ঈদ জামাতের পর সশস্ত্র সংঘর্ষ : গুলি ও বোমায় আহত ২৩ : গুলিবিদ্ধ জয়নাল নিহত

375

আলমডাঙ্গার হাপানিয়া গ্রামে মাদ্রাসার মালিকানাধীন ৬বিঘা আমবাগানের ইজারা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের দু’পক্ষের বিরোধের জের

চিৎলা ইউপি চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমানসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা : আটক ৮ : আজ শহীদ হাসান চত্বরে প্রতিবাদ কর্মসূচি
নিজস্ব প্রতিবেদক/আলমডাঙ্গা অফিস: চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার হাপানিয়া গ্রামে ঈদের দিন সংঘর্ষে আহত জয়নাল আবেদীন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গতকাল সোমবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয় মসজিদ-মাদ্রাসার ছয় বিঘা জমির আমবাগান বন্দোবস্ত নিয়ে বিরোধের জের ধরে গত শনিবার ঈদুল আজহার দিন ঈদগাহ মাঠে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২৩ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে জয়নাল আবেদীনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনদিন চিকিৎসার পর আজ দুপুরে মারা যান তিনি। অন্যান্যদের চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে চুয়াডাঙ্গা সদরসহ বিভিন্ন হাসপাতালে। পুলিশ এ ঘটনায় ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে। সংঘষের ঘটনার পর থেকে হাপানিয়া গ্রাম প্রায় পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে। এদিকে, জয়নাল হত্যার প্রতিবাদে আজ সকাল ১০টায় চুয়াডাঙ্গার শহীদ হাসান চত্বরে প্রতিবাদ কর্মসুচির ঘোষণা দিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ।
স্থানীয়রা জানান, আলমডাঙ্গা উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য ইনতাজুল হকের সমর্থকদের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তাঁরা এ ঘটনার জন্য একে অপরকে দোষারোপ করেছেন। পূর্ব পরিকল্পিতভাবেই এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মাঠে আসার আগেই দুই পক্ষের লোকজন আশপাশের বিভিন্ন বাড়িতে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র জড়ো করে রাখে। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার একপর্যায়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসে দুই পক্ষই সংঘর্ষে জড়ায় বলে অভিযোগ করেছে এলাকাবাসী।
পুলিশ ও আহত সূত্রে জানা যায়, বেশ কিছু দিন ধরে হাপানিয়া মদিনাতুল উলুম সিদ্দিকিয়া মাদ্রাসার মালিকানাধীন ৬ বিঘা আয়োতনের আম বাগান লিজ দেওয়াকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের বিবাদ বিদ্যমান। গত শনিবার সকালে আলমডাঙ্গা উপজেলার হাপানিয়া গ্রামের ঈদাগা ময়দানে গ্রামের লোকজন নামাজ পড়তে যায়। এসময় গ্রামের ইউপি সদস্য ইমদাদুল হক ও রশিদ নামাজ শুরুর আগে তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য দিলে সবাই নিষেধ করেন। বলেন আমাদের কোরবানি আছে তাড়াতাড়ি নামাজ শেষ করেন।  পরে নামাজ শেষে ঈদগা ময়দানের অদুরে আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন গ্রুপের লোক জনের উপর অস্ত্র, বোমা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে ইউপি চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান লোকজন ইমদাদুল হকসহ অন্যরা। ইমদাদুলের কাছে থাকা পিস্তল দিয়ে জয়নুলকে গুলি করে অন্যরা বোমা হামলা চালিয়ে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর আহত করে  ১৪-১৬ জনকে। আহতদের উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়েছে। এঘটনায় উভয় পক্ষের ২৪ জন আহত হয়।
আহতরা হল, চুয়াডাঙ্গা আলমডাঙ্গা উপজেলার হারদি গ্রামের হালিম, মতিয়ার হোসেন, সেলিম শেখ, মিলন আলি, হাচান, আজিজুল, সোহরাব, নজরুল, করম আলি, মকলেছ, ফিরোজ, সুইট ও মাজেদসহ আরও অনেকে। আহতদের চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল, আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে জয়নাল আবেদীন নামে একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ছাড়া আজিজুল হক ও মতিয়ার রহমান নামে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
আহত নেতা-কর্মীদের দেখতে সদর হাসপাতালে ছুটে যান জাতীয় সংদদের হুইপ চুয়াডাঙ্গা এক আসনের সংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলাইমান হক জোয়াদ্দার, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটন, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মোহাইমেন হাসান জোয়ার্দ্দার অনিক, যুবলীগ নেতা নঈম হাসান জোয়ার্দ্দারসহ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এসময় জাতীয় সংদদের হুইপ চুয়াডাঙ্গা এক আসনের সংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলাইমান হক জোয়াদ্দার বলেন, নামাজ পড়ার সময় কয়েকজন দুর্বত্ত মাইকে উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছিল। তা আমার লোকজন নিষেধ করলে তাদের উপর গুলি ও বোমা হামলা করা হয়। অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করা হোক। নিহতের পরিবারের প্রতি তিনি সমবেদনা জানান। এছাড়া, ঘটনার পর চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার নিজাম উদ্দীন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল মোমেন, আলমডাঙ্গা থানার ওসি আকরাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
এ দিকে সংঘর্ষের ঘটনায় আলমডাঙ্গা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য দেলোয়ার হোসেন বাদী হয়ে আলমডাঙ্গা থানায় হত্যা চেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা করেছেন। ওই মামলায় চিৎলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমানসহ ২৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত পুলিশ এজাহারভুক্তসহ আটজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হল- একই উপজেলার বড় হাপানিয়া গ্রামের ওহাব আলির ছেলে মুকুল আলি, শফিকুল ইসলামের ছেলে আকিদুল ইসলাম, জয়নাল আবেদিনের ছেলে হারুন অর রশিদ, ইসমাইল হোসেনের ছেলে শাহাবুল হোসেন, মৃত নবিছদ্দীন খানের ছেলে আরশাদ আলী, মৃত ইবারত মন্ডলের ছেলে ইয়াছদ্দীন, আজিজুল ইসলামের ছেলে হামিদুল ইসলামের ও ওয়াজেদ আলি। আটককৃতদের সোমবার বিকালে আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক জেল হাজতে প্রেরণের আদেশ দেন।
মামলার বাদী সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিরোধী পক্ষই পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালিয়েছে। আমার সমর্থকরা সবাই আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী।’, ঈদের দিনে হামলাকারীরা ২০ বছর আগে তাঁর বাবাকে খুন করে। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যস্ততায় মামলাটি আপস-মীমাংসা করা হলেও পরবর্তীতে দফায় দফায় সন্ত্রাসী কর্মকা- চালিয়ে আসছে।
এদিকে, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার হাপানিয়া গ্রামে ঈদের দিন সংঘর্ষে আহত জয়নাল আবেদীন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গতকাল সোমবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত জয়নুল আবেদিন (৪৫) উপজেলার বড়হাপানিয়া গ্রামের কুদ্দুস আলির ছেলে। হাপানিয়া পুলিশ ক্যাম্পের দায়িত্বরত উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শামসুদ্দীন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন বলেন, নিহতের লাশ ঢাকা থেকে আলমডাঙ্গার উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় লাশ চুয়াডাঙ্গায় নেয়া হবে। পরে গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবর স্থানে দাফন করা হবে।
আলমডাঙ্গা থানার ওসি আকরাম হোসেন জানান, এ ঘটনায় পুলিশ ৮ জনকে আটক করেছে। অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কেউ আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ নষ্ট করতে চাইলে তার বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নেবে। ওসি বলেন, স্থানীয় মসজিদ ও মাদ্রাসার মালিকানাধীন ছয় বিঘা জমির একটি বাগান নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ চলে আসছিল। যা এর আগে নিষ্পত্তি করে দেওয়া হয়। ‘ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ববিরোধের জের ধরে এই সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ চারটি শটগানের গুলি ছুড়েছে। সন্দেহভাজন ৮জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এলাকায় অভিাযান অব্যাহত রয়েছে। আজ নিহত জয়নাল আবেদীনের জানাযার নামাজ শেষে দাফন সম্পন্ন করা হবে বলে জানা গেছে।