কমছে ফসল উৎপাদন, প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাব

84

প্রকাশ্য চলছে অবৈধভাবে কৃষি জমির মাটি কাটার মহাকর্মযজ্ঞ
প্রতিবেদক, দামুড়হুদা:
অবৈধভাবে প্রকাশ্যে ফসলি জমির মাটি কাটার মহাকর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে প্রভাবশালী মহল। চলছে ফসলি জমির মাটি কাটা উৎসব। বিভিন্ন ফসলি কৃষি জমি পরিণত হচ্ছে পুকুর-ডোবায়। কমছে আবাদি জমি ও ফসল, বেকার হচ্ছে কৃষক। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে খাদ্য ভাণ্ডার ও পরিবেশ-প্রকৃতিতে। আর মাটি পরিবহনে ভারি ট্রাক্টর ও লাটাহাম্বার ব্যবহারে ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়ক হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্থ। আইন অমান্য করে এমনই কর্মকাণ্ড চলছে দামুড়হুদা উপজেলায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, দামুড়হুদা উপজেলার কোষাঘাটা, চিৎলা-গোবিন্দহুদা, লোকনাথপুর,বদনপুর, নাপিতখালী ও পাটাচোরার ভৈরব নদীর পাড়সহ বিভিন্ন গ্রামের মাঠে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভেকু দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। মাটি বহনে অবৈধ ট্রাক্টর ও লাটাহাম্বার চলাচলে ধুলার কুয়াশায় ঢেকে গেছে গোটা এলাকা। কৃষকের ফসলি জমির পাশে বড় বড় পুকুরের ন্যায় খনন করে মাটি ও বালি কেটে ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করায় হুমকির মুখে পড়েছে শত শত বিঘা ফসলি জমি। এছাড়াও মাটি কাটা গর্তের কারণে ভাঙনে নষ্ট হচ্ছে অন্যান্য ফসলি জমি ও চলাচলের রাস্তা।
এলাকাবাসী জানান, উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এক সময় নিয়মিত চাষাবাদ হতো। দিন দিন স্থানীয় ইটভাটায় এসব জমি থেকে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে নেওয়ার ফলে কৃষি জমি কমে এসেছে। ফলে চাষাবাদ কমছে। বেশি টাকার লোভে অনেকেই কৃষি জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। অনেকে আবার বাধ্য হয়ে ওই জমির পাশে থাকা জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন। কোনো ধরনের নিয়ম-নীতি না মেনে গত কয়েক বছর ধরেই এসব কৃষি জমি থেকে ইটভাটায় মাটি বিক্রি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক জমির মাটি কেটে নেওয়ায় বড় বড় খাদ তৈরি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ওইসব এলাকাগুলো থেকে এক সময় কৃষি জমি বিলিন হয়ে যাবে। এসব কৃষি জমি রক্ষায় এলাকাবাসী স্থানীয় প্রশাসনসহ সব মহলের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন নতুন করে আর কোনো কৃষি জমি নষ্ট না হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কৃষক জানান, ‘আমার পাশের জমিতে মাটি কাটার ফলে আমার জমির পাড় ভেঙে যায়। জমিতে সেচের পানি আটকে রাখা যাচ্ছে না। তাই জমিতে ফসল ফলানো যাবে না।’
কৃষিবিদদের মতে, জমির উপরিভাগের চার থেকে ছয় ইঞ্চি গভীরের মাটিতেই মূলত পুষ্টিগুণ থাকে। মাটির এই স্তর কেটে নেওয়ায় জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করেও কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যাবে না। এতে সারের পেছনে কৃষকের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হবে। ফলনও স্বাভাবিকের চেয়ে কম হবে। এভাবে মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
এদিকে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন সময় দামুড়হুদা উপজেলা ভূমি অফিস, দামুড়হুদা মডেল থানাসহ বিভিন্ন স্থানে এই মাটি কাটা বন্ধ করতে লিখিত অভিযোগ করেছেন তাঁরা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের কঠোরভাবে সতর্ক করাসহ বিভিন্ন সময়ে মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয়। এতে কয়েক দিন মাটি কাটা বন্ধ রাখার পর আবারও তারা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে একইভাবে মাটি কাটা শুরু করে।
সরকারি গেজেটে প্রকাশিত মাটির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও হ্রাসকরণ ২০১৩ সালের ৫৯ নম্বর আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি ইট প্রস্তত করার উদ্দেশ্যে কৃষি জমি হতে মাটি কাটা বা সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে না। যদি কোনো ব্যক্তি আইনের এই ধারা লঙ্ঘন করেন, তাহলে তিনি অনধিক ২ (দুই) বৎসরের কারাদণ্ড বা ২ (দুই) লক্ষ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত বা ইউনিয়ন বা গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার করিয়া কোনো ব্যক্তি ভারি যানবাহন দ্বারা ইট বা ইটের কাচাঁমাল পরিবহন করিতে পারিবেন না। যদি কোনো ব্যক্তি আইনের এই ধারা লঙ্ঘন করেন, তা হইলে তিনি ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। এসব আইন থাকার পরও ভূমি দস্যুরা আইনের তোয়াক্কা না করে স্থানীয় প্রশাসন চোখের সামনে এসব কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করার পরও প্রশাসনের এই নীরব ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এলাকাবাসীর মনে।
এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিলারা রহমান বলেন, ‘মাটি কাটার অপরাধে বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা করা হচ্ছে। এরপরেও যারা আইন অমান্য করে মাটি কাটছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’