চুয়াডাঙ্গা বুধবার , ১৭ নভেম্বর ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

উধাও আলেশা মার্ট : ইভ্যালির মতো একই দশা

অন্তত দশ হাজার গ্রাহক পণ্য পাননি, পাওনা ৪৫০ কোটি টাকা
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
নভেম্বর ১৭, ২০২১ ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

অন্তত ১০ হাজার গ্রাহকের কয়েকশ’ কোটি টাকা অগ্রিম নিয়ে পণ্য না দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলেশা মার্টের বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে তাদের প্রধান কার্যালয়সহ দুটি অফিস। পাওয়া যাচ্ছে না আলেশা মার্টের কোন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, অগ্রিম অর্থ নিলেও দীর্ঘ কয়েক মাসেও পণ্য দেয়নি আলেশা মার্ট। গত এক মাস যাবত আলেশা মার্ট কয়েক দফা চেক দিলেও এ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় ডিজঅনার হয়। এ অবস্থায় গ্রাহকের ভিড় বাড়লে প্রধান কার্যালয় বন্ধ করে দেয় আলেশা মার্ট। তবে আলেশা মার্টের প্রধান কার্যালয় এবং কর্পোরেট অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, এমন খবর ‘গুজব’ বলে ফেসবুক পোস্টে দাবি করছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে আরও বলা হয়েছে, তাদের কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং তাদের দুটি কার্যালয়ই খোলা রয়েছে।

জানা গেছে, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে জমকালো আয়োজনে যাত্রা শুরু করে আলেশা মার্ট। এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪৫ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। আলেশা মার্টের কাছে অন্তত ১০ হাজার গ্রাহকের পাওনা ৪৫০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মাঝামাঝি দেশের কয়েকটি আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তখন ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ এবং ধামাকাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তখনও আলেশা মার্টকে দেখা গেছে ব্যাপকভিত্তিক বিপণন প্রচার চালাতে। প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের মতো অভিনব এক ডিসকাউন্ট কার্ডের প্রচলন শুরু করে। এতে বয়স্ক, মুক্তিযোদ্ধাসহ নানা জনগোষ্ঠীকে লোভনীয় সব ডিসকাউন্ট দেয়ার কথা বলা হয়। এই কার্ডের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। অবশ্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা অভিযোগ যখন সামনে আসতে শুরু করেছিল সম্প্রতি তখন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো আলেশা মার্টকেও নজরদারিতে রেখেছিল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান।

গত জুলাই মাসে আলেশা মার্টে একটি মোটরসাইকেল অর্ডার করেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম। মোটরসাইকেল দিতে না পারায় টাকা ফেরত দিতে চেয়েছিল আলেশা মার্ট। গত সোমবার বনানীর প্রধান কার্যালয়ে এসে অফিস বন্ধ পান রফিকুল। দিনভর বসে থেকেও কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দেখা পাননি। তার মতো অনেকেই ফিরে গেছেন শূন্য হাতে। মঙ্গলবারও এসে দেখেন অফিস বন্ধ। ভুক্তভোগী একাধিক গ্রাহকের দাবি, গত এক মাস যাবত আলেশা মার্ট কয়েক দফা চেক দিলেও এ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় তা প্রত্যাখ্যাত (ডিজঅনার) হয়। এ অবস্থায় গ্রাহকের ভিড় বাড়লে প্রধান কার্যালয় বন্ধ করে দেয় আলেশা মার্ট। উধাও আলেশা মার্ট। ভুক্তভোগীরা জানান, তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হলেও সময় মতো দেয়া হয়নি পণ্য। এখন টাকা ফেরত চাইলে চেক ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় চেক প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বার বার। এদিকে, বনানীর কার্যালয়ে নোটিস টানিয়ে গ্রাহকদের যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে তেজগাঁওয়ের নাসরিন টাওয়ার অফিসে। অথচ সেখানেও কেউ নেই। এখন মামলা করার কথা ভাবছেন অনেক গ্রাহক।

প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে আলেশা মার্ট যথাসময়ে গ্রাহকদের অর্ডার ডেলিভারি দিতে পারছিল না। এই গ্রাহকদের কাছ থেকে পণ্যের জন্য আগাম অর্থ গ্রহণ করা হয়েছিল। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নিয়ে সরকারের নেয়া সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর একটি হচ্ছে, কোন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অর্ডারকৃত পণ্যের জন্য অগ্রিম অর্থ গ্রহণ করতে পারবে না। আলেশা মার্টের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওই ঘোষণার পর থেকেই কয়েকটি মার্চেন্ট প্রতিষ্ঠান আলেশা মার্টকে আর পণ্য সরবারহ করতে চাইছে না। এদের মধ্যে একটি ভারতীয় মোটরসাইকেল নির্মাতা ও সরবারহকারী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। আর এই কারণে গ্রাহকের পণ্য ডেলিভারি দিতে পারছে না আলেশা মার্ট। সে কারণেই গত প্রায় একমাস ধরে প্রতিষ্ঠানটির বনানী কার্যালয়ে গ্রাহকের ভিড় বাড়ছিল। এই ভিড় নিয়ন্ত্রণে আলেশা মার্টের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে কয়েকবার ঘোষণা দেয়া হয় যে, কার্যালয়ে এলে যেন কেবল গ্রাহকই আসেন, সঙ্গে অন্য কাউকে না নিয়ে আসা হয়।

গত সোমবার রাত ১২টার পর প্রতিষ্ঠানটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘বিশেষ ঘোষণা’ দিয়ে বলা হয়, আলেশা মার্ট ইতোমধ্যে অত্যন্ত সফলভাবে বাইক ডেলিভারি কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। কিন্তু রিফান্ড প্রক্রিয়া পরিচালনা করার সময় বিগত এক সপ্তাহ ধরে আলেশা মার্টের বনানী কার্যালয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বারা অফিস স্টাফদের ওপরে অতর্কিতে হামলা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার কারণে অফিস কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছিল। হামলাকারীরা কেউই আলেশা মার্টের গ্রাহক নয়। তাই আমাদের সব সম্মানিত গ্রাহককে সুন্দরভাবে সেবা প্রদান ও আলেশা মার্টের অফিস কার্যক্রম পুনরায় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কাস্টমারদের কোন প্রকার রেফারেন্স ব্যবহার না করার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। আমাদের কাছে সব কাস্টমার সমান। আলেশা মার্ট গত কয়েক দিনের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে গ্রাহকদের কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ জানিয়ে বলে, আপনাদের অর্ডার এবং রিফান্ডজনিত বিষয় নিয়ে যেকোন তথ্য জানার জন্য শুধু আপনারা (গ্রাহক নিজে) সশরীরে আমাদের অফিসে উপস্থিত থাকবেন। গ্রাহক ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি কোনভাবেই অফিসে গ্রহণযোগ্য হবে না এবং গ্রাহকদের যেকোন সেবা প্রাপ্তির জন্য অবশ্যই নিজ নিজ জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে আসার অনুরোধ করছি। এর আগে গত ৭ নবেম্বর আলেশা মার্টের ফেসবুক পেজে প্রতিষ্ঠানটি একটি ‘জরুরী ঘোষণা’ দেয়, আলেশা মার্টের ভাষায় যেখানে বলা হয়, ‘বনানী এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বিবেচনায় নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের কাস্টমার কেয়ার (২৪/৭) সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।’ এই ঘোষণার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গ্রাহকের ভিড় বাড়তে থাকে। তখন আবার ঘোষণা দেয়া হয়, যে বনানী কার্যালয় বন্ধ থাকবে কিন্তু তেজগাঁওয়ের নাসরিন টাওয়ার ভবনে যেখানে আলেশা মার্টের মূল প্রতিষ্ঠান আলেশা হোল্ডিংস লিমিটেডের কর্পোরেট কার্যালয়, সেটি খোলা থাকবে। আলেশা মার্ট এবং আলেশা হোল্ডিংসের একাধিক কর্মকর্তা কথা বললেও পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. মঞ্জুর আলম শিকদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে জনকণ্ঠ। মোবাইল ফোনে বারবার কল এবং এসএমএস পাঠানোর দুই ঘণ্টা পরেও ওপ্রান্ত থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

জানা যায়, গত জুলাই মাসের শুরুতে সরকার প্রথমবারের মতো ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা জারি করে। তাতে বলা হয়, অনলাইনে পণ্য কেনার জন্য গ্রাহক মূল্য পরিশোধ করার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরবরাহকারীর কাছে পণ্য পৌঁছে দেবে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। এরপর তা ক্রেতাকে মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে জানিয়ে দিতে হবে। ক্রেতা-বিক্রেতার অবস্থান একই শহরে হলে অর্ডার করার পাঁচদিনের মধ্যে, আর ক্রেতা-বিক্রেতার অবস্থান ভিন্ন শহরে হলে ১০ দিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। জুলাই মাসের মাঝামাঝি মোবাইল মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান বিকাশ সাময়িকভাবে ১০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন বন্ধ করে, যার মধ্যে ইভ্যালির সঙ্গে আলেশা মার্টও ছিল। এরপর সেপ্টেম্বরে সরকার জানিয়েছিল, আর্থিক লেনদেন মনিটর করার জন্য সরকারের নজরদারিতে রয়েছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যার অন্যতম ছিল আলেশা মার্ট। এদিকে আজ বুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সার্বিক বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করবে আলেশা মার্ট।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।