এবারো চামড়া নিয়ে শঙ্কা

159

সমীকরণ প্রতিবেদন:
‘আগের চামড়াই স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। অবস্থা ভালো নয়। ব্যাংকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে দিয়ে ঋণ নেয়া সম্ভব নয়। দাবি অনুযায়ী আমাদের ব্যাংক ঋণ না দিলে কুরবানির চামড়া কেনা হবে না। চামড়া কেনা না কেনা নির্ভর করছে ব্যাংকের ওপর।’ ঈদের চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এভাবেই ট্যানারি মালিক শাহীন আহমেদ সাফ জানান। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী তারা ব্যবসা করবে। চামড়াশিল্প রক্ষা এবং ভালো ব্যবসায়ীদের জন্য কম সুদে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে দিয়ে পুনঃতফসিল ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের জন্য এই সুযোগ আশীর্বাদ। অপরদিকে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা বলছেন, ট্যানারি মালিকরা আগের টাকাই দেয়নি। এবার করোনায় পরিস্থিতি আরও খারাপ। বর্তমানে খাসির চামড়া ২০ থেকে ৩০ টাকা পিস কেনা হচ্ছে। আর গরুর চামড়া ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পিস। কাজেই কুরবানির চামড়ার কী হবে তা বলা মুশকিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্যানারি মালিকরা বিভিন্ন অজুহাতে গত বছরের মতো এবারো ঠিকমতো চামড়া কিনবে না। অথচ এবারে কুরবানির জন্য এক কোটি ১৯ লাখ গরু-খাসিসহ বিভিন্ন পশু রেডি করা হয়েছে। যা ১১ দিন পরই জবাই করা হবে। কিন্তু গত বছরের মতো দাম না পেলে এবারো একদিকে এতিম, গরিব, মিসকিনরা বঞ্চিত হবে। অন্যদিকে রপ্তানি আয়েও লাগবে ধাক্কা।
চামড়াশিল্পের বিকাশে বিভিন্ন সুবিধা প্রদান :
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়াশিল্প স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়ার পর থেকেই একের পর এক সুবিধা আদায় করছেন ট্যানারি মালিকরা। সাভারে চামড়াশিল্প নগরী নির্মাণ প্রকল্পের পুরো ব্যয়ই বহন করেছে সরকার। অবকাঠামো ও মেশিনারিজ স্থাপনে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে তাদের ক্ষতিপূরণ কয়েকশ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। শিল্পনগরীতে স্থাপিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) স্থাপনের টাকাও দিয়েছে সরকার। আবার হাজারীবাগের তুলনায় সাভারে ট্যানারি মালিকদের কয়েক গুণ বেশি জমি দিয়ে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে এ খাত ১৫ শতাংশ নগদ সহায়তা পেয়ে আসছে। এছাড়া নিজস্ব ইটিপিতে উৎপাদিত ক্রাস্ট ও ফিনিশড লেদার রপ্তানির বিপরীতে ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা পেয়ে আসছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। অন্যান্য বছরের মতো গত বছরও ট্যানারি মালিকরা চামড়ার দাম বেধে দিয়েও শেষ পর্যন্ত কিনেনি। সারা বছরের ট্যানারি শিল্পের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ সংগ্রহ করা হয় কুরবানির ঈদে। তারপরও গত বছরে কুরবানির চামড়া কেনার মানুষ ছিলো না। অনেক জায়গায় গর্তে পুঁতে ফেলা হয়। এই বাজে অবস্থার সৃষ্টি হলে সরকারের টনক নড়ে। তার পরিত্রাণ পেতে এবং চামড়াশিল্পের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে সরকার টাস্কফোর্সও গঠন করে। ২২ জুনে শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ আহমেদ হুমায়ুনের সভাপতিত্বে সভা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয় যাতে কোনোক্রমেই চামড়া নষ্ট না হয়। সে জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে গুদামে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। অপরদিকে ট্যানারি মালিকদের বিভিন্ন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রণালয় থেকে ৮ জুলাই ট্যানারি মালিকদের ঋণ দেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একটি চিঠি দেয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, চামড়াশিল্প নগরীতে স্থানান্তরের কারণে মালিকদের আর্থিক সমস্যা হচ্ছে। এটি নিরসনের জন্য টাস্কফোর্স ২২ জুন অনলাইনে সভা করে। সভায় আসন্ন কুরবানির ঈদে চামড়া ব্যবসায়ীদের ঋণসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন ও তাদের নতুনভাবে ঋণসুবিধা, বকেয়া ঋণ বিশেষ বিবেচনায় তফসিলিকরণ, নমনীয় পরিশোধসূচি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ :
গত ৫ জুলাই কুরবানির কাঁচা চামড়া ক্রয়ে ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণে বিশেষ সুবিধার বিষয়ে সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্কুলারে কুরবানির পশুর কাঁচা চামড়া ক্রয়ে ব্যবসায়ীদের ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ সুবিধার কথা বলা হয়েছে। ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে চামড়া ব্যবসায়ীদের ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সচল থাকলে এ সার্কুলারের আওতায় পুনঃতফসিল সুবিধা প্রদান করা যাবে। এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ তলবি ও চলমান ঋণ সর্বোচ্চ ছয় বছর মেয়াদে এবং মেয়াদি ঋণ সর্বোচ্চ আট বছর মেয়াদে পুনঃতফসিল করা যাবে। ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে নিজ নিজ ব্যাংকের কাছে এ সার্কুলারের আওতায় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করতে হবে। এরপর আবারো ৯ জুলাই আসন্ন ঈদুল আজহায় কুরবানির পশুর কাঁচা চামড়া ক্রয়ের জন্য দেয়া ঋণের জামানত গ্রহণে নমনীয় হতে ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছে এ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
চামড়া কিনতে ৬০০ কোটি টাকা ঋণ :
গত বছরের চেয়ে করোনার কারণে এবারো চামড়াশিল্পের অবস্থা খারাপ। তারপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার জারি হওয়ার পর চামড়া কিনতে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক ৬০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে ট্যানারি মালিকদের। দীর্ঘ দিন থেকে খেলাপি নয়, শুধু নিয়মিত গ্রাহকদেরই এই ঋণ দেয়া হবে। অবস্থা বেশি ভালো না হওয়ায় এভাবে ঋণের পরিমাণ কমানো হয়েছে। গত বছরে কুরবানির চামড়া কিনতে ব্যাংক ঋণ দেয়া হয়েছিল ৮০০ কোটি টাকা। সার্বিক ব্যাপারে জানতে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা ব্যস্ত থাকায় মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, যারা ভালো ব্যবসায়ী তাদের জন্য অন্যান্য বছরের মতো এবারো ঈদে সুযোগ দেয়া হয়েছে। গরিব মিসকিনের হক এবং চামড়াশিল্পের কথা বিবেচনা করে ট্যানারি মালিকদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটা তাদের জন্য আশীর্বাদ। কারণ ব্যবসায় লাভ-লোকসান আছে। যারা গতবার ভালো ব্যবসা করেছে তাদের জন্যই এ সুযোগ। দীর্ঘদিন থেকে ঋণ নিয়ে দেবে না। তাদের জন্য এ ঋণ হতে পারে না। কাজেই ঋণ কম বেশি দেখার বিষয় না।
চরম দুশ্চিন্তায় মৌসুমী ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা :
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার রামচন্দ্রপুর হাটের চামড়া ব্যবসায়ী অর্জুন জানান, সেই ছোটকাল থেকে কুরবানির ঈদের সময় আমাদেরও অনেক ব্যস্ততা বেড়ে যায়। আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করি চামড়া কেনার। আড়তদারদের দিকে তাকিয়ে থাকি, কখন তারা ডাক দেবে। হাতে ধরিয়ে দেবে আগের টাকা। আগের টাকা মানে জানতে ইলে তিনি স্পষ্ট করে জানান, ট্যানারি মালিকরা চামড়া কিনে টাকা দেয় না। আস্তে আস্তে দেয়। এভাবে তারা বকেয়া রাখার কারণে আমাদেরও অনেক টাকা জমে যায় আড়তে। কয়েক বছর থেকে এ প্রবণতা বেশি। তবে গত বছর থেকে অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। চামড়া নিতেই চাই না তারা। টাকাও দেয় না। তিনি আরও বলেন, করোনার কারণে এবার অবস্থা আরও খারাপ। খাসির চামড়া বর্তমানে ২০ থেকে ৫০ টাকা পিস এবং গরুর চামড়া ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পিস কেনা হচ্ছে। এর সাথে লেবার, লবণের খরচ, কমিশন তো আছে। ঈদ ঘনিয়ে এলেও এবার চামড়া কেনা হবে কি হবে না আড়ত থেকে এখনো কোনো কিছু বলা হয়নি। তাই চরম দুশ্চিন্তায় আছি বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, শুধু আমার অবস্থা যে এরকম তা নয়। সারা বাংলাদেশের সব মৌসুমী চামড়া ব্যবসা ব্যবসায়ী এবং আড়তদারকে একই খারাপ অবস্থা। এ রকম চলতে থাকলে কুরবানির চামড়া কেনা সম্ভব না। এর ফলে গরিব, মিসকিনের হক মার খাবে।
চামড়াশিল্পে রপ্তানিতে ধস :
ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) সূত্র বলছে, করোনা ভাইরাসের কারণে বিদেশি ক্রেতা চামড়া নিতে একেবারে রাজি নন। তারা সাফ বলে দিয়েছেন, নিজের দেশে (ইতালি) ফ্যাশনেবল আইটেমের চাহিদা কমে গেছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া মানুষ কেনাকাটা করছেন না। ফলে বাংলাদেশ থেকে এখনই চামড়া কেনার আগ্রহ নেই। করোনার প্রভাবে চামড়ার প্রধান বাজার চীন, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, হংকংসহ অধিকাংশ দেশে রপ্তানি বন্ধ। তিন হাজার থেকে তিন হাজার ২০০ কোটি টাকার চামড়া স্টক হয়ে আছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যমতে, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে (২০১৯-২০) এ খাতে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমেছে ২১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রপ্তানি আয় কমেছে ২৭ দশমিক ০৩ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে চামড়া খাতে মোট রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ১০৯ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার, বিপরীতে আয় হয়েছে ৭৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ আয় কমেছে ২৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। টাকার অঙ্কে আয় কমেছে দুই হাজার ৫১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চামড়াজাত পণ্যে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি কমেছে ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ, চামড়ায় প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪০ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কমেছে ফুটওয়্যার রপ্তানিতে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ বলেন, ২০১৭ থেকে ট্যানারি শিল্প কোনো ব্যবসা করতে পারেনি। এসময় ৩২শ কোটি টাকার চামড়া অবিক্রীত পড়ে আছে। অপরদিকে ট্যানারির অনুকূলে ব্যাংক ঋণের সুদ হয়েছে আড়াইশ থেকে তিনশ কোটি টাকা। চামড়া ব্যবসায় ফিরতে হলে এ সুদ মওকুফ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঋণগুলো ১৬ বছরের জন্য ব্লক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতে বলা হয়েছে। এবারের ঈদের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা ব্যাংকের ওপর নির্ভর করছে। অর্থাৎ ব্যাংক সহজ শর্তে ঋণ দিলে চামড়া কেনা যাবে। না দিলে যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ সুবিধার ব্যাপারে তিনি বলেন, এতে প্রকৃত ট্যানারি মালিকদের কোনো উপকার হবে না। কোনো কাজে লাগবে না। কারণ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে কারো পক্ষে ঋণ নেয়া সম্ভব নয়।