চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ৩ সেপ্টেম্বর ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

উচ্চ খেলাপিতে ধুঁকছে ১০ আর্থিক প্রতিষ্ঠান

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
সেপ্টেম্বর ৩, ২০২২ ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন:
নানা অব্যবস্থাপনায় জড়িয়ে বেশ কয়েকটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এখন নাজুক। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও কর্মকর্তারা অনিয়ম, জালিয়াতি ও যোগসাজশের মাধ্যমে নামে-বেনামে ঋণ দিয়েছে, যা দীর্ঘদিনেও ফেরত আসছে না। এ তালিকায় আছে অন্তত ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যাদের বিতরণ করা ঋণের ৩০ থেকে ৯৭ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে আস্থা সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের আমানত সংগ্রহে ভাটা পড়েছে। তারল্য সংকটেও আছে কেউ কেউ। ফলে মেয়াদপূর্তিতে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না কোনো কোনোটি।

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক এমডি পিকে হালদার নানা জালিয়াতির মাধ্যমে অন্তত চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেন। তার লোপাটের শিকার প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আর্থিক খাতের গলার কাঁটা। এর মধ্যে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসকে প্রথমে অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অপর প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস (ফাস) ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) আর্থিক অবস্থা এখন চরম নাজুক। এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিতরণ করা ঋণের ৭৬ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাও নাজুক। এর মধ্যে আছে ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স ও উত্তরা ফাইন্যান্স। এ ছাড়া আভিভা ফাইন্যান্স (সাবেক রিলায়েন্স ফাইন্যান্স) ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইনফ্যাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স (আইআইডিএফসি) কোম্পানিরও খেলাপি ঋণ বাড়ছে। বর্তমানে দেশে ৩৪টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালু আছে। এর মধ্যে তিনটি সরকারি, ১২টি দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানায় এবং বাকিগুলো দেশীয় ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ৬৯ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা, যা এ খাতে বিতরণ করা ঋণের প্রায় ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এই হারও এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। তিন মাস আগে ২০২২ সালের মার্চে এনবিএফআইয়ের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ২৩২ কোটি টাকা বা ২০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে এক হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। আর ছয় মাসের ব্যবধানে বেড়েছে দুই হাজার ৯২০ কোটি টাকা। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে এ খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ১৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের কারণে বিআইএফসির বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৯৭ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। গত জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৭৫৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সূত্র বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা পরিচালক মেজর (অব) আবদুল মান্নান ৬৭টি হিসাবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। বর্তমানে সুদসহ এটি বেড়ে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিনি ১০৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছেন। বাকি টাকা পরিশোধ করেননি। তবে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় বদল হয়। পরপর তিন দফা মালিকানা বদল হয়ে সেটি পিকে হালদার গ্রুপের কাছে যায়। পিকে হালদারের ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার এর পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। আর পরিচালক ছিলেন পিকে হালদারের নিকটাত্মীয়রা। ঋণ জালিয়াতির কারণে ২০১৬ সালে বিআইএফসির পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ন করতে চেয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সেটি আটকে যায়। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এক সময় ভালো চলছিল। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি পিকের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পরই আর্থিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানের নামে বের করে নেওয়া হয় ২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। আর এই সব ক’টি প্রতিষ্ঠানেরই সুবিধাভোগী ছিলেন পিকে হালদার। চরম নাজুক অববস্থায় পড়া এই প্রতিষ্ঠাটিও অবসায়নে গত বছর আবেদন করা হয়েছিল। তবে আদালত আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন না করে অনিয়মসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ও বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে এর পরিচালনা বোর্ড পুনর্গঠন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুন শেষে প্রতিষ্ঠানটির বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ১১২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৩ হাজার ১৫১ কোটি টাকা বা ৭৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এফএএস বা ফাস ফাইন্যান্স থেকে পিকে হালদার ও তার সহযোগীরা মিলে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। গত জুন শেষে এ প্রতিষ্ঠানের বিতরণে করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯২৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭২০ কোটি টাকা বা ৮৯ দশমিক ১৫ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত ফার্স্ট ফাইন্যান্সের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৯১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৮২০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বা ৮৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ। গত জুন শেষে প্রিমিয়ার লিজিংয়ের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৩২৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ৯১৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বা ৬৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ সময়ে ফারইস্ট ফাইন্যান্সের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৯৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৮৮১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বা ৯৩ দশমিক ২০ শতাংশ। এ ছাড়া জুন শেষে উত্তরা ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৪৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বা ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ ৮৫৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বা ৩১ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং আইআইডিএফসির খেলাপি ঋণ ৫৩৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা বা ৪১ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।