্চিত করা, হাত পরিষ্কার রাখা ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। বিভিন্ন স্থানে পুনরায় হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে সব সামাজিক (বিয়ের অনুষ্ঠান, মেলা ইত্যাদি), ধর্মীয় (ওয়াজ মাহ্ফিল) ও রাজনৈতিক সমাবেশ বন্ধ করতে হবে। সভা/কর্মশালার ব্যবস্থা অনলাইনে করা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণ ও নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংক্রমণের বিষয়ে নিয়মিত নজরদারির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে পরামর্শক কমিটি। শিক্ষার্থীসহ সবাইকে দ্রুত টিকার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সীমান্তের সব প্রবেশ পথে স্ক্রিনিং, কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশন আরো জোরদারের সুপারিশ করা হয়। সংক্রমণ বেড়ে গেলে হাসপাতাল প্রস্তুতি বিশেষ করে পর্যাপ্ত সাধারণ ও আইসিইউ শয্যা, পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছে কারিগরি পরামর্শক কমিটি।
সংক্রমণ বৃদ্ধিতে নতুন নির্দেশনা : এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতি পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে করোনা রোগীদের নিজ জেলার হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার নির্দেশনাও আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আগতদের জন্য বাধ্যতামূলক অ্যান্টিজেন পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত আছে। টিকার সনদপত্র থাকলেও এ পরীক্ষা করাতে হবে। হাসপাতালে ভর্তির জন্য সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের ক্ষেত্রেও নিয়মটি প্রযোজ্য হবে। গত বুধবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের সব সিভিল সার্জন এবং বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের এক বৈঠকের পর এসব নির্দেশনা আসে। বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বব্যাপী ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ও স্বাস্থ্যবিধি মানা কমিয়ে দেয়ার কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বৈঠকে হাসপাতালগুলোকে পুরোপুরি প্রস্তুত হতে বলা হয়েছে। যেখানে করোনা শনাক্ত হবে, আক্রান্তদের সেখানেই চিকিৎসা নিতে হবে। যথাযথ ব্যাখ্যা ছাড়া কোনো রোগীকে ঢাকায় পাঠানো যাবে না। কারণ এটি ওমিক্রন ছড়ানোর আশঙ্কা বাড়ানো ছাড়া আর কিছুই করবে না।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ বি এম খুরশীদ আলম জানান, ‘সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ফরোয়ার্ডিং ছাড়া অন্য জেলার রোগীদের রাজধানীতে পাঠানো যাবে না। কেন রোগীকে ঢাকায় পাঠানোর প্রয়োজন, তা চিকিৎসকদের উল্লেখ করতে হবে। সব জেলা হাসপাতাল করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য তৈরি।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে এবং সংক্রমণ রোধে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কারণ কোনো জেলা থেকে রোগীকে রাজধানীতে নিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।’
রাত ৮টার ভেতর দোকান বন্ধ করতে হবে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী
মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন বলেছেন, সামাজিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট আসনের বেশি লোকজন দাওয়াত দিতে পারবেন না। তা না হলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করা হবে। দোকানপাট রাত ৮টার ভেতর বন্ধ করতে হবে, লঞ্চ এবং ট্রেনে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাচল করার একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে। টিকার কার্ড সাথে নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে হবে। কাজে-কর্মে প্রতি অবস্থায় মাস্ক পরতে হবে। আমাদের ডাক্তার-নার্সরা এখন অভিজ্ঞ। ডেল্টা ভেরিয়েন্ট মোকাবেলায় তারা সফলতার পরিচয় দিয়েছে। ওমিক্রনও তারা সফলতার সাথে মোকাবেলা করতে পারবে। ওমিক্রনে সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ায় জেলা, উপজেলার হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তারা এখন প্রস্তুত। যদি রোগী বাড়ে তাহলে তারা চিকিৎসা দিতে সক্ষম হবে।

গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে মানিকগঞ্জের গড়পাড়া শুভ্র সেন্টারে সদর ও সাটুরিয়া উপজেলার শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র কম্বল বিতরণ অনুষ্ঠান উদ্বোধনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন এসব কথা বলেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী বলেন, গত ১৫ দিন আগেও ২৫০ থেকে ৩০০ লোক সংক্রমিত হয়েছে। গতকাল এবং পরশু সাড়ে এগারো শ’ লোক সংক্রমিত হয়েছে। অর্থাৎ সংক্রমণের হার চারগুণ বেড়ে গেছে। এটা খুবই আশঙ্কাজনক। এই হারে সংক্রমণ বাড়লে রোগীর সংখ্যা বাড়বে। রোগীর সংখ্যা বাড়লে হাসপাতালের বেডে স্বল্পতা দেখা দেবে। চিকিৎসা ক্ষেত্রেও অসুবিধা দেখা দেবে।শীতবস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজুর রহমান, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যুবায়ের হোসেন, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আফসার উদ্দিন সরকার, সাটুরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আফাজ উদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য এ সময় দুই হাজার শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র কম্বল বিতরণ করা হয়। পর্যায়ক্রমে মানিকগঞ্জ সদর ও সাটুরিয়া উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন এবং পৌরসভার প্রতি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অর্থায়নে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম চলমান থাকবে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।