ঈদের পরই বন্যার শঙ্কা

20

অতিবৃষ্টিতে আসছে ভারতের ঢল, নদীভাঙন আরও তীব্র
সমীকরণ প্রতিবেদন:
নদ-নদীসমূহে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদ-নদীগুলোর উৎসস্থলে উজানের অববাহিকায় উত্তর-পূর্ব, হিমালয় পাদদেশ ও মধ্য-ভারত, নেপালে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। উজান থেকে আসছে ঢল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, নদ-নদীগুলোর ১০৯টি পানির সমতল পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে গতকাল রোববার ৬২টি পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি, ৪০টিতে হ্রাস পায়। ৬টি স্থানে পানি অপরিবর্তিত থাকে। শনিবার নদ-নদীর ৫২টি পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি ও ৪৯টিতে হ্রাস পায়। শুক্রবার ৪০টি পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি ও ৬২টিতে হ্রাস পায়। বৃহস্পতিবার ৩৪ পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি ও ৬৯টিতে হ্রাস পায়। এভাবে প্রতিদিনই প্রধান নদ-নদীসমূহে পানি বৃদ্ধির দিকেই রয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের গতকাল বিশেষ পূর্বাভাস প্রতিবেদনে আগামী ৭ দিনে উজানের অববাহিকায় ভারী বর্ষণের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিম, মধ্যাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি, বিপদসীমায় বা কাছাকাছি পৌঁছানো এবং স্থানভেদে বন্যার আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এদিকে দেশের অভ্যন্তরেও বৃষ্টিপাতের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাঝারি থেকে ভারী, কোথাও কোথাও অতিবৃষ্টি হচ্ছে। ভারত, বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে বর্ষার মৌসুমী বায়ু অধিক জোরালো হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
অব্যাহত বর্ষণে নদ-নদীতে বাড়ছে পানি। প্রধান নদ-নদীসমূহের পানি বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে শাখা-প্রশাখা, উপনদীগুলো ফুলে-ফুঁসে উঠেছে। এতে করে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বন্যার। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহার পরেই এবং কঠোর লকডাউনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকা বিশেষত চর ও নিম্নাঞ্চলসমূহ ক্রমেই বন্যা কবলিত হতে পারে এমনটি আশঙ্কা পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞগণের। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে নদীভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-মধ্যাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল, পদ্মা-মেঘনা হয়ে নদ-নদীসমূহের ভাটি ও মোহনায় চাঁদপুর-নোয়াখালী অবধি নদীভাঙন থেমে নেই। চোখের সামনেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাপ-দাদার বসতভিটা, ক্ষেত-খামার, ফল-ফসলের জমি, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। নদ-নদীপাড়ের বাসিন্দাদের সারাক্ষণ তাড়া করছে ভাঙন আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। নদ-নদীসমূহের সর্বশেষ প্রবাহ পরিস্থিতি ও পূর্বাভাসে পাউবো জানায়, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় তা অব্যাহত থাকতে পারে। গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি স্থিতিশীল রয়েছে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকায় নদ-নদীসমূহের পানি হ্রাস পাচ্ছে। যা আগামী ২৪ ঘণ্টায় অব্যাহত থাকতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের আবহাওয়া বিভাগের তথ্য-উপাত্ত উল্লেখ করে পাউবো জানায়, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল এবং এর সংলগ্ন ভারতের হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয় প্রদেশে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এরফলে এ সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র নদ-নদীসমূহের পানি সময়বিশেষে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে। গতকাল বিকালে পাউবোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী উত্তরাঞ্চলে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, যমুনা, পদ্মা এবং মধ্যাঞ্চলে বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় উজানে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হয়েছে। এ সময়ে দেশের অভ্যন্তরে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি, কোথাও কোথাও অতিবৃষ্টি হয়েছে। এরমধ্যে ডালিয়ায় ১৫৭, মহেশখোলায় ৭৭, ছাতকে ৭৫, চিলমারী ও দক্ষিণবাগে ৬০, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে পাউবো।
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস:
আবহাওয়ার সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী চলতি সপ্তাহে উজানের অববাহিকাসমূহের অনেক স্থানে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এরফলে দেশের প্রধান নদ-নদীসমূহের পানি সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে গতকাল একথা জানা গেছে। পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদের পানির সমতল বর্তমানে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বিপদসীমার নিচে রয়েছে। বাংলাদেশ ও উজানের অববাহিকায় ভারতের অরুণাচল, আসাম, মেঘালয় ও হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গে আগামী ৭ দিনে অনেক স্থানে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাবে আগামী ৭ দিনে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদে পানি বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্যণীয় হতে পারে। এরফলে এ সময়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে। কোথাও কোথাও বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে।
আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারীবৃষ্টি হতে পারে। এরফলে দেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা ও ধারলা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। তিস্তা ও ধরলা কোথাও কোথাও বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এই অববাহিকায় লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা হতে পারে। গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি স্থিতিশীল রয়েছে। চলতি সপ্তাহে উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উত্তর প্রদেশ এবং নেপালের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এরফলে গঙ্গা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে। বিপদসীমা অতিক্রমের আশঙ্কা নেই। তবে একই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা উভয় নদ-নদীর অববাহিকায় পানি বৃদ্ধির সম্ভাবনার প্রেক্ষিতে আগামী সপ্তাহে দেশের মধ্যাঞ্চলে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি এবং কোথাও কোথাও বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে।
মেঘনা অববাহিকায় উজানে প্রধান নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি সপ্তাহে উজানে ভারতের আসাম ও মেঘালয় প্রদেশে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। এরফলে আগামী ৭ দিনে সুরমা-কুশিয়ারা এবং এ অববাহিকার সারিগোয়াইন, যদুকাটা, সোমেশ^রী, ভুগাই, কংস, মনু, খোয়াই নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে আগামী ৭ দিনে দক্ষিণ-পূর্ব পার্বত্য অববাহিকা অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এরফলে এ সময়ে এই অববাহিকায় নদ-নদীসমূহের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। কতিপয় স্থানে বিপদসীমা অতিক্রম করে আকস্মিক বন্যা হতে পারে।