একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিলম্বিত ফল প্রকাশ

212

সেই অস্বাভাবিক ও অভূতপূর্ব ঘটনা
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট হয়নি, বরং আগের রাতে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা গায়ের জোরে কেন্দ্র দখল করে সব ব্যালট ছিনতাই করে সিল মেরে বাক্স ভরেছে। এটি বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ। জাতীয় সংবাদমাধ্যমের অনেক রিপোর্টেও এই ঘটনার সত্যতার প্রমাণ মেলে। পুলিশসহ পুরো প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের এহেন অপকর্মে সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের সত্যাসত্য নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরাও গত বছর ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনের চরিত্র কেমন ছিল, সে বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ওই নির্বাচনের বিস্তারিত ফলাফল এত দিন প্রকাশ করেনি। ইসির এই টালবাহানার কারণ কী, আমাদের জানা নেই। তবে দীর্ঘ ছয় মাস পর গত শনিবার ইসি তার ওয়েবসাইটে একাদশ সংসদ নির্বাচনের বিস্তারিত ফল প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, ১০৩টি নির্বাচনী আসনের ২১৩টি কেন্দ্রেই শতভাগ ভোট পড়েছে। ১৪টি আসনের সব কেন্দ্রেই, অর্থাৎ সাত হাজার ৬৮৯টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯০ থেকে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
নির্বাচনবিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শতভাগ ভোট পড়া অস্বাভাবিক। কারণ, ভোটারদের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রবাসী। অনেকে মারা গেছেন। অনেকে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের কারণে ভোট দিতে পারেন না। এসব কারণে শতভাগ ভোট পড়া অসম্ভব। তারা বলেন, ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পড়ার ঘটনা সন্দেহজনক। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যানকারী দলগুলো অভিযোগ করেছে, আগের রাতেই ব্যালটে সিল দিয়ে বাক্স ভরা হয়েছিল। যা হোক, বিশেষজ্ঞরা যেটা বলেননি সেটা হলো, তখনকার উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কায় বেশির ভাগ ভোটার কেন্দ্রে হাজির হননি। তাই অনেক কেন্দ্রই ছিল ভোটারবিহীন। কোথাও কোথাও সাজানো ভোটার লাইনে কিছু নারীকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে, যারা মূলত মিডিয়ায় ছবি তোলার জন্য প্রক্সি দিচ্ছিলেন। বেশির ভাগ মানুষ কেন্দ্রে হাজির না হলেও কী করে শতভাগ বা ৯০-৯৯ শতাংশ ভোট কাস্ট হলো, সেটি এক মহাবিস্ময়।
নির্বাচন কমিশনের অন্যতম কমিশনার রফিকুল ইসলাম একটি দৈনিককে বলেছেন, ‘শতভাগ ব্যালটের হিসাব মানে, শতভাগ ভোটারের উপস্থিতি প্রমাণ করে না। কারণ, অনেক কেন্দ্রে নানা কারণে ব্যালট বাতিলের ঘটনা ঘটে। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ব্যালটের হিসাব বুঝিয়ে দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তারা বাতিল ব্যালটও গুনে দেন। যেসব কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, সেখানে বাতিল ব্যালটের সংখ্যাও আমলে নিতে হবে।’ তবে তার এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। কাস্ট হওয়া বা প্রদত্ত ভোটের হিসাবেই ফল ঘোষণা করা হয়, বাতিল ব্যালটের হিসাবে নয়।
বিস্তারিত ফল প্রকাশে ইসির দেরি এবং শতভাগ ভোটার উপস্থিতি সম্পর্কে সুশাসনের জন্য নাগরিকÑ সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সংশ্লিষ্ট দৈনিককে বলেছেন, ‘এটি একটি অস্বাভাবিক ও অভূতপূর্ব ঘটনা। শতভাগ ভোট পড়ার ঘটনা প্রমাণ করছে, আগের রাতেই ভোট দেয়া হয়েছে। ভোটের দিনে ভোট জালিয়াতি হয়েছে বলে যে অভিযোগ ছিল তা অমূলক নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইসি এই তালিকা প্রকাশে এত দিন অনেক টালবাহানা করেছে। শেষ পর্যন্ত ফল প্রকাশ পাওয়ায় মানুষ ভোটের চিত্র সম্পর্কে একটি ধারণা পাচ্ছে।’ নির্বাচনবিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ইসির এই হিসাব বিশ্বাস করার প্রশ্নই আসে না। ভোটারদের উপস্থিতি শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগের বেশি হয়নি। এগুলো ম্যানিপুলেট করা হয়েছে। এ জন্য প্রকাশ করতে এত সময় লেগেছে। কারণ, এজন্য এত সময় নেয়ার কথা নয়। সব কেন্দ্রের ভোট ওইদিনই গণনা করা হয়েছে। ব্যালট পেপারও জমা হয়ে গেছে। শুধু যোগ করতে এত সময় লাগার কথা নয়। এক সপ্তাহের মধ্যেই সাধারণত নির্বাচনের ফল প্রকাশের কথা।
এ বিষয়ে ইসি সচিব আলমগীর হোসেন বলেন, কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফলাফল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা যা ফলাফল পেয়েছি, তাই ওয়েবসাইটে দিয়েছি।
যা হোক, নির্বাচনী ফলাফল যদি ম্যানিপুলেট করা হয়েও থাকে, তাহলেও এই বিলম্বিত ফল প্রকাশ করা সত্ত্বেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি ঐতিহাসিক মূল্যায়নের সুযোগ আমাদের সামনে অবারিত হলো।