ইউএনওর ওপর হামলা

নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে সরকারি বাসভবনে ঢুকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর হামলার ঘটনাটি হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এরই মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ঘটনার বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ঢাকায় এনে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তাঁর বাবাও ওই বাসায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনিও চিকিৎসাধীন। একজন ইউএনও সংশ্লিষ্ট উপজেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। তিনি উপজেলা কমপ্লেক্সে সরকারি বাসভবনেই থাকেন। সেখানে তাঁর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকা দরকার। ২০১৮ সালের ডিসি সম্মেলনের সময় ইউএনওদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার বিষয়টি প্রস্তাবও করা হয়েছিল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক শারীরিক ও বাসস্থানের নিরাপত্তার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় তিন বছর আগে নির্দেশও (অনুশাসন) দিয়েছিলেন। প্রকাশিত খবরে বলা হচ্ছে, সেই নির্দেশ বাস্তবায়িত হয়নি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফাইল চালাচালি ও বৈঠক হয়েছে শুধু। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ইউএনওদের সার্বক্ষণিক শারীরিক ও বাসভবনের নিরাপত্তা প্রদানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনসার সদস্যদের মাধ্যমে ইউএনওদের নিরাপত্তা বিধানের প্রস্তাব দিয়ে এসংক্রান্ত ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আনসারের বদলে পুলিশ দিয়ে নিরাপত্তা বিধানের প্রস্তাব করা হয়। এরপর এ বিষয়ে চারটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু পুলিশ নাকি আনসার কাদের মাধ্যমে ইউএনওদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। এই সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যেই দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার ইউএনও আক্রান্ত হলেন। এ ঘটনার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় তাঁদের সরকারি বাসভবনে আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়ার কথা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী। প্রশ্ন তো উঠতেই পারে যে একটি সিদ্ধান্ত নিতে তিন বছর পার হলো কেন? আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার এমন উদাহরণ কেন তৈরি হলো? উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাঠপর্যায়ে কাজ করেন। সরকারের নানা কর্মসূচি তাঁদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আবার কখনো কখনো এমন কিছু সিদ্ধান্ত তাঁকে নিতে হয়, যা স্থানীয় বা রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের স্বার্থে আঘাত করে। একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও দুর্নীতিবাজদের কাছে কখনো গ্রহণযোগ্য হবেন না। যেমন—ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানম করতোয়া নদীতে উচ্ছেদ এবং অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছেন। এ জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট ঘোড়াঘাট উপজেলায় বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের অপতৎপরতা রয়েছে। শুধু ঘোড়াঘাট নয়, দেশের অনেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেই এ ধরনের প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে। ঘোড়াঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর যে হামলা হয়েছে তার উপযুক্ত তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর এ ধরনের হামলা নিছক বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ঘটনার নেপথ্যে কী সেটা জানার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।