এক সপ্তাহে চুয়াডাঙ্গায় ১২ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ৪০৩

38

ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গায় করোনা এবং উপসর্গে আরও ৮ জনের মৃত্যু, মেহেরপুরে নতুন শনাক্ত ৪৬
সমীকরণ ডেস্ক:
গত এক সপ্তাহে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একইসময়ে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৪০৩ জন মানুষ। এছাড়া পার্শবর্তী জেলা মেহেরপুর ও ঝিনাইদহের অবস্থাও ভয়াবহ। গতকাল সোমবার মেহেপুরে নতুন করে ৪৬ জনের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। এদিকে, ঝিনাইদহে ২৪ ঘণ্টায় এক পুলিশ সদস্যসহ করোনা ও উপসর্গে ৪ জন এবং চুয়াডাঙ্গায় করোনা ও উপসর্গে আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গায় বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের প্রকোপ থামছেই না। জেলার চারটি উপজেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে এর ছোবল। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে গত এক সপ্তাহে জেলার ৭৯৩টি নমুনা পরীক্ষা করলে ৪০৩ জনের রিপোর্ট পজিটিভ হয়। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় এক সপ্তাহে শনাক্তের হার ৫০.৮২ শতাংশ। এই সময়ের মধ্যে ১২৩ জন সুস্থ হয়ে উঠলেও প্রাণ গেছে আরও ১২ জনের। এরমধ্যে গতকাল অদৃশ্য এই ভাইরাসের আক্রান্ত একজন ও উপসর্গ নিয়ে জেলার আলমডাঙ্গা ও জীবননগর উপজেলার তিনজনসহ মোট চারজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে গতকাল মৃত্যু হয়েছে সদর উপজেলার আলুকদিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রুমা খাতুনের। গতকাল ঢাকার একটি হাসপাতালের আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এদিকে গতকাল করোনা উপসর্গ নিয়ে সদর হাসপাতালের ইয়োলো জোনে একজনসহ তিনজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন- আলমডাঙ্গা উপজেলার ওসমানপুর গ্রামের কিতাব মোল্লা (৭৫)। গতকাল ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তাঁর মৃত্যু হয়। একইদিনে দুপুর ১টা ৫০মিনিটে হাসপাতালের ইয়োলো জোনে মৃত্যু হয়েছে জীবননগর উপজেলার হরিহরনগর গ্রামের শহিদুলের ছেলে ইমদাদুলের (৪০)। পরিবারের সদস্যরা গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ইমদাদুলকে সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়। ইমদাদুলের শরীরে করোনা উপসর্গ থাকায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে হাসপাতালের ইয়োলো জোনে ভর্তি করেন। ভর্তির পাঁচমিনিটের মাথায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম ফাতেহ আকরাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, করোনা উপসর্গ নিয়ে জরুরি বিভাগে মৃত্যু হওয়া কিতাব মোল্লা ও ইয়োলো জোনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হওয়া ইমদাদুলের শরীর থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। নমুনা সংগ্রহ শেষে নিহতদের লাশ করোনা প্রটকলে দাফনের জন্য পরিবারের সদস্যদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।
এছাড়া গতকাল দুপুরে পাপ্পু বিশ্বাস (৩৫) নামের অপর আরেক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। নিহত পাপ্পু জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা জীবননগরের সীমান্ত ইউনিয়নের হরিয়ানগর গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে। নিহত পাপ্পুর চাচা সীমান্ত ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বর শফিকুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, ‘পাপ্পু বেশকিছুদিন যাবত জ্বর, ঠাণ্ডা ও অ্যাজমার সমস্যা নিয়ে নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন ছিল। গতকাল দুপুরে সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যা তাঁকে হাসপাতালের নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক এমন সময় পাপ্পুর মৃত্যু হয়। পাপ্পুর শরীর থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি। গতকালই জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে পাপ্পুর দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়।
এদিকে, গতকাল সোমবার জেলায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৮২ জন। গতকাল চুয়াডাঙ্গার ১২৫টি নমুনা পরীক্ষা করে ৮২ জনের নমুনার ফলাফল পজিটিভ আসে। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ৬৫.৬ শতাংশ। গতকাল নতুন শনাক্ত ৮২ জনসহ জেলায় মোট করোনা শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৩২ জনে। নতুন আক্রান্ত ৮২ জনের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ৩৫ জন, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ৭ জন, দামুড়হুদা উপজেলার ২০ জন ও জীবননগর উপজেলার ২০ জন। এনিয়ে জেলায় মোট করোনা আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৭৩২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে সদর উপজেলার ১ হাজার ২৭৬ জন, আলমডাঙ্গার ৪৪৬ জন, দামুড়হুদায় ৬৭৫ জন ও জীবননগরে ৩৩৫ জন। গত রোববার জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ করোনা পরীক্ষার জন্য ১৩৬টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে প্রেরণ করে। গতকাল উক্ত নমুনা ও পূর্বের পেন্ডিং নমুনার মধ্যে কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে পরীক্ষাকৃত ও অ্যান্টিজেন পদ্ধতিতে পরীক্ষাকৃত মোট ১২৫টি নমুনার ফলাফল প্রকাশ করে জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ। এরমধ্যে ৮২ জনের করোনা ফলাফল পজিটিভ আসে, বাকী ৪৩টি নমুনার ফলাফল নেগেটিভ।
