ইসরাইলের বেপরোয়া হামলা

25

নির্বিচারে মারছে ফিলিস্তিনিদের
ইসরাইল নির্বিচারে বিমান হামলা চালিয়ে গতকাল রোববার পর্যন্ত গাজায় ১৮১জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। নিহতদের মধ্যে ৪১টি শিশু রয়েছে। আহত ৯৫০ জন। ফিলিস্তিনিদের বাসাবাড়িতে ঢুকে নির্বিচারে অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে ইসরাইলের ইহুদি বাহিনী। বরাবরের মতো এমন মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড চালানোর পরও তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কোনো পদক্ষেপ নেই। এমন কি, প্রতিবেশী আরব দেশগুলোও একেবারে নির্বিকার। অন্য দিকে ‘মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় ফেরিওয়ালা’ আমেরিকানরা ইসরাইলের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন। সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমবেদনা জানানো হচ্ছে এবং তাদের বেঁচে থাকার অধিকারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করা হচ্ছে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, সারা বিশ্বের শাসক শ্রেণী অনেকটাই যেন বর্ণবাদী সাম্প্রদায়িক ইসরাইলের সমর্থক। মসজিদুল আকসায় মুসল্লিদের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর হামলাকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনিরা প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছেন। সেখানে তাদের নির্বিচার হামলার জবাবে হামাস গাজা থেকে ইসরাইলের ওপর রকেট হামলা চালায়। হামাসের রকেট ইসরাইলের আকাশ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেদ করে খুব সামান্যই আঘাত হানতে পারছে। কিন্তু নামমাত্র এ হামলাকে ওজর হিসেবে ব্যবহার করে ইসরাইল নির্বিচারে ও সর্বাত্মকভাবে ফিলিস্তিনে বিমান হামলা চালিয়েছে। এই হামলা বহু বেসামরিক নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে এর শিকার হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা। বিমান হামলার পর ভবনের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে মানুষের লাশ। সেখানে পাওয়া যাচ্ছে হাত-পা উড়ে যাওয়া শিশুদের লাশ। অনেক আহতকে সেখান থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে।
ইসরাইলি বেপরোয়া হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে বেসামরিক সরবরাহ লাইন। গাজায় যাতায়াতের যে সীমিত সুযোগ রয়েছে সেগুলোকেও ইসরাইল হামলা চালিয়ে বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে। তারা হামলা চালিয়ে গাজার প্রধান হাসপাতালটির পথও তছনছ করে দিয়েছে। ইসরাইলের ভয়াবহ হামলা কোনো সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নয়। অথচ তারা সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান, জাহাজ ও অত্যাধুনিক সব অস্ত্র প্রয়োগ করছে। এ ধরনের একটি বিষয় কিভাবে ইসরাইলের নিছক আত্মরক্ষা হতে পারে? একটানা এক সপ্তাহ বেসামরিক মানুষের ওপর তাদের সামরিক হামলা অব্যাহত রয়েছে। নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর এ হামলার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো বৈশ্বিক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে এ ব্যাপারে একটি বৈঠক গতকাল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বাইডেন এ যাত্রায় দ্বিতীয়বারের মতো ইসরাইলের প্রতি ‘শক্তিশালী’ সমর্থন বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে ফোনালাপে তার বক্তব্য হচ্ছে- হামাস ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার আছে ইসরাইলের। আমেরিকার নেতৃত্বে চালিত ইসরাইল-ফিলিস্তিন নীতির একচোখা অবস্থানটি এতে স্পষ্ট। ইহুদিদের জোরপূর্বক বসতি স্থাপন সব জটিলতার মূল। মসজিদুল আল-আকসায় এবারে আক্রমণের সূত্রপাত হয়েছিল সেখান থেকে। এর প্রতিবাদকে ইসরাইল তার সামরিক শক্তি দিয়ে মোকাবেলা করেছে। কাউকে যদি অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়, এর বিপরীতে যদি সে অস্ত্র হাতে তুলে নেয় সেটাকে আমেরিকা ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে উল্লেখ করছে। ইহুদিবাদীদের সামরিক হামলাকে ‘আত্মরক্ষা’ বলা হচ্ছে। অন্যপক্ষ যখন এ থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে, সেটাকে বলা হচ্ছে ‘সন্ত্রাসী হামলা’। এ অবস্থায় নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনিদের পাওয়ার কিছু নেই। দুর্ভাগ্য, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের যে তকমা আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্ব মুসলমানদের ওপর সেঁটে দেয়া হচ্ছে সেটা মুসলমান দেশগুলোর বিরাট একটা অংশের শাসকরাও গ্রহণ করছেন। এমনকি এটাকে অনেক শাসক তাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছেন। অন্য দিকে, আরব দেশগুলোর অনেকে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের সাথে। এ অবস্থায় নিজের মুসলমান ভাইদের যান রক্ষা করার চেয়ে ইসরাইলের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা করা তাদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই ফিলিস্তিনিদের পক্ষে জোরালো আওয়াজ ওঠার সম্ভাবনাও কমে গেছে। তাদের জন্য ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনে অসহায় শিকার হওয়ার বিকল্প খুব কমই রয়েছে। তবে আশার ব্যাপার হচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের অদম্য প্রতিরোধ আন্দোলন। তারা জানবাজি রেখে ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। একদিন মুক্তি তাদের আসতেও পারে।