উদীচী চুয়াডাঙ্গার আয়োজনে জাকজমকপূর্ণ কাঁঠাল উৎসব ও কাঁঠাল খাওয়া প্রতিযোগিতায় অতিথিরা

966

প্রায় হারিয়ে যাওয়া পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ জাতীয় ফল কাঁঠালের গুরুত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে
মেহেরাব্বিন সানভী: কাঁঠাল শুধু আমাদের জাতীয় ফলই নয়, খুবই পুষ্টিকর ও ভেষজগুণ সমৃদ্ধ, সূলভ ও উপকারী ফল। এর কা-, শাখা, পাতা, শেকড় কোনো কিছুই বাদ দেওয়ার মতো নয়। কিন্তু ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কাঁঠাল খেতে আগ্রহী নয়, বরং তাদের মধ্যে বিরুপ মনোভাব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে এই সময়টা রমজান মাস পড়ায় পাকা কাঁঠালের চাহিদা আরো কমেছে। চাহিদা না থাকায় মূল্য হ্রাস পাচ্ছে ফলে কাঁঠাল গাছ উজাড় হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাঙ্গালী সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের এই জাতীয় ফল কাঁঠাল। যখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে গত ৩ মরসুমে ৫৫ হেক্টর জমিতে কাঁঠাল চাষ কমেছে, ঠিক সেই সময়ই এই কাঁঠালকে নিয়ে এক ভিন্ন রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করলো বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চুয়াডাঙ্গা জেলা সংসদ। উদীচী চুয়াডাঙ্গার আয়োজনে গতকাল শুক্রবার চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় ফল কাঁঠাল উৎসব ও ভক্ষণ প্রতিযোগীতা ২০১৮। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. জসীম উদ্দীন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. জসীম উদ্দীন বলেন- কাঁঠাল কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থায় খাওয়া যায়। কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। কাঁঠাল পাকলে কোষ খাওয়া হয়। এ কোষ নিংড়ে রস বের করেও খাওয়া যায়। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে খাওয়ার ধরণ পরিবর্তন করা দরকার। থাইল্যান্ডে কাঁঠালের চিপস তৈরি করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে কাঁঠাল জনপ্রিয় করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শুকিয়ে সংরক্ষণের পাশাপাশি স্যুপ, চিপস, রস(জুস), আইসক্রিম ইত্যাদি খাবার তৈরিতেও কাঁঠাল ব্যবহার করা হচ্ছে। এই উদ্ধৃতি দিয়ে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. জসীম উদ্দীন আরো বলেন বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে না যায় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। কাঁঠাল শুধু সুস্বাদু খাদ্য না, আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির অংশ। যারা ব্যবসায়ী আছেন তারা পশ্চিমা দেশগুলোর মতো কাঁঠাল নিয়ে নানা রকম ব্যবসা করতে পারেন। উদীচীর এধরনের আয়োজনকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন উদীচীর এই ব্যাতিক্রমধর্মী আয়োজন মানুষের মধ্যে কাঁঠালের যে পুষ্টিগুণাগুণ আছে তার সঠিক ধারনা দিতে সহায়ক ভুমিকা রাখবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গার সিভিল র্সাজন ডা. খায়রুল আলম বলেন- কোলস্টেরলমুক্ত এ ফলে নেই কোনো ক্ষতিকারক চর্বি। রয়েছে প্রচুর ক্যালরিসহ ভিটামিন ‘এ’ এবং ভিটামিন ‘সি’, থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, আয়রন, সোডিয়াম, জিঙ্ক এবং নায়াসিনসহ বিভিন্ন প্রকার পুষ্টি উপাদান। অন্যদিকে কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণে আমিষ, শর্করা ও ভিটামিন থাকায় তা মানবদেহের জন্য বিশেষ উপকারী। কাঁঠালে বিদ্যমান ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস- আলসার, ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ এবং বার্ধক্য প্রতিরোধে সক্ষম। কাঁঠালে আছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা আমাদের দেহকে ক্ষতিকর ফ্রির‌্যাডিকেলস থেকে রক্ষা করে। এছাড়াও সর্দি-কাশি রোগের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। বদহজম রোধ করে কাঁঠাল। উদীচীর এই ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠানের শুরুতেই উদীচী শিল্পীরা যে সঙ্গীত পরিবেশন করলো তা অসাধারণ। কাঁঠালের সমস্ত পুষ্টিগুণের কথাই আছে গানগুলোর ভিতর। উদীচীর এই আয়োজন নতুন প্রজন্মের মাঝে জাতীয় ফল কাঁঠাল খাওয়ার উপকারিতাকে তুলে ধরছে যা অবশ্যই প্রশংসনীয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষক বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক আব্দুল মোহিত বলেন- চুয়াডাঙ্গায় জাতীয় ফল কাঁঠালের চাষ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এভাবে হ্রাস পেতে থাকলে কাঁঠাল গাছ বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হ্রাসের ফলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সভাপতি এ্যাড. নওশের আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কাঁঠাল উৎসবের স্বপ্নদ্রষ্টা উদীচী চুয়াডাঙ্গার সাধারণ সম্পাদক হাবিবি জহির রায়হান। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নাট্যাভিনেতা আব্দুস সালাম এবং জাতীয় ফল কাঁঠাল উৎসব ও ভক্ষণ প্রতিযোগীতা ২০১৮-এর সদস্য সচিব অধিকারকর্মী মেহেরাব্বিন সানভী’র যৌথ উপস্থাপনায় অতিথি হিসাবে থেকে বক্তব্য রাখেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক সহকারি অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন, বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল আজিজ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক সফিকুল ইসলাম, বাংলা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক জাহিদুল হাসান, চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসনের সহকারি কমিশনার ফকরুল ইসলাম, জাতীয় ফল কাঁঠাল উৎসব ও ভক্ষণ প্রতিযোগীতা ২০১৮ এর আহ্বায়ক তুষার সিকদার।
অনুষ্ঠানে উদীচীর শিল্পীরা জাতীয় ফল কাঁঠালের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে তৈরি গান, কাঁঠাল কথন, কবিতা পঠন, লোকগান এবং “কাঁঠাল রঙ্গ” পরিবেশন করেন। বিশেষ করে উদীচী সদস্য মোল্লা মাহবুবের কথা ও সুরে রীমা সারমিন ও ছোট ছোট বাচ্চাদের গাওয়া কাঁঠাল গানটি সবার মন কাড়ে। কাঁঠাল ভক্ষণ প্রতিযোগিতার কথা জেনে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওয়াশীমুল বারী নিজ বাসভবনের কাঁঠাল গাছ থেকে ২৫টি কাঁঠাল প্রদান করেন। কাঁঠাল ভক্ষণ প্রতিযোগিতায় মাত্র ৪ মিনিটে ১১২টি কোয়া খেয়ে ১ম স্থান অধিকার করেন জয়রামপুরের খোদাবক্স আলি, একই সময়ে ৮০টি ও ৭৯টি কোয়া খেয়ে ২য় ও ৩য় স্থান অধিকার করেছেন জয়রামপুরের হাসান আলী ও চুয়াডাঙ্গা কোর্টপাড়ার পিয়ার আলী। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের দৈনিক সময়ের সমীকরণ’র সৌজন্যে পুরষ্কার প্রদান করা হয়। বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্য সমৃদ্ধ পোশাক পুরষ্কারে প্রত্যেকের জন্য ছিলো একটি করে লুঙ্গি, গেঞ্জিœ ও গামছা। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন উদীচী চুয়াডাঙ্গার সহ-সভাপতি ডা. লুৎফর রহমান, জাতীয় গণফ্রন্ট চুয়াডাঙ্গার আহ্বায়ক লিটু বিশ্বাস, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ চুয়াডাঙ্গা জেলার সাধারণ সম্পাদক কাজল মাহমুদ, উদীচী নাট্য সম্পাদক মিলন কুমার অধিকারী, দপ্তর সম্পাদক তন্ময় কুমার বসু, সহ-সভাপতি মিলি, শাহেদ জামাল, বিল্পব, মোল্লা মাহবুব, কাসেব রহমান, নাজমুল ইসলাম, মামুন অর রশিদ জয়, মাহফুজ প্রমুখ। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের জন্য ছিলো জাতীয় দৈনিক সমকাল এবং চুয়াডাঙ্গার আব্দুল্লাহ সিটির ‘লুকস’ ফারিয়া ফারজানা ওমেনস ওয়ার-এর সৌজন্যে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী গামছা। এছাড়া আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা এবং অঙ্কুর মেশিনারিজ, দর্শনা, চুয়াডাঙ্গা।