ঈদ অর্থনীতিতে চরম মন্দা

34

সমীকরণ প্রতিবেদন:
অর্থনীতিতে ঈদের গুরুত্ব অনেক। বছরের দুই ঈদ ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কিন্তু করোনার কারণে গত বছরের মতো এবারের ঈদও কাটছে চরম মন্দায়। রোজার ঈদে পোশাকের বাজারে কিছুটা বিকিকিনি হলেও এ বছর কোরবানির ঈদে পোশাক ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। এই ঈদে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয় কোরবানির পশুর বাজার। এবার অর্ধেক কোরবানি কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ট্যানারি মালিকরা। এবার জুয়েলারি ব্যবসায়ী, মিষ্টির দোকান, মসলা ব্যবসায়ী, দা-বঁটি তৈরির কামার থেকে শুরু করে সব ধরনের ব্যবসায়ীর মাথায় হাত। তবে এই মহামারির মধ্যে একমাত্র রেমিট্যান্সে চাঙ্গা ভাব রয়েছে। ঈদ ঘিরে প্রবাসীরা গত অর্থবছরে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি মুদ্রা পাঠিয়েছেন। এবার ঈদের আগে রেমিট্যান্সপ্রবাহ আরও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
কোরবানির ঈদের বাজারে অর্থনীতির আকার নিয়ে তেমন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঠিক গবেষণা নেই। তবে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। সংগঠনটির তথ্য বলছে, স্বাভাবিক সময়ের কোরবানির ঈদে কেবল গরু-ছাগলসহ অন্যান্য পশু বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকার। রোজার ঈদে ৩০ থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি হলেও এই ঈদে সেটি হয় ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার। জুতা-কসমেটিকস খাতে ৩ হাজার কোটি, ভোগ্যপণ্যে ৭ হাজার কোটি, যাতায়াতে ১০ হাজার কোটি, সোনা-হীরার গহনায় ৫ হাজার কোটি, পর্যটনে সাড়ে ৫ হাজার কোটি, ইলেকট্রনিকসে ৪ হাজার কোটি, হজ ও ওমরাহ পালনে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই ঈদে মসলার বাজারে বিক্রি হয় ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার। সারা দেশে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার মিষ্টি বিক্রি হয়। এ ছাড়া ফার্নিচার, গাড়ি ও আবাসন শিল্পেও বড় লেনদেন হয়। সব মিলিয়ে স্বাভাবিক সময়ের কোরবানির ঈদে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়।
এবারের ঈদে ব্যবসায়ের সামগ্রিক দিক সম্পর্কে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, এবারের বাস্তবতা অনেক কঠিন। করোনা ব্যবসা-বাণিজ্যকে এলোমেলো করে দিয়েছে। কোরবানির বাণিজ্য অর্ধেক কমতে পারে। সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সময়ে যদি ৪০ হাজার কোটি টাকার কোরবানির পশু বিক্রি হয়, এবার সেটি ২০ হাজার কোটি টাকায় নামতে পারে। এই ঈদের সময় ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি হয়, এবার সেখানে মাত্র ৫০০ কোটি টাকার হতে পারে। গহনার বাজারেও হয়তো মাত্র ২০০ কোটি টাকার বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবে সব খাতে ব্যবসা এবার তেমন কিছুই হবে না। লকডাউনের কারণে তো সব কিছুই বন্ধ ছিল। সরকার মাত্র সপ্তাহখানেকের জন্য সব কিছু খুলে দিয়েছে। এই এক সপ্তাহে আর কী বাণিজ্য হবে? ব্যবসায়ীরা এখন কোনো রকমে টিকে থাকার জন্য লড়াই করছেন।
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা জানি, ঈদকে ঘিরে অর্থনীতির সব খাতেই গতি আসে। চাকরিজীবীরা যে ঈদ বোনাস পান, তার পুরোটাই যাওয়ার কথা ঈদের বাজারে। প্রবাসীরাও রেমিট্যান্স পাঠান বেশি। সে টাকাও আসার কথা ঈদের বাজারে। শপিংমল বা মার্কেটগুলোর বাইরে কুটিরশিল্প, তাঁতশিল্প, দেশীয় বুটিক হাউসগুলোতে বাড়ে কর্মচাঞ্চল্য। তবে এবার মন্দার হাওয়া সব খাতেই। এজন্য এবারের কোরবানির ঈদে ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতিও। একে তো মানুষের হাতে টাকা-পয়সা কমে গেছে। অন্যদিকে কোরবানি দেওয়া আর বাড়ি ফেরা নিয়ে কৃচ্ছ্রসাধন করছে। এই ঈদে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বোনাসের টাকা বাজারে আসার কথা। যার পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এবার পুরো টাকা বাজারে আসছে না বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এর অন্যতম কারণ, কঠোর লকডাউনে মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় ছাড়া ওষুধ খাতে ব্যয় করছে বেশি। পাশাপাশি অনেকেই কম টাকা খরচের দিকে মনোযোগী হচ্ছে।