এছাড়া গতকাল জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ করোনা পরীক্ষার জন্য আরও ১৩৫টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে প্রেরণ করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে গতকালের ১৩৫টি নমুনাসহ চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রেরণকৃত ৪৮৯টি নমুনার ফলাফল পেন্ডিং রয়েছে। গতকাল জেলা থেকে দামুড়হুদার ১৮জন ও জীবননগরে ১৩জনসহ মোট ৩১ জন সুস্থ হয়েছেন। এনিয়ে জেলায় মোট সুস্থ হয়েছেন ২ হাজার ১০ জন। এরমধ্যে সদর উপজেলার ১ হাজার ১১ জন, আলমডাঙ্গার ৩৫০ জন, দামুড়হুদার ৪৩৯ ও জীবননগরে ২১০ জন। জেলায় বর্তমানে করোনা আক্রান্ত হয়ে হোম ও হাসপাতালের আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬৩৮ জন।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী জেলা থেকে এ পর্যন্ত মোট নমুনা সংগ্রহ ১২ হাজার ৪৭টি, প্রাপ্ত ফলাফল ১১ হাজার ৫৫৮টি, পজিটিভ ২ হাজার ৭৩২ জন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গায় ৬৩৮ জন করোনাক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন। এরমধ্যে সদর উপজেলায় অবস্থানকালে আক্রান্ত হয়েছেন ২৩৩ জন, আলমডাঙ্গায় ৭৭ জন, দামুড়হুদায় ২১০ জন ও জীবননগরে ১১৮ জন। আক্রান্তদের মধ্যে বর্তমানে ৫৮৪ জন হোম আইসোলেশনে আছেন। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ২১৪ জন, আলমডাঙ্গায় ৬৮ জন, দামুড়হুদায় ১৯২ জন ও জীবননগরে ১১০ জন। প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে আছেন সদর উপজেলার ১৮ জন, আলমডাঙ্গার ৮ জন, দামুড়হুদার ১৬ জন ও জীবননগরের ৮ জন জনসহ মোট ৫০ জন। চুয়াডাঙ্গায় করোনা আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ৮৪ জনের। এরমধ্যে সদর উপজেলার ২৭ জন, আলমডাঙ্গায় ১৮ জন, দামুড়হুদায় ২৩ জন ও জীবননগরে ৬ জনসহ ৭৪ জন। চুয়াডাঙ্গায় আক্রান্ত অন্য ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে জেলার বাইরে। উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলার বাইরে চিকিৎসাধীন রয়েছে অন্য ৪ জন।
মেহেরপুর:
মেহেরপুর জেলায় বাড়ছে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস রোগী সংখ্যা। একদিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৪৬ জন। গতকাল মেহেরপুর সিভিল সার্জন ডা. নাসির উদ্দিন জানান, ল্যাবে নমুনা পাঠানো হয়েছিল তার মধ্যে ১০৩ জনের নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট আসে যার মধ্যে ৪৬ জনের রিপোর্ট পজেটিভ। আক্রান্তদের মধ্যে সদর উপজেলার ২৩ জন, গাংনী উপজেলার ১২ জন ও মুজিবনগর-৯ জন এবং অপর ২ জন চুয়াডাঙ্গার বাসিন্দা। নতুন ৪৬ জন মিলে জেলায় বর্তমান করোনা আক্রান্তের মোট সংখ্যা ৩১৭ জন। এর মধ্যে সদর উপজেলার ১১৬ জন, গাংনী উপজেলার ১১৪ জন ও মুজিবনগর উপজেলার ৮৭ জন। সিভিল সার্জন আরও জানান- মেহেরপুরে লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণেই দিনে দিনে বেড়েই চলেছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। এখন শহর ও গ্রামে সমানতালে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। এসময় তিনি সবাইকে সামাজিক দূরত্ব, নিয়মিত সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোবার অভ্যাস, মাস্ক ব্যবহার, জন সমাগম এড়িয়ে এবং হাঁচি-কাশির শিষ্ঠাচার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহবান জানান।
ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পুলিশসহ দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এনিয়ে জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ জনে। নিহত পুলিশ কনস্টেবল মাগুরা জেলার মোকছেদ আলীর ছেলে মশিউর রহমান (৪৫)। গতকাল ভোর সাড়ে ৪ টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। নিহত পুলিশ সদস্য মশিউর রহমান কালীগঞ্জ উপজেলার তত্ত্বিপুর পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলেন। কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহা. মাহফুজুর রহমান মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, উপজেলার তত্ত্বিপুর পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত থাকা অবস্থায় করোনার উপসর্গ দেখা দেয় মশিউরের। এরপর গত ১৮ জুন নমুনা পরীক্ষায় তাঁর শরীরে করোনা শনাক্ত হলে তাঁতে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল ভোরে তার মৃত্যু হয়। এদিকে, গতকাল জেলায় করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও দুজনের।
ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকালে ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া ল্যাব থেকে ২০৫টি নমুনা পরীক্ষার ফলাফল আসে। এর মধ্যে ৯৫টি নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৯১ জনে। দিন দিন জেলায় করোনার সংক্রমনের হার বৃদ্ধি পেলেও জণগনের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা খুব একটা চোখে পড়ছে না। হাট-বাজার, দোকান-পাটসহ নানা ব্যভসা প্রতিষ্ঠানে মাস্ক, ছাড়াই কেনা-বেচা করছে বিক্রেতা ও ক্রেতারা। শহরের চলাচলে বিধি নিষেধ থাকলেও নিদের্শনা থেকে যাচ্ছে উপেক্ষিত। গাদা-গাদি করে হাট-বাজারে চলাচল করতে দেখা গছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গতকাল সন্ধা সাতটায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় আগামীতেও করোনার শংক্রমণ একইভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকলে কঠোর লকডাইনের মত সিদ্ধান্তে আসতে পারে বলে জানা যায়। ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. হারুন অর রশিদ জানান, ৫০ বেড়ের করোনা ওয়ার্ডে ধারণ ক্ষমতার বেশি রোগী অবস্থান করছে। স্থান সংকুলান না হওয়ায় ৫০ বেডের একটি নতুন করোনা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে।