আসমানখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:
আলমডাঙ্গার আসমানখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের জমিতে দোকানঘর নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হলেও সে হিসেব নেই প্রধান শিক্ষকের কাছে। এদিকে, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের হাতে টাকা দিয়ে দোকান না পেয়ে দুশ্চিতায় আছেন দোকানদাররা। প্রধান শিক্ষক বলছেন, দোকান হওয়ার ব্যাপারে কমিটিতে আলোচনা হয়েছে, তবে টাকার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। আর সভাপতি বলছেন, টাকা নিয়ে দোকান করে দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আলমডাঙ্গা উপজেলার আসমানখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নামে বিদ্যালয়ের পাশেই বাজারের ওপর ১০ শতাংশ জায়গা আছে। পূর্বে থেকেই ওই স্থানে সাপ্তাহিক হাট বসে। ওই জায়গায় পাকা দোকানঘর করে ভাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদ। ৬ মাস আগে দোকানদারদের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করে নেয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি রকিবুল হাসান ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্য আব্বাস উদ্দীন।
দোকানদারদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন পার হলেও সবকটি দোকানঘর নির্মাণের কাজ শেষ হয়নি। সবাইকে বুঝিয়েও দেওয়া হয়নি দোকানঘর। মোটা অংকের টাকা নিলেও দেওয়া হয়নি কোনো রশিদ। টাকার বিপরীতে দোকানের চুক্তিনামাও পাননি দোকানদাররা। কোনো কোনো দোকানদারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দোকানঘর বুঝিয়ে দিতে বললেও বিদ্যালয়ের সভাপতি রকিবুল হাসান তাদেরকে দোকানঘর বুঝিয়ে দেননি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলছেন, তিনি কিছু জানেন না। এ নিয়ে দুশ্চিতার ভাজ পড়েছে ভুক্তভোগীদের কপালে।
ভুক্তভোগী গাংনী ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য লিমন হোসেন বলেন, ‘দোকান নেওয়ার জন্য আসমানখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি রকিবুল হাসানের নিকট ৭৮ হাজার টাকা দিয়েছি। আমাকে এখনো দোকানঘর বুঝিয়ে দেয়নি। আজ দেব কাল দেব বলে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।’ আরেক ইউপি সদস্য সাইদুর রহমান বলেন, ‘কয়েক মাস আগে দোকানঘর বরাদ্দ নেওয়ার জন্য রকিবুল হাসানকে টাকা দিয়েছি। কিন্তু আজও আমাকে দোকানঘর বুঝিয়ে দেয়নি। আজ-কাল করে ঘুরাচ্ছে।’
আসমানখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য আব্বাস উদ্দীন টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি রকিবুল হাসানকে নিয়ে আমি খুব বিপদের মধ্যে আছি। আমাকে উনি বিভিন্ন সময় দোকানদারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসতে বলেন। প্রতিটা দোকানদারদের কাছ থেকে ১ লাখ করে টাকা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি টাকার হিসেব দিচ্ছেন না।’
গাংনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এমদাদুল হক অভিযোগ করে বলেন, ‘ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি রকিবুল হাসানকে নিয়ে আমিও খুব বিপদে আছি। অনেক মানুষকে দোকানঘর বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন রকিবুল হাসান। এমনকি দোকানঘর দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকেও টাকা নিয়েছেন। এখন পর্যন্ত আমাকে দোকানঘর বুঝিয়ে দেয়নি।’
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি বাহাউল হক বলেন, ‘ম্যানেজিং কমিটিতে দোকান করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ইট, বালু ও সিমেন্ট কেনার বিষয়ে আমাদের সাথে কোনো আলোচনা হয়নি। টাকা-পয়সার লেনদেন বা যারা দোকান বরাদ্দ নিয়েছে, তাদের বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।’
অপরদিকে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজেই জানেন না দোকানদারদের কাছ থেকে কত টাকা করে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের মালিকানাধীন জমিতে দোকানঘর করলেও কোনো হিসেব নেই প্রধান শিক্ষকের কাছে। দোকানঘর বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়েও তিনি কিছুই জানেন না। কমিটির ওপর সব দায়িত্বের কথা বললেও নিজে সেই কমিটির সদস্যসচিব হলেও টাকার হিসেব থেকে তিনি অজ্ঞ। এমনকি প্রধান শিক্ষক সঠিকভাবে জানেন না কত শতক জমি আছে প্রতিষ্ঠানের নামে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ম্যানেজিং কমিটি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বরাদ্দ দেবে। দোকানগুলোর বরাদ্দের জন্য এখনো কোনো কাগজপত্র তৈরি হয়নি। কার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে, তা আমি জানি না। কারা ভোগদখল করছে, সেটাও আমি জানি না।’ ঘরগুলোতে কেউ কেউ ব্যবসা করছেন, কোন অধিকারবলে বা কোন প্রক্রিয়ার মধ্যে তারা সেখানে ব্যবসা করছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘আমার কাছে কিছু নেই। আমি জানি না। বিষয়টি কমিটি ভালো জানে। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কমিটির সব সদস্যরা এই কাজে থাকবে। কিন্তু কীভাবে ইট-পাথর কিনে দোকানঘরগুলোর কাজ হয়েছে, সেটা আমার জানা নেই। ইট-সিমেন্টের খরচের হিসেবে আমাকে সাথে নেয়নি। আমার কিছুই জানা নেই। আমি এই বিষয়টি জানার প্রয়োজনীয়তা বোধ করিনি। ঘরগুলো হওয়ার পর থেকে খাজনা আদায় বন্ধ আছে।’
বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি রকিবুল হাসান বলেন, ‘ওখানে আগেও ছোট ছোট দোকান ছিল। বৃষ্টিতে ব্যবসায়ীদের কষ্ট হতো। ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে রেজ্যুলেশন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল। কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া ছিল। যারা ব্যবসা করে, তারাই ওখানে ঘর করে নিবে, সেই মর্মে টাকা নেওয়া হয়েছে। টাকা সিকিউরিটি হিসেবে নেওয়া হয়েছে। ঘর যখন তারা ছেড়ে দেবে, তখন টাকা ফেরত পাবে। এ পর্যন্ত ১৬টি ঘরের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখনো কাজ চলমান। কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, সেটা খাতা-কলম দেখে বলতে হবে। রোববার অথবা বৃহস্পতিবার একদিন আসেন।’
প্রশ্ন করা হয়, প্রধান শিক্ষক বলছেন তিনি টাকার বিষয়ে কিছুই জানেন না, আপনারা কি আলোচনা করে সবকিছু করেছেন? উত্তরে রকিবুল হাসান বলেন, মিটিংয়ের সবকিছু তো প্রধান শিক্ষকই লেখেন। তার না জানার কিছু নেই। রেজ্যুলেশন আছে। প্রত্যেকটা কাজের ভাউচার আছে।